ফুটবল বিশ্বকাপ/ ভিন দেশের প্রতি সমর্থন আর কত?

গতকাল বর্ণাঢ্য আনুষ্ঠানিকতার মধ্য দিয়ে সূচিত হলো বিশ্বের সবচাইতে জনপ্রিয় খেলার আসরÑ বিশ্বকাপ ফুটবল। মধ্যপ্রাচ্যের ছোট্ট ধনাঢ্য দেশ কাতারে খেলা হওয়ার কারণে বাংলাদেশসহ এশিয়ার মানুষ মোটামুটি স্বচ্ছন্দে খেলা দেখতে পারবেন। ইউরোপ বা দক্ষিণ আমেরিকায় খেলা হলে অধিকাংশ খেলা রাতের শেষ ভাগে হওয়ায় ইচ্ছা থাকলেও অনেকে নান্দনিক ফুটবল শৈলী দেখতে পারতেন না। এবার অধিকাংশ খেলাই রাতের প্রথম থেকে মধ্যভাগের ভিতরেই আয়োজিত হবে বিধায় এশিয়ার মানুষ দৈনিক কর্মসূচির হেরফের না করেই ফুটবল বিনোদনে অংশ নিতে পারবেন। সামনের মাসখানেক সময় ফুটবল ছাড়া বাঙালি মধ্যবিত্তের মনে আর কোনো ভাবনা কাজ করবে না। দৈনন্দিন হতাশা আর দুর্ভাবনা থেকে খানিক স্বস্তি খুঁজে নিবেন তারা টিভি পর্দায় নব্বই মিনিটের ফুটবল উত্তেজনায়।
বিশ্বকাপ এলেই বাংলাদেশে প্রিয় দলের সমর্থনে সমর্থকদের মধ্যে এক ধরনের উন্মাদনা লক্ষ্য করা যায়। যে যার মত করে সমর্থিত দলের পক্ষে উচ্ছ্বাস প্রকাশ করে। প্রিয় দলের পতাকা টানায়, জার্সি গায়ে পরে, মিছিল করে, একসাথে বড় পর্দায় খেলা দেখে, তর্ক-বিতর্কে মেতে উঠে, চুলচেড়া বিশ্লেষণের মাধ্যমে প্রতিটি খেলার আদ্যোপান্ত আবিস্কার করে, আরও কত কী করে। পৃথিবীর আর কোনো দেশে এমন উন্মাদনা রয়েছে কিনা আমরা জানি না। ফুটবল বিশ্বকাপ এলেই আর্জেন্টিনা বা ব্রাজিলের পতাকায় পাড়া মহল্লা ছেয়ে যায়। মেসি, নেইমারদের পোস্টারে ভরে উঠে চারপাশ। এই সমর্থকরা অন্য কোনো সময়ে ভুলেও আর্জেন্টিনা বা ব্রাজিলের খবর রাখে না। অনেকে হয়তো জানেও না এই দেশ দু’টি কোন মহাদেশের, বা দেশ দুইটির আর কী বিশেষত্ব রয়েছে। কিন্তু বিশ্বকাপ আসলেই তারা সকলেই একএকজন আর্জেন্টিনা বা ব্রাজিল বিশেষজ্ঞ হয়ে উঠেন। ক্রিস্টিয়ানো রোনালদোর কারণে পর্তুগাল ও ব্যাপক বাঙালি প্রবাসীর কল্যাণে ইংল্যান্ডেরও কিছু সমর্থকগোষ্ঠী আছে আমাদের দেশে। এই যে ফুটবল উন্মাদনা বা সমর্থিত দলের পক্ষে এতটা উচ্ছ্বাস এর কারণ কী? কারণ একটাই, ফুটবল সকলের মনের মধ্যে জীবন্তভাবে অবস্থান করা এক ভালোবাসার নাম। ফুটবলকে গণমানুষের খেলা বলা হয়। তাই ফুটবল উত্তেজনার সাথে আর কোনো খেলার তুলনা করা যায় না। একসময় আমাদের দেশে যখন শক্তিশালী ফুটবল খেলার ধারা চালু ছিলো তখন বিভিন্ন ক্লাবের নামে এমন উন্মাদনা লক্ষ্য করা যেত। আবাহনী, মোহামেডান ক্রেজ সকলের জানা কথা। আজ দেশে ফুটবলের সে সুদিন নেই। বিশ্বকাপ অনেক দূরে, এশিয়া কাপ কিংবা সাফেও আমাদের দেশের অবস্থা একেবারেই খারাপ। নিজের দেশ প্রতিযোগিতায় থাকলে কেউই অন্য দেশের নামে জয়ধ্বনি দিয়ে দুধের স্বাদ ঘোলে মেটাতো না। ক্রিকেটের বেলায় আমরা দেখেছিÑ বাংলাদেশের উত্থানের আগে যে পাকিস্তান বা ইন্ডিয়া ক্রেজ ছিলো তা এখন নেই, এখন কেবলই বাংলাদেশ ক্রেজ। বাংলাদেশি সমর্থকদের এই উন্মাদনা মূলত দেশের ক্রমাবনতিশীল ফুটবল বাস্তবতার প্রতি চরম হতাশার বহিঃপ্রকাশ মাত্র। এর মধ্য দিয়ে ফুটবল অনুরক্তরা কেবল একটি জিনিসই বুঝাতে চান, তা হলোÑ আমাদের প্রিয় দেশটিও বিশ্ব ফুটবলের উন্নয়নের ধারায় যুক্ত হোক। এই আকুতি কবে বুঝবেন ফুটবল কর্তারা?
এত বিশাল ফুটবল অনুরক্তের দেশে ফুটবলের কোনো উন্নতি নেই, এর চাইতে দুর্ভাগ্যজনক বাস্তবতা আর কিছু নেই। ভালো বা দক্ষ খেলোয়ার নেই বলে যারা গলা ফাটান তাদের আসলে বলতে হবেÑ খেলোয়ার তৈরি করার ন্যূনতম পদ্ধতিই আসলে নেই আমাদের দেশে। আঠার কোটি মানুষের দেশে পরিকল্পনা নিয়ে একটি বিশ্বমানের ফুটবল দল তৈরি করা সম্ভব নয়, এমন কথা কেউ বিশ্বাস করেন না। অন্য দেশের পতাকা টানিয়ে জার্সি গায়ে পড়ে জয়ধ্বনি দিয়ে দেশের বিশাল ফুটবলপ্রেমী গোষ্ঠী আসলে এই বার্তাই দিতে চান।