ফুটবলের পরাজয় চরম গরমে

এনাম আহমদ
(পূর্ব প্রকাশের পর)
দোহা যে সময় পৌঁছালাম, ততক্ষণে কাতার বিশ্বকাপে প্রথম ম্যাচ হেরে গেছে। চারিদিকে শুনশান নিরবতা। খাটি করুণ বাস্তবতা! কাতার আবার জেগে উঠে আজ! কাতারে ৪ লাখ বাঙালির বেশির ভাগই আর্জেন্টিনার। এখানে গাড়ি তুলনামূলক সস্তা। অনেক বাঙালির ব্যক্তিগত গাড়ি রয়েছে। সকাল থেকেই অসংখ্য গাড়ি আর্জেন্টিনার পতাকা লাগিয়ে ঘোরাঘুরি করতে থাকে। আমি থাকছি অ্যাড. পংকজের ভাতিজা তাপসের বাসায়। তার আশ্রয়ে থাকছি একেবার সাশ্রয়ে! বাসাটি দোহা সিটির একেবারে কেন্দ্রস্থলে, এলাকাটির নাম নাজমা। সকালে ঘুম থেকে উঠেই বেড়িয়ে পড়ি। নাজমা এলাকাটি পুরোপুরি বাঙালিদের দখলে। অসংখ্য বাঙালি। বাংলায় একটা শব্দ উচ্চারণ করলে তা আর মাটিতে পড়ে না! কোন না কোন বাঙালি তা লুফে নেয়। আজকের আর্জেন্টিনা বনাম সৌদি আরবের ম্যাচটি ছিলো লুসাইলের আল- বায়াত স্টেডিয়ামে। লোহারির মতো এক অদ্ভুত স্টেডিয়াম। নতুন তৈরি কাতারের সবগুলো স্টেডিয়ামগুলোকে নিয়ে এতো বেশি নিউজ -ভিডিও হয়েছে যে, আল-বায়াত স্টেডিয়ামকে দেখে মনে হয়েছে, এটি আগেও অনেক দেখেছি! যাইহোক মূল সড়কে এসে একজনকে জিজ্ঞেস করলাম লুসাইলে কিভাবে যাব? বাংলাদেশ থেকে খেলা দেখতে এসেছি জেনে তিনি বাহবা দিলেন। উনার নাম শফিক, বাড়ি মানিকগঞ্জে। তিনি নিজে টেক্সি চালান। তব্ওু আমাকে পরামর্শ দিলেন মেট্রোরেলে যাওয়ার জন্য! স্টেশনে কিভাবে যাব সে পথও বুঝিয়ে দিলেন। আমি উনার দেখানো পথই ধরলাম। তখন সকাল ১০টা। রোদ চড়া হতে শুরু করেছে (মেসিরা খেলবে কিভাবে)। রাস্তার দুই পাশে দৃষ্টিনন্দন বহুতল ভবন। আরও কিছু সামনে একটি হাইস্কুল। স্কুলের দেয়াল তুলনামূলক উঁচু ও নানান ডিজাইনে বিন্যস্ত। এমনকি বাসাবাড়ির দেয়ালও এ রকমের দুর্গ দুর্গ ভাব থাকে। এটি সম্ভবত মধ্যপ্রাচ্যের ঐতিহ্যের অংশ। দুবাইয়েরও বিভিন্ন দেয়াল এরকমই দেখেছি। কিছু কিছু দেয়ালে বাংলায় বিজ্ঞাপন! রুমে সিট খালি আছে বা তেলাপোকা মেরে ফেলার ১০০%গ্যারান্টেড পাউডার! দ্বিতীয়টি শামীম ভাইয়ের জন্য দেশে নিয়ে আসতে হবে! পনের মিনিট হেটে মেট্রো স্টেশনে পৌঁছালাম। বাইরের কিছু অংশ এখনো অসম্পূর্ণ তবে ভেতরটা অসম্ভব ঝকঝকে তকতকে! বিশ্বকাপ উপলক্ষে এই মেট্রোরেল তৈরি করা হয়েছে এজন্যই এটি পৃথিবীর সর্বাধুনিক। আমরা যারা খেলার কার্ডধারি, তাদের জীবন কাতারে বর্তমানে রাজা-বাদশার মতো! কার্ডধারীদের আলাদা রাস্তায় প্রবেশ এরং প্রস্থান এরং একদম ফ্রি! খেলা কাতার সময় দুপুর ১টায়। এ সময় গরম থাকে চরমে, এ কথা মনে রাখলে ভালো হয়! আর সৌদি আরব গরমের দেশ। আপনারা আবার অন্যকিছু মনে করবেন না। ১০টাতেই মেট্রোরেলে আর্জেন্টিনার সমর্থকরা জড়ো হতে শুরু করলাম। সৌদি আরব যেহেতু কাতার প্রতিবেশী দেশ এবং গাড়ি চালিয়েও যায়, তাই তাদের সমর্খকরাও সংখায় কম নয়। মেট্রো স্টশনে অসংখ্য স্বেচ্ছাসেবক। তারা স্বেচ্ছায় আমাদের গতি পথ দেখিয়ে দিলেন। একটি ট্রেন এসে থামতেই আমি লাফ দিয়ে উঠে মহাবিপদে পড়লাম! বিপদে পড়বো জানতাম, কিন্তু তার জন্য তো সারাদিনই পড়ে ছিলো! দেখি পুরো কামরা সৌদি সমর্থকদের দখলে। শুধু তিনজন সাদা চামড়ার জার্সিধারী আর্জেনটাইন। আর আমি আর্জন্টিনার জার্সিতে এক কালো বাঙালি! সাথে সাথে আমি নামার চেষ্টা করলাম, কিন্তু ট্রেনের দরজা অটো বন্ধ হয়ে গেল! এ যেন বাঘের খাচায় আটকা পড়লাম! সৌদিরা কিলাকিলি শুরু করলে সব কিল আমার পিঠেই পড়বে বুঝতে পারলাম। সৌদিরা বলবে আর্জেন্টিনার মানুষ নিজেদের জার্সি পড়ে তার দেশকে সাপোর্ট করবে, কিন্তু তোমার বিষয় কী? ব্যাঙ্গাতœক কন্ঠে সৌদি তরুণরা কিছুক্ষণ গান, কিছু সময় শ্লোগানের মাধ্যমে আমাদের একেবারে কোনঠাসা করে ফেললো! শুনেছিলাম কাতারের আইন-শৃঙ্খলা অত্যন্ত কঠোর। মনে মনে প্রমাদ গুনলাম। যা হোক দশ মিনিট পরে পরবর্তী স্টেশনে ট্রেন থামলো। আমার মনে হয়েছিল যেন দশঘন্টা এভাবে গেল! হ্যাঁ! এই স্টেশনে ১০/১২ জন আর্জেন্টাইন অরিজিন সমর্থক উঠলেন আমাদের কামরায়। প্রায় সত্তর উর্দ্ধ সবাই। তবে কি প্রাণশক্তি আর ফিগার একেক জনের! আমি নিশ্চিত, এদের কেউ কেউ আর্জেন্টিনা দলে ম্যারাডোনার সঙ্গে খেলেছেন! আর যায় কোথায়! আমরা পাল্টা আঘাত করলাম। সৌদিরা তারপরেও কিছু সময় ফাইট দিলো! আমি তখন আবার আতঙ্কিত, হাতাহাতি হয়ে যায় কি-না! শেষে পুলিশ এসে আমাকে ধরে নিয়ে যাবে! পরে আমাদের চিৎকার শুরু হলো মেসি মেসি বলে! সৌদিরা এই পর্যায়ে রণে ভঙ্গ দিলো। প্রায় ২৫ মিনিট পরে গন্তব্যে পৌঁছে যে দৃশ্য দেখলাম…! আজ গন্তব্যের এ দৃশ্যগুলো থাক। নতুন গন্তব্যের কথা বলি! বিশ্বকাপের কার্ডধারীদের সম্মানে মধ্যেপ্রাচ্যের সব দেশ তার বর্ডার উন্মুক্ত করে দিয়েছে! কাল চলে যাব জর্ডানে! গিয়ে দেখি মধ্যপ্রাচ্যে শান্তি আলোচনার কী অবস্থা! সৌদি আরব যে অশান্তি শুরু করলো! (চলবে)
লেখক : আইনজীবী, বাংলাদেশ সুপ্রীম কোর্ট