ফারুক স্যার : ইংরেজির অভিধান ও কয়েক টুকরো স্মৃতি

ইয়াকুব শাহরিয়ার
“শুনো রে বাবা—মায়েরা, Tense হচ্ছে ইংরেজির প্রাণ। ঞবহংব যদি না শিখো তাহলে তোমার ইংরেজিও শিখা হবে না; ছাত্র জীবনও সফল হবে না। ইংরেজির খঁুটিনাটি তোমাদের জীবনে সবচেয়ে বেশি ইম্পর্ট্যান্ট। তোমরা আমার ছেলে—মেয়ে, ভাই—বোনের মতো। তোমরা Success হলে গর্বে আমার বুক বড় হবে।”
চিরচেনা রূপে, চক ডাস্টার হাতে, Tense Guide নামের একটি বই আর অক্সফোর্ডের বিশাল ডিকশনারি বগলে করে ক্লাসে প্রবেশ করেই বড় বড় গলায় বুক ছাপড়ে কথাগুলো বলতেন আমাদের ফারুক স্যার। ইয়াকুব দাঁড়াও। ‘ডাক্তার আসিবার পূর্বে রোগী মারা গিয়েছে’ কোন Tense হবে? তার স্ট্রাকচার বলো। আমি পারতাম না। হঠাৎ করে এসে অপ্রস্তুত ভাবে তড়িঘড়ি করে এমন জিজ্ঞাসায় নূরাইন হায়দার জয় আর আরিফা খানম ময়ূরী ছাড়া অষ্টম শ্রেণির আর কেউ সঠিক উত্তর দিতে পেরেছে বলে আমার মনে হয় না। অধিকাংশরাই যখন পারতাম না, স্যারের উপদেশের ঢালি তখন খুলতো। সমস্ত ক্লাস কাটিয়ে দিতেন উপদেশ দিতে দিতে। সেদিন খুবই বিরক্ত লাগতো স্যারের এসব কথাগুলো।
আস্তে আস্তে যখন বড় হতে লাগলাম, বুঝতে শুরু করলাম— ফারুক স্যারই ঠিক ছিলেন। যখনই ইংরেজির বিষয়আশয় আসে তখন প্রতি নিয়ত ফারুক স্যারকে অনুভব করি। স্যার আস্ত একটা ডিকশনারি ছিলেন বলতে গেলে। অতি সত্য, কঠিন ও বাস্তব কথা স্যার খুব সহজে বলে ফেলতেন, ঠোঁটেমুখে লাগতো না। যা মনে আসতো তা—ই বলে দিতেন অবলীলায়৷ স্কুলের পাশে আমাদের বাড়ি হওয়ায় প্রায় দিন সকালে আমাদের বাড়িতে খাওয়া দাওয়া করেছেন তিনি। আমাদের বাংলাঘরে ঘুমিয়েছেনও মাঝে মাঝে। গোসল করতেন আমাদের পুকুরে। লাক্স সাবান ব্যবহার করতেন স্যার। প্রচুর পরিমাণে ফেনা না উঠলে স্যারের শরীর মাজা হতো না। ধবধবে সাদা ছিলেন। খুব ভোরে ঘুম থেকে উঠতেন। দায়িত্ব পালনে কখনো অবহেলা করতে শুনিনি কখনো। কথা বলা মুখ, তাই বলতেন একটু বেশি। ছাত্রদের উদ্দেশ্যে বলা কথাগুলো ছিলো চিরন্তন সত্য বাক্যের মতো। আজো কথাগুলো বাস্তব সম্মত ও যুগোপযোগী।
দেশের দ্রুততম মানবী তামান্না, আমি, শাহীন রহমানসহ আমরা বেশ ক’জন একবার শীতকালীন ক্রীড়া প্রতিযোগিতায় উপজেলা ও জেলা লেভেলে খেলে বিভিন্ন ইভেন্টে সিলেটের সৈয়দ হাতিম আলী উচ্চ বিদ্যালয় মাঠে খেলার সুযোগ পাই। আমাদের ক্রীড়া শিক্ষক মৃদুল স্যার (এখনো পাগলা সরকারি মডেল হাইস্কুল এন্ড কলেজের কর্মরত) সম্ভবত অসুস্থ। তিনি যেতে পারবেন না। আমাদের নিয়ে যাওয়ার লোক নেই। এ বিষয়টি আমরা ফারুক স্যারের সাথে শেয়ার করলে স্যার অসুস্থ মৃদুল স্যারকে রাজি করিয়ে এক প্রকার জোর করে আমাদের সাথে পাঠিয়েছিলেন। একজন সহকারি শিক্ষক হয়ে তিনি এ কাজটি করেছিলেন। তামান্না সৈয়দ হাতিম আলীর মাঠ থেকেই বিকেএসপিকে ডাক পেয়েছিলো।
দৈনিক সুনামগঞ্জের খবরে ২০১৫ সাল থেকেই লিখছি। তখন স্যার আর পাগলায় নেই। পাগলা সরকারি মডেল হাইস্কুল এন্ড কলেজ (তৎকালীন পাগলা উচ্চ বিদ্যালয়) থেকে সুনামগঞ্জ শহরের বুলচান্দ উচ্চ বিদ্যালয়ের ইংরেজি শিক্ষক। নিয়মিত দু’টি স্থানীয় পত্রিকা পড়তেন তিনি। দৈনিক সুনামগঞ্জের খবর ও দৈনিক সুনামকণ্ঠ। প্রায়দিন সকালে ঘুমে থাকা অবস্থায় স্যার কল দিতেন। ‘ইয়াকুব, ভালো আছো? এই মাত্র তোমার নিউজটা পড়লাম। খুব ভালো লিখো তুমি। তোমার ম্যাডামকে পড়ে শুনালাম। তোমার ম্যাডামকে (স্যারের স্ত্রীকে) বলেছি, তোমাদের কত্ত বকা দিতাম আমি। বকেছি বলেই, আজকে তুমি এই জায়গায় এসেছো। তবে, তুমি ইংরেজির Tense বুঝতে কম। তোমার সন্তান—সন্ততি হলে তাদেরকে ইংরেজির প্রাণ Tense ও খঁুটিনাটিগুলো ধরে ধরে পড়াবে। তোমার লেখা আর তোমার বন্ধু শহিদ নূরের লেখা আমি মিস করি না।’ শহিদ নূর আহমদ আরটিভির সুনামগঞ্জ জেলা প্রতিনিধি। আমার কিশোরকালীন সময় থেকে বন্ধু। ফারুক স্যার জাতীয় পত্রিকারও নিয়মিত পাঠক ছিলেন।
শেষবার স্যারের সাথে দেখা হয়েছিলো সুনামগঞ্জের শহিদ জগৎজ্যোতি পাঠাগারের দু’তলায় সম্মেলন কক্ষে। একটি বই কোম্পানির প্রমোশন অনুষ্ঠানে জেলার দুইশোর বেশি শিক্ষক নেতা, প্রধান শিক্ষক, সহকারি শিক্ষক ছিলেন অনুষ্ঠানে। আমি পুরো অনুষ্ঠানটি পরিচালনা করেছিলাম। পঙ্কজ দা (দৈনিক সুনামগঞ্জের খবরের সম্পাদক পঙ্কজ কান্তি দে) ছিলেন ওই অনুষ্ঠানের বিশেষ অতিথি। অনুষ্ঠানটি আমি সঞ্চালনা করছি দেখে স্যারের সে কি আনন্দ। আমার ছাত্র, আমার ছাত্র বলে স্যারের সে কী আহ্লাদীপনা! অনুষ্ঠানের শেষের দিকে হঠাৎ করে স্যার জোরসে শ্লোগান দিয়ে উঠলেন— জয় বাংলা। সবাই স্যারের দিকে একনজর তাকিয়েছিলেন। ওই অনুষ্ঠানে অতিথিদের বক্তব্যের পরে স্যার আমাকে বললেন তিনি বক্তব্য দিবেন। কিন্তু তখন আমার হাতে সে সুযোগ ও সময় ছিলো না। অনুষ্ঠান শেষ করতে হবে বিধায় তাঁকে আর বক্তব্যের সুযোগ দিতে পারিনি। ফারুক স্যার তখন কিছু বলতে চেয়েছিলেন। বলতে পারেন নি। অব্যক্ত রয়ে গেলো স্যারের কথাগুলো। শোনা হলো না।
ওই দিনের কথা শোনা হলো না। ছাত্রাবস্থায়ও স্যারের কথা শোনতাম না। English Grammar, Tense, Dictionary বেশি পড়তাম না। যদি তখন স্যারের কথা শোনতাম আজ আমি হয়তো আরো ভালো কিছু করতাম। স্যারের অনেকটা কথাই আর শোনা হলো না। স্যার চলে গেলেন না ফেরার দেশে। এমন সংবাদ শুনবার জন্য একেবারেই প্রস্তুত ছিলাম না। কিন্তু শোনতে হলো। ভাগ্না ও সহপাঠী মানছুর আহমদ প্রথমে ফোন দিয়ে দুঃসংবাদটা দিলো। নিশ্চিত হওয়ার জন্য স্যারের অপর ছাত্র, সহকর্মী হেলাল আহমদের কাছ থেকে নিশ্চিত হই। সোমবার বিকালে স্যার সিলেটের একটি হাসপাতালে চিকিৎসাধীন অবস্থায় শেষ নিঃশ্বাস ত্যাগ করেন আমাদের সবার পরিচিত মুখ, ইংরেজি শিক্ষক জনাব ফারুক আহমদ। লিভার সংক্রান্ত সমস্যায় মৃত্যু হয় গুণী এ মানুষটির।
স্যারের আকস্মিক এ মৃত্যুতে আমরা গভীরভাবে শোকাহত। বিদেহী আত্মার মাগফিরাত কামনা করি। তৎকালীন পাগলা উচ্চ বিদ্যালয়ের ২০১০ সালের এসএসসি ব্যাচ্ বিশেষভাবে স্যারের কাছে ঋণী। দোয়া করি, আল্লাহ যেনো মানুষ গড়ার মহান এ কারিগরকে জান্নাতের সর্বোচ্চ স্থানে আসীন করেন। আমিন।