ফেব্রুয়ারি মাসের ভিজিএফ’র চাল বিতরণ নিয়ে বিভ্রান্তি

বিন্দু তালুকদার
পৌরসভার ৩ হাজার ভিজিএফ কার্ডধারী ফেব্রুয়ারি মাসের ৩ হাজার কার্ডের বিপরীতে উত্তোলিত ৯০ মে. টন চাল ও ১৫ লাখ নগদ টাকা বিতরণ নিয়ে পক্ষে-বিপক্ষে বলছেন কাউন্সিলররা। পৌরসভার ৬ কাউন্সিলরের দাবি এই চাল ও টাকা আত্মসাৎ হয়েছে । অন্যরা বলছেন,‘মিথ্যা অভিযোগ’।
সুনামগঞ্জ পৌরসভার মেয়র আয়ুব বখ্ত জগলুল’এর অকাল মৃত্যুর কারণে ঐ মাস থেকেই পৌরসভার ভারপ্রাপ্ত মেয়র ছিলেন পৌর কাউন্সিলর (প্যানেল মেয়র) হোসেন আহমদ রাসেল। কাউন্সিলররা দাবি করেছেন, হোসেন আহমদ রাসেলই এই চাল ও টাকা আত্মসাৎ করেছেন। গত ১৩ মে পৌরসভা ভিজিএফ কমিটির সভায় ফেব্রুয়ারি মাসের চাল বিতরণ না করার বিষয়টি উত্থাপন করেছেন একাধিক কাউন্সিলর। পৌর কাউন্সিলররা দাবি করেন উপকারভোগীদের সঙ্গে কথা বললেই এই অনিয়মের সত্যতা পাওয়া যাবে। অপরদিকে তৎকালীন ভারপ্রাপ্ত মেয়র হোসেন আহমদ রাসেল ও তাঁর পক্ষের কাউন্সিলররা বলেছেন,‘জানুয়ারি-ফেব্রুয়ারির চাল একসঙ্গে বিতরণ হয়েছে।’
পৌর এলাকার ময়নার পয়েন্টের বাসিন্দা রফিকুল ইসলাম কালা মিয়া বলেন,‘ গত ফেব্রুয়ারি মাসের ভিজিএফ কার্ডের চাল আমাদের এলাকার কেউ পায়নি। কবে চাল বিতরণ করা হয়েছে আমরা জানি না। ’
সুনামগঞ্জ পৌরসভার ২ নং ওয়ার্ডের কাউন্সিলর সৈয়দ ইয়াছিনুর রশিদ বলেন,‘পৌরসভায় মোট ৩ হাজার ভিজিএফ কার্ড রয়েছে। গত ফেব্রুয়ারি মাসের ৯০ মে. টন চাল ও ১৫ লাখ টাকা বণ্টন না করে আত্মসাৎ করেছেন সাবেক ভারপ্রাপ্ত মেয়র হোসেন আহমদ রাসেল। চাল ও টাকা বিতরণের কোন মাস্টাররোলে আমরা স্বাক্ষর করিনি। আত্মসাতের বিষয়টি সকল কাউন্সিলরই জানেন। এই ঘটনার তদন্ত হওয়া প্রয়োজন।’
৩ নং ওয়ার্ডের পৌর কাউন্সিলর ফজন নুর বলেন,‘ডিসেম্বর ও জানুয়ারি মাসের পর কোন চাল বিতরণ করা হয়নি। ফেব্রুয়ারি, মার্চ ও এপ্রিল মাসের চাল বিতরণ এখনো হয়নি। ’
৮ নং ওয়ার্ডের পৌর কাউন্সিলর আহমদ নূর বলেন,‘ফেব্রুয়ারি মাসের চাল উত্তোলন করা হয়েছে অনেক আগেই। নগদ ১৫ লাখ টাকার মধ্যে পৌর নির্বাচনের আগে ৫ লাখ ও নির্বাচনের পরে ১০ লাখ টাকা উত্তোলন করা হয়। ওই ৯০ টন চাল ও ১৫ লাখ টাকা দরিদ্রদের মাঝে বিতরণ করা হয়নি। কিন্তু সাবেক ভারপ্রাপ্ত মেয়র জানিয়েছেন তিনি নাকি চাল ও টাকা বিতরণ করেছেন। এই বিষয়টি নিয়ে গত ১৩ মে ভিজিএফ কমিটির সভায় ব্যাপক আলোচনা হয়েছে। বর্তমান মেয়র সাহেব বলেছেন- মার্চ ও এপ্রিল মাসের চাল বিতরণের পর এই বিষয়টি তিনি দেখবেন।’
৯ নং ওয়ার্ডের পৌর কাউন্সিলর খোরশেদ আলম বলেন,‘ফেব্রুয়ারি মাসের ৩০ কেজি চাল ও নগদ ৫০০ টাকা কাউকে দেয়া হয়নি। ’
সংরক্ষিত ১, ২ ও ৩ নং ওয়ার্ডের কাউন্সিলর সুজাতা রানী রায় বলেন,‘জানুয়ারি মাসের পর কোন চাল বা টাকা বিতরণ হয়নি। ভারপ্রাপ্ত মেয়র বললেই হবে নাকি ? কেউ চাল ও টাকা পায়নি। আমরা শুনেছি ফেব্রুয়ারি মাসের সব চাল তোলে বিক্রি করা হয়েছে। ফেব্রুয়ারি মাসের ১৫ লাখ টাকাও ব্যাংক থেকে তোলা হয়েছে। গত সভায় সাবেক ভারপ্রাপ্ত মেয়র দাবি করেছেন ফেব্রুয়ারি মাসের চাল-টাকা বিতরণ করেছেন। আমরা তাৎক্ষণিক প্রতিবাদ করে বলেছি চাল ও টাকা পায়নি কেউ, সবকিছু আত্মসাৎ করা হয়েছে।’
সংরক্ষিত ৭, ৮ ও ৯ নং ওয়ার্ডের কাউন্সিলর জাহানারা বেগম বলেন, ‘ফেব্রুয়ারির চাল ও টাকা না পেয়ে সাধারণ মানুষ দোষারোপ করে বলছেন-আমরা পৌর কাউন্সিলররাই নাকি সবকিছু বন্টন করে নিয়ে গেছি। অথচ আমরা কিছুই জানি না ও মাস্টাররোলে কোন স্বাক্ষর করি নি। উপকারভোগীদের কাছে কোনো কার্ডও নেই। ’
পৌরসভার ৫ নম্বর ওয়ার্ডের কাউন্সিলর গোলাম সাবেরীন সাবু বলেন,‘জানুয়ারি ও ফেব্রুয়ারি মাসের চাল একসঙ্গে বিতরণ করা হয়েছে। বিতরণ হয়নি এমন অভিযোগ মিথ্যা। উপকারভোগীদের জিজ্ঞেস করলেই এই বিষয়ে জানা যাবে।’
সুনামগঞ্জ পৌরসভার সাবেক ভারপ্রাপ্ত মেয়র হোসেন আহমদ রাসেল অবশ্য বলেছেন,‘ফেব্রুয়ারি মাসের ৩ হাজার ভিজিএফ কার্ডের চাল ও নগদ টাকা বিতরণ করা হয়েছে। পরশ্রীকাতরতায় কয়েকজন কাউন্সিলর এসব মিথ্যা অপপ্রচার করছে। ফেব্রুয়ারি মাসের চাল-টাকা বিতরণের মাস্টাররোল রয়েছে এবং বিষয়টি জেলা প্রশাসনসহ সংশ্লিষ্ট সবাই অবগত আছেন। মার্চ মাসের চাল উত্তোলন করে গোদামে রাখা হয়েছে। এপ্রিল মাসের চাল সরকারি গোদামে আছে। মার্চ ও এপ্রিল মাসের ৩০ লাখ টাকা উত্তোলন করে ব্যাংকে জমা রাখা হয়েছে।’ তিনি আরও বলেন,‘যারা ভিজিএফের চাল ও টাকা বিতরণ নিয়ে এসব অভিযোগ করছেন- তারা কোন সময়ই মাস্টাররোলে স্বাক্ষর করেন না। গত ভিজিএফ কমিটির সভায় তারা এসব বিষয়ে কথা বলতে চেয়েছিল। উপস্থিত অধিকাংশ কাউন্সিলর কড়া প্রতিবাদ করেছেন।’
সদর উপজেলা খাদ্য নিয়ন্ত্রক আব্দুর রউফ বলেন,‘ ভিজিএফ-এর চাল উত্তোলন না করে গোদামে ফেলে রাখা বা নিজেদের কাছে মওজুদ রাখার কোন সুযোগ নেই। এপ্রিল মাস ছাড়া সুনামগঞ্জ পৌরসভার অন্য মাসের শতভাগ চাল উত্তোলন করা হয়েছে। শুধুমাত্র এপ্রিল মাসের চাল আমাদের কাছে রয়েছে। আমরা পৌরসভার মেয়রকে অনুরোধ করেছি চালগুলো দ্রুত নিয়ে যাওয়ার জন্য।’ বর্তমান বাজার মূল্যের হিসাবে ৯০ মে.টন চালের মূল্য প্রায় সাড়ে ৩ কোটি টাকা।
সুনামগঞ্জ পৌরসভা ভিজিএফ কমিটির সদস্য সুনামগঞ্জ সদর হাসপাতালের চিকিৎসক আবুল কালাম বলেন,‘ গত সভায় ফেব্রুয়ারি মাসের চাল ও টাকা নিয়ে কথা হয়েছে। কেউ বলছেন বিতরণ করা হয়নি, আবার কেউ বলেছেন বিতরণ করা হয়েছে। তবে এই বিষয়ে কোন সিদ্ধান্ত গৃহিত হয়নি।’
বর্তমান পৌর মেয়র নাদের বখত বললেন,‘ফেব্রুয়ারি মাসের ভিজিএফের চাল ও টাকা বিতরণের বিষয়ে আমি অবগত নই। কারণ আমি দায়িত্বগ্রহণ করেছি এর অনেক পরে। দুই মাসের চাল ও নগদ টাকা কয়েকদিনের মধ্যে একসাথে বিতরণ করা হবে। ’
জেলা ত্রাণ কর্মকর্তা ফরিদুল হক বলেন,‘ ভিজিএফের চাল ও টাকা উত্তোলন করে নিজেদের কাছে রাখার সুযোগ নেই। সুনামগঞ্জ পৌরসভার কোন মাসের চাল-টাকা বিতরণ না করে আত্মসাত করা হয়েছে বলে অভিযোগ পাওয়া যায়নি। এ ব্যাপারে খোঁজ খবর নেব আমরা।’
জেলা প্রশাসক মো. সাবিরুল ইসলাম বলেন,‘ ভিজিএফের চাল বিক্রি বা আত্মসাতের কোন সুযোগ নেই। এ ঘটনায় কেউ লিখিত অভিযোগ করলে তদন্ত করে প্রয়োজনীয় ব্যবস্থা নেয়া হবে।’
সুনামগঞ্জের বোরো ফসলহানির পর গত বছর জেলায় বিশেষ ভিজিএফ বরাদ্দ দেয়া হয়েছিল ১ লাখ ৬৮ হাজার পরিবারকে। প্রতি মাসে ওই পরিবারগুলোকে ৩০ কেজি চাল ও নগদ ৫০০ টাকা করে দেয়া হয়েছে। চলতি বোরো ফসল কৃষকের গোলায় ওঠায় এপ্রিল মাস থেকে ভিজিএফ কার্যক্রম বন্ধ হয়।