ফিরে দেখা মে দিবস

শ্রমিক মালিক ভাই ভাই সোনার বাংলা গড়তে চাই। এই বাক্যবদ্ধকে প্রতিপাদ্য করে এবার সরকারিভাবে মহান মে দিবস উদযাপিত হয়েছে। নীতিবাক্য বা শ্লোগান হিসাবে ‘মালিক শ্রমিক ভাই ভাই’ এর যে মাহাত্ম্য সেটি যদি বাস্তবে দেখা যেত তা হলে জগৎ সংসারের চেহারাটাই যে পালটে যেত তা বলাই বাহুল্য। অথচ নিদারুণ পরিহাস হলো, যে মে দিবস আজ আন্তর্জাতিক শ্রমিক দিবস হিসাবে বিশ্বব্যাপী উদযাপিত হচ্ছে তার মূলে কিন্তু ছিল মালিক-শ্রমিক সম্পর্কের মধ্যে চরম অমানবিক বৈষম্যযুক্ত ব্যবস্থা। সেদিন শ্রমিকরা ওই অমানবিক শ্রম শোষণ প্রথার বিরুদ্ধে দাঁড়িয়ে ন্যুনতম অধিকার প্রতিষ্ঠার লড়াই করেছিলেন। এই লড়াই সংগ্রাম করতে যেয়ে তারা মালিকের লেলিয়ে দেয়া বাহিনির হিং¯্র আক্রমণের শিকার হয়ে প্রাণ বিসর্জন দিয়েছিলেন। অবশ্য প্রাণের বিনিময়ে কিছু শ্রমিক অধিকার প্রতিষ্ঠিত হয়েছিল, যার মধ্যে ৮ ঘণ্টা কাজের নিয়মটি অন্যতম। আমরা এর পর পৃথিবীর বহু পরিবর্তন দেখেছি। ধনতন্ত্রের অগ্রযাত্রার জয়রথ থামিয়ে শ্রমিক শ্রেণির পার্টির নেতৃত্বে বিপ্লব হতে দেখেছি সোভিয়েত ইউনিয়নে। সেই ভাবাদর্শে চীনসহ আরও কিছু দেশে বৈপ্লবিক বা শান্তিপূর্ণ প্রচেষ্টায় সমাজতন্ত্র কায়েম হয়েছে। সমাজতান্ত্রিক ওই বিশ্বব্যবস্থার মূল দর্শন ছিল শ্রেণিগত সাম্য প্রতিষ্ঠার অভিলাষ। কিন্তু সমাজতান্ত্রিক বিপ্লবের মাধ্যমে শ্রেণিদ্বন্দ্ব চূড়ান্তভাবে নিষ্পত্তি ঘটে না, ঘাপটি মেরে লুকিয়ে বসে থাকে শোষক শ্রেণি, অনুকূল সময় পেলে সে তার লুকানো দাঁত ও নখ বের করে বৈপ্লবিক অর্জনকে ধ্বংস করে দিতে চায়। তাই হতে দেখেছি আমরা। প্রবল পরাক্রান্ত সোভিয়েত রাষ্ট্রব্যবস্থায় সমাজতন্ত্রের পতন, চীনসহ অপরাপর সমাজতান্ত্রিক রাষ্ট্রেও একই ধরনের ধস ইতিহাসের উল্টো যাত্রার মতোই মানব জাতির ইতিহাসকে চরম দ্বন্দ্বমুখরতার মধ্যে নিয়ে গেছে। এতদসত্বেও আজও শ্রমিক অধিকারের কথা উচ্চারিত হয়। আজও শ্রমিকরা নিজেদের দিনে নিজেদের দিকে ফিরে তাকান, তারা শ্রমিক শ্রেণির ঐতিহাসিক দায়িত্ব কর্তব্যের প্রতি সচেতন হন। এই জায়গায় মালিক শ্রমিক ভাই ভাই শ্লোগানটি শুনতে ভাল লাগলেও এর অন্তর্নির্হিত আপাত অসাড়তার দিকটি সম্পর্কে সচেতন না থাকলে বিপদ বৈকি।
বাংলাদেশের শ্রম বাজারের দিকে দৃষ্টিপাত করলে দেখা যায়, আজ সবচাইতে শ্রমঘন শিল্প গার্মেন্টস সেক্টর চরম মজুরি বৈষম্যের শিকার। এখানে রপ্তানি আয়ের খুব সামান্য অংশই মজুরি খাতে পরিশোধিত হয়ে থাকে। লাভের মোটা অংশ ঢুকে যায় মালিকের পকেটে। গার্মেন্টস সেক্টরে সেইভাবে সিবিএ সংগঠন গড়ে তোলার সুযোগ দেয়া হচ্ছে না। অথচ এ নিয়ে কোন কথা নেই। এই কথা না বলে মালিক শ্রমিকের মধ্যে ভাই ভাই সম্পর্ক প্রতিষ্ঠা করা কোন উপায়ে সম্ভব সেটি চিন্তা করতে হবে। শ্রমিক নেতৃত্ব আজ নানা ধরনের সুবিধাবাদ দ্বারা আক্রান্ত। প্রকৃত শ্রমিক রাজনীতির বদলে নানা ধরনের উপরি উপার্জন, লেজুরবৃত্তি, প্রভাববলয় তৈরি; এমনসব জিনিস এখন হয়ে গেছে স্বাভাবিক।
মে দিবসের মূল তাৎপর্য হচ্ছে একটি শ্রেণি কর্তৃক অন্য শ্রেণির উপর যাবতীয় শোষণ নির্যাতনের অবসান ঘটিয়ে একটি সুষম ও বৈষম্যহীন সমাজ ব্যবস্থা কায়েম করা। আমাদের মহান মুক্তিযুদ্ধের অমর চেতনাও সেটিই ছিল। তাই মে দিবসের প্রতিপাদ্য হিসাবে ‘মালিক শ্রমিক ভাই ভাই’ শব্দবদ্ধের মধ্যে লুকিয়ে থাকা শ্রেণিহীন চির আকাক্সিক্ষত সেই অনুপম সমাজের চিত্রটিই আমরা খুঁজে নিতে চাই।