ফিরিয়ে দাও সেই হাওর

হাওরের জীবন হলো প্রকৃতির সাথে মিতালী পাতার জীবন। হাওরের জীবন মানে প্রকৃতির সাথে যুদ্ধ করে টিকে থাকা। হাওর অঞ্চলে যেদিন জনবসতি গড়ে উঠেছিল সেই দিনই বসতি স্থাপনকারী লোকজন এই সত্য জেনে ও মেনে হাওরের তীরে বা মধ্যখানে বসতি গড়ে তুলেছিলেন। বিস্তীর্ণ হাওরাঞ্চলে বর্ষায় মাছ ধরা আর শুকনা মৌসুমে বোরো চাষ করার জন্য এইসব পেশায় নিয়োজিত কৃষক ও মৎস্যজীবিদের হাওরের কাছাকাছি অবস্থান করাটাই ছিল প্রয়োজনীয়। হাওরে বসবাস করতে যেয়ে তারা প্রতিনিয়ত যেসব প্রতিকূলতার সন্মুখীন হয়েছেন নিজস্ব সৃজনশীলতা দিয়েই সেটি মোকাবিলা করেছেন। হাওর মধ্যবর্তী গ্রামগুলোর প্রধান সমস্যা ছিল বর্ষায় নিজেদের বাড়িঘরকে প্রবল ঢেউয়ের আক্রমণ থেকে রক্ষা করা। প্রকৃতি মানুষকে অনেক কিছু শিখায়। মানুষ প্রকৃতি থেকে নিজের প্রয়োজনীয় বস্তুটি আহরণ করার কৌশল শিখে। ওই শিক্ষা দিয়েই হাওরে বেড়ে উঠা এক জাতীয় বন, যেটি স্থানীয়ভাবে ‘চাইল্লা’ নামে পরিচিত, সেটিকে বাড়িঘর রক্ষার উপাদান হিসাবে হাতের কাছে টেনে নিলেন। হাওরের সংগ্রামশীল মানুষ দেখলেন এই বনটি বেশ লম্বা এবং শক্ত। তারা চাইল্লা বন আহরণ করে বাঁশের আড় ও মাটি দিয়ে চাইল্লা বনের বাঁধ তৈরি করলেন বসতবাড়ির হাওরমুখী অংশে। হাওরের বিশাল ঢেউ চাইল্লা বনের বাঁধে আছড়ে পড়ত। মূল বাড়ি রক্ষা পেত। এইভাবে যুগ যুগ ধরে হাওরের গ্রামগুলোকে রক্ষা করেছেন গ্রামবাসী চাইল্লা বন, বাঁশ ও মাটি ব্যবহার করেই। এই চাইল্লা বন শুধু বাড়ি ঘর রক্ষায়ই কাজে লাগত না। বরং কৃষক পরিবারের জ্বালানী হিসাবেও ব্যবহৃত হত এটি। হাওরের অনেক সম্পদ বিলুপ্তির সাথে এখন চাইল্লা বনও কমে গেছে। মানুষ চাহিদামত আর চাইল্লা বন পান না। তাই বাড়ি রক্ষায় চাইল্লা বনের ব্যবহারও কমে গেছে। এখন গ্রামের সম্পন্ন মানুষ বাড়ির হাওরমুখী অংশকে কংক্রিটের ব্লক দিয়ে রক্ষা করেন। কিছু গ্রামে সরকারি ও বেসরকারি উদ্যোগেও গ্রামে প্রতিরক্ষা দেয়াল তৈরি করে দেয়া হয়েছে। এরকমই হয়। প্রকৃতি থেকে একটি জিনিস বিলুপ্ত হয়, সেই স্থান দখল করে অন্য কিছু। পরিবর্তনের এই চিরসত্যম ধারায় জামালগঞ্জের ফেনারবাঁক ইউনিয়নের হটামারা গ্রামটি এখনও নিজেকে সম্পৃক্ত না করে সনাতনী চাইল্লা বনের উপর নির্ভরশীলতা বজায় রেখেছে। গতকাল দৈনিক সুনামগঞ্জের খবরে প্রকাশিত ‘প্রকৃতির উপাদান দিয়েই প্রকৃতিকে মোকাবিলা’ শীর্ষক প্রতিবেদন থেকে এই তথ্য জানা যায়। প্রতিবেদনের তথ্য অনুসারে হটামারা গ্রামের বাগহাটি ও টইগ্গাহাটিতে কোন ধরনের কংক্রিট ব্লক ব্যবহার করে বাড়ি রক্ষার চিত্র দেখা যায়নি। ওই দুই পাড়ার ১৭০ টির মতো পরিবার নিজেদের বসতবাড়ি রক্ষা করছেন চাইল্লা, বাঁশ আর মাটি ব্যবহার করেই। প্রকৃতির এই উদার উপহারটিকে হটামারা গ্রামে এখনও যেভাবে গ্রহণ করা হচ্ছে সেটি আনন্দদায়ক বটে। তবে কথা হচ্ছে যেভাবে চাইল্লা বন কমছে এবং এরকম বাঁধ তৈরি করতে আনুষাঙ্গিক খরচাধিক্যের কারণে প্রকৃতিনির্ভরশীলতার এই প্রক্রিয়াটি কতদিন চালু থাকবে সে নিয়ে কিন্তু আমাদের সন্দেহ রয়েছে।
হাওরের প্রকৃতি, প্রতিবেশ, সম্পদ ও বৈশিষ্ট্যগুলোকে আমরা ক্রমাগত ধ্বংস করে দিচ্ছি। এখন হাওরে মাছ নেই, বন নেই, পাখি নেই, গাছ-গাছালি নেই, এমনকি স্বচ্ছতোয়া নির্মল জলও নেই। হাওরকে নিজের চিরন্তন রূপে ফিরিয়ে আনার দাবিটি বেশ জোরালো। হাওরের জীবন ও অর্থনীতি রক্ষা তথা প্রকৃতির ভারসাম্য বজায় রাখার জন্যই সেই প্রকৃতিকে ফিরিয়ে দিতে হবে। হটামারা গ্রামের চাইল্লা বন দিয়ে বসত ভিটা রক্ষার দৃশ্য দেখে আমাদের মনে আশার সঞ্চার হয়েছে যে, আমরা ইচ্ছা করলে পুরো হাওরকেই আদি রূপে ফিরিয়ে আনতে পারব। দরকার শুধু শোভবোধ ও কার্যকর পরিকল্পনা।