প্রিয়ার পুরো জীবনের দায়ভার গ্রহণ করতে হবে দুর্ঘটনাকারী প্রতিষ্ঠানকে

একটি ছবি হাজার শব্দের চেয়ে বেশি কথা বলে। গতকাল দৈনিক সুনামগঞ্জের খবরে ‘বেপরোয়া মাইক্রোবাসের ধাক্কা/ মৃত্যুর সাথে পাঞ্জা লড়ছে পিতৃ-মাতৃহীন প্রিয়া’ শিরোনামে ৪ বছরের শিশু কন্যা প্রিয়ার সড়ক দুর্ঘটনায় আহত হওয়া নিয়ে প্রতিবেদন প্রকাশিত হয়েছে, সেখানে হাসপাতালের বিছানায় শোয়া মারাত্বকভাবে আহত প্রিয়ার একটি ছবিও ছাপা হয়। পুরো প্রতিবেদনে অনেক শব্দ, বাক্য ও অনুচ্ছেদ ব্যবহার করেও যে নির্মমতা ও অমানবিকতার কথাটুকু প্রকাশ করা যায়নি, একটি ছবি সেই ভাব ধারণ করে আছে অকপটে। ছবিটির দিকে তাকালে যে কারও হৃদয় ভেঙে যাবে, এই শিশু কন্যাটির চরম যন্ত্রণা আর দুর্ভোগে সমব্যথী হবেন যেকোন মানবিক গুণাবলী সম্পন্ন মানুষ। ছবিতে হাসপাতালের বেডে শোয়া প্রিয়ার ছবিতে তার মাথা ও মুখম-লে আঘাতের চিহ্ন স্পষ্ট বুঝা যায়। তার পা দুটো ব্যান্ডেজ করা। ডান হাতখানা সামনে প্রসারিত। চোখগুলো মুদিত। সম্ভবত যন্ত্রণা থেকে রেহাই দিতে ঘুমের ঔষধ দিয়ে তাকে ঘুম পাড়িয়ে রাখা হয়েছে। প্রিয়ার ভাঙা পায়ের এক্সরের একটি ছবিও আমাদের বার্তা বিভাগে এসেছে। সেই ছবিতে আমরা দেখেছি তার দু পায়েরই হাড় ভেঙে গেছে।
প্রিয়াকে গত বৃহস্পতিবার (৫ জুলাই) সিলেট-সুনামগঞ্জ আঞ্চলিক মহাসড়কের আস্তমা গ্রামের রাস্তার সামনে মোবাইল ফোন অপারেটর বাংলালিংকের সুনামগঞ্জগামী একটি দ্রুতগতির মাইক্রোবাস (ঢাকা মেট্রো-চ-৫১-২৩০৪) ধাক্কা দেয়। ওই ধাক্কায় শিশু প্রিয়া গুরুতর আহত হলে সিলেট ওসমানী মেডিক্যাল কলেজ হাসপাতালে ভর্তি করা হয়। সে এখন হাসপাতালের ২য় তলার ১৭ নং মহিলা ওয়ার্ডে চিকিৎসাধীন আছে। প্রিয়া মাতৃহীন এক অভাগা শিশু। সে মাকে হারায় জন্মের পরই। মানসিক ভারসাম্যহীন পিতা, তাই পিতৃ¯েœহ থেকেও বঞ্চিত সে। পাগলা কান্দিগাঁও গ্রামের ফুফুর বাড়িতে বেড়াতে এসেছিল সে। বৃহস্পতিবার দাদীর সাথে বাড়ি ফিরছিল। আর তখনই বেপরোয়া মাইক্রোবাস তার জীবনের ছন্দ থামিয়ে দিল। সড়ক দানবের আরেক শিকার হল প্রিয়া।
সংবাদসূত্রে জানা যায়, দুর্ঘটনাকারী মাইক্রোবাসটি ও এর চালক থানায় আটক হয়েছে। এ ঘটনায় মামলাও হয়েছে দক্ষিণ সুনামগঞ্জ থানায়। এরকম মামলার ভবিষ্যৎ কেমন হয় আমরা জানি। আর এখানে দুর্ঘটনার শিকার প্রিয়া ও তার পরিবার যেহেতু প্রভাবশালী কেউ নয়, সংগত কারণে সকলেই ধরে নিবেন যে, এই মামলাটিও একটা সময় গতি হারাবে। কিন্তু যে দুর্ঘটনাটি শিশু প্রিয়ার জীবনের গতি আটকে দিল তার কী হবে? কর্পোরেট প্রতিষ্ঠান বাংলালিংক আহত প্রিয়ার কোন খোঁজখবর নিয়েছে বা দুর্ঘটনার দায় গ্রহণ করে তার উপযুক্ত চিকিৎসার ব্যবস্থা করেছে, এমন সংবাদ আমরা পাই নি। কিন্তু এই কোম্পানিগুলো কত পথেই না টাকা উড়ায়। বিজ্ঞাপন, পৃষ্ঠপোষকতা ইত্যাদি খাতে বেশ টাকা উড়ায় এরা। ব্যবসার নামে মানুষের নিকট থেকে অযৌক্তিক অর্থ উপার্জন করে তার ছিটেফোটা তারা এইভাবে উড়িয়ে মানবতা আর শিল্প-সংস্কৃতির ছবক আওড়ায়। কিন্তু এক সপ্তাহ গত হল, তাদেরই কোম্পানির এক গাড়ির ধাক্কায় আহত শিশু প্রিয়ার কোন খোঁজই রাখল না তারা। ব্যবসা আর মুনাফা আহরণের পথ কতটা নির্মম।
প্রিয়ার পুরো জীবনের দায়ভার গ্রহণ করতে হবে দুর্ঘটনাকারী প্রতিষ্ঠানকে, এমন দাবিই সংগত বলে আমরা মনে করি। এজন্য ওই প্রতিষ্ঠানকে আইনত বাধ্য করার ব্যবস্থা নিতে হবে। এজন্য সমাজের মানবিক মানুষজনকে মাতৃহীন ও পিতার ¯েœহবঞ্চিত অসহায় প্রিয়ার পাশে এসে দাঁড়াতে হবে।