প্রাথমিকে শিক্ষার্থী অনুপাতে শিক্ষক কম, শূন্যপদ দ্রুত পূরণ করা হোক

মানসম্পন্ন প্রাথমিক শিক্ষা নিশ্চিত করতে সবচেয়ে বেশি প্রয়োজন উচ্চমানসম্পন্ন শিক্ষক। আর এক্ষেত্রে বাংলাদেশ পিছিয়ে। আন্তর্জাতিক গবেষণা সংস্থাগুলো বলছে, শিক্ষার্থী অনুপাতে শিক্ষক দক্ষিণ এশিয়ার মধ্যে সবচেয়ে কম বাংলাদেশে। প্রাথমিক শিক্ষাসংশ্লিষ্টরা বলছেন, প্রাথমিকে শিক্ষার্থী ভর্তি প্রায় শতভাগে পৌঁছেছে। প্রাথমিক শিক্ষা উন্নয়ন প্রকল্পের আওতায় প্রতি বছরই যুক্ত হচ্ছে নতুন নতুন বিদ্যালয়। তবে শিক্ষার্থী ও বিদ্যালয়ের সংখ্যা বাড়লেও সে অনুযায়ী নিয়োগ দেয়া হচ্ছে না পর্যাপ্তসংখ্যক শিক্ষক।
প্রাথমিক শিক্ষা অধিদপ্তরের বার্ষিক অগ্রগতি প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, দেশের ৭৯টি বিদ্যালয়ে মাত্র একজন শিক্ষক দিয়ে পাঠদান চলছে। দুজন শিক্ষক দিয়ে পাঠদান চলছে ৭২১ বিদ্যালয়ে। আর তিনজন শিক্ষক দিয়ে পাঠদান চলছে ৭ হাজার ৭৬৪ বিদ্যালয়ে। অর্থাৎ সরকারি হিসাবেই ৮ হাজার ৫৬৪টি বিদ্যালয়ে তীব্র শিক্ষক সংকট রয়েছে। বিজ্ঞান, অংক ও ইংরেজি শিক্ষক সংকট তো আরো বেশি। এতে যে মানসম্মত শিক্ষার্থী তৈরি হওয়ার কথা, তা হচ্ছে না এবং শিশুদের নিয়ে কাজ করতে গিয়ে শিক্ষকদের মানসিক অবস্থারও অবনতি হয়। শিক্ষার্থী অনুপাতে শিক্ষক বাড়ানো গেলে যেমন কাটত শিক্ষক সংকট, সমাধান হতো বেকার সমস্যার, তেমনি শিক্ষার্থীরা গড়ে উঠত বিশ্বায়নের উপযোগী হয়ে। অধিক শিক্ষক নিয়োগ হলে কোনো স্কুল শিক্ষক সংকটে ভুগত না এবং আনুপাতিক হারে শ্রেণীকক্ষে কমে আসত শিক্ষার্থী সংখ্যা। ফলে উন্নত বিশ্বের মতো এগিয়ে যেত আমাদের শিক্ষা ব্যবস্থা।
শিক্ষা খাতে এ পর্যন্ত আমাদের যে অর্জন, তার শুরু হয়েছিল স্বাধীনতার অব্যবহিতপর থেকে সরকারের নেয়া বিভিন্ন পরিকল্পনার মধ্য দিয়ে। আবার শিক্ষার প্রসারে উৎসাহী বিভিন্ন সামাজিক সংগঠনও সদ্য স্বাধীন দেশে জাতি গঠনের স্বপ্ন বুকে নিয়ে নানা উদ্যোগ শুরু করেছিল। এভাবে সরকারি ও বেসরকারি বিভিন্ন উদ্যোগের মধ্য দিয়ে এসেছে জাতিগত এ অর্জন, যার শীর্ষে আছে প্রাথমিকে শতভাগ ভর্তিসংক্রান্ত সহ¯্রাব্দ উন্নয়ন লক্ষ্যমাত্রা পূরণ। শিক্ষা বিস্তারে সাফল্যের নানা কথা বলা হলেও শিক্ষক ও প্রধান শিক্ষক না থাকায় প্রাথমিক বিদ্যালয়ে পাঠদান হচ্ছে দায়সারা গোছের। নিয়ন্ত্রক বা প্রধান শিক্ষক না থাকায় সাধারণ শিক্ষকরাও নিজেদের সুবিধা অনুযায়ী স্কুলে আসছেন এবং যাচ্ছেন, তদারক ব্যবস্থা নেই। দুঃখজনক হলো, শিক্ষকস্বল্পতা নিরসনে গণশিক্ষা মন্ত্রণালয়ের কার্যকর উদ্যোগও পরিলক্ষিত হচ্ছে না। শিক্ষক নিয়োগে প্রাথমিক শিক্ষা অধিদপ্তরের কর্মকর্তাদের উদাসীনতার অভিযোগও আছে। প্রধান শিক্ষকশূন্যতা, সহকারী শিক্ষকের অভাব আর শ্রেণীকক্ষের সংকট রেখে মানসম্মত শিক্ষা আশা করা বাতুলতামাত্র। গত কয়েক বছরে দেশের প্রাথমিক বিদ্যালয়গুলোয় শিক্ষার্থী ভর্তির হার বেড়েছে বেশ। তবে সে তুলনায় নিয়োগ দেয়া হয়নি পর্যাপ্ত শিক্ষক। ফলে বিদ্যালয়গুলোয় তীব্র শিক্ষক সংকট দেখা দিয়েছে। পর্যাপ্তসংখ্যক শিক্ষক না থাকলে বিদ্যালয়ের পাঠদান কার্যক্রম ব্যাহত হবে, এটাই স্বাভাবিক। অধিকাংশ বিদ্যালয়ে বেশকিছু পদ খালি পড়ে আছে। আমাদের প্রত্যাশা থাকবে, সরকার শূন্য পদগুলোয় অতিদ্রুত শিক্ষক নিয়োগ দিয়ে এ সমস্যার সমাধান করবে।
শ্রেণীকক্ষে পাঠদান, মানসম্মত শিক্ষাদান ও শিক্ষার সার্বিক মানোন্নয়নের জন্য শিক্ষক ও শিক্ষার্থীর মধ্যে একটি অনুপাত থাকে। এ অনুপাত রক্ষা করা না হলে শিক্ষার গুণগত মানের ওপর নেতিবাচক প্রভাব পড়ে। যেভাবে শিক্ষার্থী অনুপাতে শিক্ষকের সংখ্যা কমছে, তাতে অদূরভবিষ্যতে দেখা যাবে ৬০ জন শিক্ষার্থীর জন্য একজন শিক্ষক। সরকার মানসম্মত শিক্ষা দেয়ার কথা বলে, কিন্তু এভাবে চলতে থাকলে মানসম্মত শিক্ষা নিশ্চিত করা সম্ভব নয়। মানসম্মত শিক্ষা নিশ্চিত করতে হলে শিক্ষার্থী-শিক্ষক ৩০ অনুপাত ১-এর বেশি হওয়া বাঞ্ছনীয় নয়। বাংলাদেশের মাধ্যমিক স্তরের জন্য শিক্ষক-শিক্ষার্থীর স্বীকৃত অনুপাত বজায় রাখতে হলে দ্রুত শিক্ষক নিয়োগ দিতে হবে। প্রশিক্ষণ দিয়ে শিক্ষক নিয়োগ প্রক্রিয়া ত্বরান্বিত করে শিক্ষক ঘাটতি পূরণ করতে হবে। একই সঙ্গে শিক্ষকদের শ্রেণীকক্ষে পাঠদান নিশ্চিতকরণ এবং পাঠদানের গুণগত মান বৃদ্ধির ওপরও জোর দিতে হবে। বস্তুত প্রাথমিক ও গণশিক্ষা মন্ত্রণালয়ের প্রাথমিক লক্ষ্য হওয়া উচিত পুরো শিক্ষা প্রক্রিয়ার সার্বিক উন্নয়ন। স্কুল নির্মাণ ও তার পরিকাঠামো উন্নতি যেমন জরুরি, ঠিক তেমনি জরুরি তা পরিচালনার সুষ্ঠু পরিবেশ ও নীতি।