ফসলরক্ষা বাঁধ নিয়ে আর কত কথা বলতে হবে?

সরকারি নীতিমালা অনুসারে ১৫ ডিসেম্বর থেকে ফসল রক্ষা বাঁধ নির্মাণ ও সংস্কার কাজ শুরু হওয়ার কথা। এর আগে যথাযথ প্রক্রিয়ায় গণশুনানী করে প্রতিটি প্রকল্পের বিপরীতে প্রকল্প বাস্তবায়ন কমিটি গঠন করতে হয়। এবার পানি উন্নয়ন বোর্ড ১০৮৯টি প্রকল্পের বিপরীতে ২০৫ কোটি টাকা বরাদ্দ চেয়েছে। সরকার ইতোমধ্যে ১০০ কোটি টাকা বরাদ্দ দিয়েছেন। গতকাল দৈনিক সুনামগঞ্জের খবরে প্রকাশিত একটি সংবাদ থেকে জানা যায় ৫৫০টি বাঁধে কাজ শুরুর তথ্য জানিয়েছে পাউবো। এর ১০০টিতে কেবল কাজ শুরুর আনুষ্ঠানিকতা মিটানো হয়েছে, মূলত এই ১০০ বাঁধে কাজ শুরু হয়নি। সময়মতো বাঁধের কাজ শুরু না হওয়ায় সোমবার তাহিরপুর ও জগন্নাথপুর উপজেলায় মানববন্ধন অনুষ্ঠিত হয়। জেলা আওয়ামী লীগের সাধারণ সম্পাদক সোমবার জামালগঞ্জ উপজেলার দুইটি বাঁধ পরিদর্শন করে সাফ জানিয়েছেন, প্রধানমন্ত্রী হাওরের ফসল রক্ষার বিষয়ে খুব আন্তরিক। বাঁধ নিয়ে কোথাও কোনো অনিয়মের অভিযোগ পাওয়া গেলে কঠোর দৃষ্টিতে দেখা হবে। এমন প্রেক্ষাপটে জেলার অর্ধেকের বেশি বাঁধে এখন পর্যন্ত কাজ শুরু না হওয়া দুর্ভাগ্যজনক। নির্ধারিত তারিখের চাইতে নির্মাণ কাজ ৪০ দিন পিছিয়ে গেছে। ২৮ ফেব্রুয়ারির মধ্যে বাঁধের কাজ শেষ করার নিয়ম। এখনও যেসব বাঁধে কাজ শুরু হয়নি সেগুলো নির্ধারিত সময়ে শেষ হবে কিভাবে?
বোরো ফসল আবাদ মৌসুমে স্থানীয় গণমাধ্যম ও গণমাধ্যমকর্মীরা হাওরের সংবাদ নিয়ে অতিশয় তৎপর থাকেন। এর প্রধান কারণ হলোÑ জেলার প্রধান ফসল হলো এই বোরো ফসল যা জেলার উৎপাদন ও অর্থনীতির মেরুদ-ও বটে। এই ফসল গোলায় উঠা পর্যন্ত গণমাধ্যম সজাগ দৃষ্টি রেখে চলে। হাওরের ফসল নষ্ট হলে যে কেবল এই জেলাই ক্ষতিগ্রস্ত হবে তা নয় বরং পুরো দেশের খাদ্য নিরাপত্তার উপর নেতিবাচক প্রভাব তৈরি করবে। অত্যন্ত পরিতাপের বিষয় গতবছর এইসব বাঁধের কার্যকারিতা ছিল না। অকাল পাহাড়ি ঢলে ব্যাপক ফসল হানি ঘটেছিলো। গতবছরও বাঁধ নির্মাণের নানা অনিয়ম নিয়ে গণমাধ্যম সরব ছিলো। কিন্তু মূলত বাঁধের গুণগত মান বজায় রাখার বিষয়ে কর্তৃপক্ষীয় অবহেলা ছিল চোখে পড়ার মতো। এবারও পিআইসি গঠনের শুরু থেকেই বিভিন্ন উপজেলা থেকে অনিয়মের অভিযোগ আসতে থাকে। এর অন্যতম হলো যথাযথভাবে গণশুনানী না করে পছন্দমাফিক ব্যক্তিদের পিআইসির দায়িত্বশীল পদে বসিয়ে এবং অপ্রয়োজনীয় প্রকল্প বানিয়ে বাঁধ নিয়ে বাণিজ্য করার পূর্বপ্রস্তুতি। সেই অভিযোগের কোনো সুরাহা হয়নি। পাউবো ও স্থানীয় প্রশাসন তাদের মতো করেই পিআইসি গঠন ও প্রকল্প প্রণয়ন করেছেন। তাই এবারও বাঁধের মান বজায় রাখা নিয়ে কৃষক ও সচেতন মহল সন্দিগ্ধ।
গতবছরও সময়মতো বাঁধের কাজ শুরু করা যায়নি। সে বছর প্রশাসনের পক্ষ থেকে ইউনিয়ন পরিষদ নির্বাচন আয়োজনের ব্যস্ততাকে কারণ হিসাবে সামনে আনা হয়েছিলো। এবার বিলম্বে কাজ শুরুর জন্য কোন কারণকে সামনে আনা হবে? অজুহাত সংস্কৃতি আমাদের রক্তে মাংসে মিশে গেছে। এ ওর উপর দোষ চাপিয়ে, নিজেদের ব্যর্থতাকে ধামাচাপা দিতে মনগড়া যুক্তির উপস্থাপন করা হয়। হাওর, কৃষক ও কৃষি নিয়ে কারও আন্তরিকতার প্রমাণ মিলে না মাঠের কাজ দেখলে। শেষ সময়ে অতি ব্যস্ততার আয়োজন করে আগের ব্যর্থতাকে আড়াল করার চেষ্টা করা হয়। বাঁধের কাজ প্রতি বছরকার একটি নিয়মিত কাজ। আগে থেকেই এর প্রস্তুতি থাকার দরকার। এবার বিশ্বব্যাপী ভয়ানক খাদ্য সংকটের আশংকা করা হয়। খোদ প্রধানমন্ত্রী বারবার প্রতি ইঞ্চি জমিতে ফসল ফলানোর তাগিদ দিয়ে যাচ্ছেন। কিন্তু মাঠের বাস্তবতা দেখে তা বুঝার উপায় নেই। গত মাস দুইয়ের ভিতর আমরা বহুবার সম্পাদকীয় মন্তব্য প্রকাশের মাধ্যমে সকলকে দায়িত্বশীল ও আন্তরিক হওয়ার আহ্বান জানিয়েছি। আবারও তাই করা হলো।