বঙ্গবন্ধুকে কাছ থেকে দেখা

বজলূল মজিদ চৌধুরী খসরু
সবকিছুই স্মৃতি থেকে লেখা। আজ থেকে প্রায় ৫৫ বছর আগে যুবক শেখ মুজিবুর রহমানকে সুনামগঞ্জে যেভাবে দেখেছিলাম। কালের আবর্তে তিনি হয়েছিলেন বঙ্গবন্ধু এবং জাতির পিতা। বঙ্গবন্ধুকে একদম কাছে থেকে দেখার এবং সামান্য সেবা করার কথা যখন মনে হয় তখন গর্বিত হই। তিনি তখন বঙ্গবন্ধু হননি ছিলেন শেখ মুজিবুর রহমান। এই মহান ব্যক্তিত্বকে এরকম কাছে থেকে দেখা তাকে নিজ হাতে খাবার পরিবেশন করা এগুলো এখন আমার কাছে গর্বের ধন। বিষয়টা নিয়ে কথা বলা বা লেখা একটু বিব্রতকর। ইতিপূর্বে মুক্তিযুদ্ধের মহান সংগঠন মরহুম হোসেন বখত স্মারকগ্রন্থে আমি ঘটনাটির চুম্বক অংশ লিখেছিলাম।
সেটা ছিল ১৯৬৪ সাল । আমি ক্লাস সেভেনে পড়ি। আমাদের সংলগ্ন্র পূর্বের বাসাটা সৈয়দ শামসুল আলম মোক্তার সাহেবের। মোক্তার সাহেবের মূল বাড়ি জগন্নাথপুর থানার সৈয়দপুর গ্রামে। বিয়ে করেছিলেন সুনামগঞ্জ পৌরসভার এক সময়ের চেয়ারম্যান মরহুম আবু হানিফা আহমদ (নবাব মিয়া) সাহেবের বোনকে। এখানেই তিনি বাড়ি তৈরি করে আইন ব্যবসা করতেন। মোক্তার সাহেব সকাল হলেই আদালতে যেতেন। মাথায় তিনি জিন্নাহ ক্যাপ পরলেও সেটা পরার ধরন ছিল আলাদা। উল্টিয়ে ক্যাপটা পরতেন। এভাবে ক্যাপ পরতে আর কাউকে আমি দেখিনি। উনার সিগারেট খাওয়ার একটা আলাদা স্টাইল ছিল। দুই আঙ্গুলের ফাঁকে সিগারেটটা ধরতেন আর ফুঁকতেন। কোর্ট থেকে আসার সময় পথে পথে রিকসা থামিয়ে বাজার করতেন। বাসায় এসে সামনের পুকুরে মাছ ধরতে বসতেন। আর সেই সময় তার পাশে থেকে গল্প শুনতাম। আমি তাকে মামা ডাকতাম। একদিন মামা বললেন তাদের বাসায় অনেক মেহমান আসবেন। আমি যেন এই মেহমানদের খাওয়া দাওয়া পরিবেশনায় একটু খেদমত করি। তিনি জানালেন তার এক ভাই ছিলেন নোয়াখালির জেলা ও দায়রা জজ। সেখানে থাকা অবস্থায় জজ সাহেবের মেয়েকে একজন আইনজীবীর সাথে বিয়ে দিয়েছিলেন। সেই আইনজীবী এবং তার সাথীরা সুনামগঞ্জে রাজনৈতিক সফরে আসছেন। সেদিন মোক্তার সাহেব আর বেশি কিছু বলেন নাই। ঘন ঘন তিনি বাজারে যাচ্ছেন আর মোরগ, মাছ কিনে নিয়ে আসছেন। জামাই আসবেন তাই এন্তেজাম করতে হবে। সুনামগঞ্জে তখন প্রচুর মাছ পাওয়া যেত। তাই বিভিন্ন প্রকারের মাছ কিনে নিয়ে এসেছেন। আমি মেহমানদের খেদমত করতে উৎসাহিত হই। তবে এটার মূল কারণ ছিল, আর কিছু না হোক মেহমানরা চলে গেলে একটু ভাল খাওয়া যাবে। সকাল থেকে আমি মোক্তার সাহেবের বাসার চেয়ার, টেবিল সাজিয়েছি। তখনকার দিনে সতরঞ্চির ব্যবহার ছিল ব্যাপক ভাবে। আমাকে পাঠানো হল বাজারে সতরঞ্চি ভাড়া করে আনার জন্য। একটা উৎসব উৎসব আমেজ বিরাজ করছে মোক্তার সাহেবের বাসায়।
আইয়ুব খান তখন পাকিস্তানের প্রেসিডেন্ট। এরি মাঝে তিনি মৌলিক গণতন্ত্র নামে নুতন মতবাদ সৃষ্টি করেছেন। সমস্ত পাকিস্তানে ৮০ হাজার মৌলিক গণতন্ত্রী সদস্য নির্বাচিত (বিডি মেম্বার) হয়েছেন। এরাই নির্বাচিত করবেন দেশের প্রেসিডেন্ট সহ জাতীয় ও প্রাদেশিক পরিষদ সদস্য। আইয়ুব খানের রাজনৈতিক দলের নাম কনভেনশন মুসলিম লীগ। আইয়ুব খানের এই মতবাদের বিরোধিতা করছে বিরোধী দলগুলো। এই দলগুলোর মাঝে আছে আওয়ামী লীগ, ন্যাশনাল আওয়ামী পার্টি, নেজামে ইসলাম, জামাতে ইসলাম। এরা আইয়ুব খানের মৌলিক গণতন্ত্রী মতবাদের বিরোধিতা করে সারা দেশ চষে বেড়াচ্ছে। তাদের দাবি জনগণের সরাসরি ভোটে নির্বাচিত হবেন জাতীয় ও প্রাদেশিক পরিষদ সদস্যরা। ইতোমধ্যে আইয়ুব খান প্রেসিডেন্ট নির্বাচনের ঘোষণা দিয়েছেন। ১৯৬৫ সালের ২ জানুয়ারি এই নির্বাচন হবে। তিনি নিজে তার প্রার্থীতা ঘোষণা করেছেন। বিরোধী দলগুলোর রাজনৈতিকভাবে এই নির্বাচন বয়কট করার কথা থাকলেও কৌশলগত ভাবে নির্বাচনে প্রার্থী দেওয়ার কথা চিন্তা করতে লাগল। বিরোধী দলগুলো তাদের নিজেদের থেকে প্রার্থী দিতে না পেরে মাওলানা ভাষানী, খাজা নাজিম ্উদ্দিন এবং শেখ মুজিবুর রহমানের নেতৃত্বে এক প্রতিনিধিদল পাকিস্তানের জনক কায়েদে আজম মোহাম্মদ আলী জিন্নাহর বোন ফাতেমা জিন্নাহকে প্রার্থী হওয়ার প্রস্তাব করেন। ফাতেমা জিন্নাহ ছিলেন একজন দন্ত চিকিৎসক। পাকিস্তান আন্দোালনে তার ভাই মোহাম্মদ আলী জিন্নাহর সাথে থেকে বিভিন্ন সভা সমিতিতে অংশগ্রহণ করেছেন। পাকিস্তান হওয়ার পর কোন সক্রিয় রাজনীতিতে জড়িত ছিলেন না। সম্মিলিত বিরোধী দল তাঁকে প্রার্থী হিসাবে চাইলে তিনি রাজী হয়ে যান। এই নির্বাচন উপলক্ষে বিরোধী দলের নেতৃবৃন্দ সারা দেশে সভা সমিতি করতে থাকেন। কনভেনশন মুসলিম লীগের প্রার্থী আইয়ুব খানের মার্কা ছিল গোলাপ ফুল আর বিরোধী দলের প্রার্থী ফাতেমা জিন্নাহর মার্কা ছিল হারিকেন। এখনও মনে আছে আইয়ুব খানের পোষ্টারে একটা কবিতার পংক্তি ছিল “জোটে যদি মোটে একটি পয়সা খাদ্য কিনিও ক্ষুধার লাগি, দুটি যদি জোটে তবে ফুল কিনে নিও হে অনুরাগী”
দুপুরে সৈয়দ শামসুল আলম মোক্তার সাহেবের বাসায় মেহমানরা আসলেন। এই দলের মাঝে একজন মানুষকে দেখে আমি তাঁর দিকে তাকিয়ে আছি। মাঝে মাঝে তিনি একটি পাইপ টেনে ধোঁয়া ছাড়ছেন। কি সুন্দর চেহারা তাঁর। ব্যাক ব্রাস করা চুল। উন্নত নাসিকা, গায়ে সাদা পাঞ্জাবি। মনে হয় পাঞ্জাবিটার সাথে গায়ের চামড়ার একটা সাদৃশ্য আছে। আমি এক নজরে তাকিয়ে আছি তাঁর দিকে। কিছুক্ষণ পরে আসলেন সুনামগঞ্জের হোসন বখত সাহেব। তারা দুজনে কি জানি আলাপ করলেন। বখত সাহেব না খেয়েই চলে গেলেন। আমি মেহমানদের খাবার দাবার পরিবেশন করছি। মোক্তার সাহেবের জামাতাকে পরিচয় করিয়ে দিলেন। তিনি হলেন অ্যাডভোকেট মোহাম্মদ উল্লাহ (পরবর্তীতে রাষ্ট্রপতি হয়েছিলেন)। বিকালে মেহমানদের পুরাতন কলেজ প্রাঙ্গণে সভা আছে। তারা খেয়ে চলে যাবার পর মোক্তার সাহেবের কাছ থেকে জানলাম সুদর্শন লোকটা হচ্ছেন শেখ মুজিবুর রহমান। তিনি পাকিস্তান আওয়ামী লীগের সাধারণ সম্পাদক। সরকারের খুব একটা সুনজরে নেই তিনি। বেশিরভাগ সময়ই তাঁকে জেলে কাটাতে হয়। তাঁর সাথে আছেন তাজ উদ্দিন আহমদ। বিকালে তাদের সভা হবে পুরাতন কলেজের সামনে। সেদিন শেখ মুজিবুর রহমানের সভা বর্তমান আলফাত স্কয়ারের পার্শ্বে পুরাতন কলেজের সামনে। সেদিনকার সভায় সভাপতিত্ব করেছিলেন আকমল আলী মোক্তার সাহেব। শেখ মুজিবুর রহমানের বক্তৃতা শোনার জন্যই লোকজন অপেক্ষা করছেন। তাঁর জ্বালময়ী ভাষণ সেদিন উজ্জীবিত করেছিল মানুষদের। এক পর্যায়ে তিনি বলেছিলেন পূর্ব পাকিস্তানের ১৭ টি জেলার (তখন ১৭ জেলা ছিল) মধ্যে ১৬টি জেলা আমার দেখা হয়ে গেছে। একমাত্র সিলেট জেলা এখনও দেখা হয়নি। আজকের ভাষণের পরে হয়ত আমাকে সিলেট জেলে যেতে হবে। সভা শেষ করে বিকালেই রওয়ানা হয়ে গেলেন সিলেটের উদ্দেশ্যে। পরদিন শুনলাম সিলেট যাওয়ার পর রাষ্ট্র বিরোধী বক্তব্য দেওয়ার কারণে তাঁকে আবার গ্রেফতার করা হয়েছে।
এর পর বঙ্গবন্ধুকে দেখলেও সেটা অনেক দূর থেকে। ১৯৭০ সালের নির্বাচনে তিনি সুনামগঞ্জের ষ্টেডিয়ামে সভা করেছেন। সারা মাঠে মানুষ আর মানুষ। তারপরে লঞ্চে করে সুনামগঞ্জের বিভিন্ন থানা সফর করেছেন কিন্তু সব সময়ই দূর থেকেই তাঁর ভাষণ শুনতে হয়েছে। ১৯৭৩ সালে সুনামগঞ্জে আসলেন। সাথে তৎকালীন পররাষ্টমন্ত্রী আব্দুস সামাদ আজাদ এবং অভ্যন্তরিণ নৌ ও জাহাজ চলাচল মন্ত্রী আতাউল গণি ওসমানি। বঙ্গবন্ধুর হেলিকপ্টার ল্যান্ড করার জন্য হেলিপ্যড করা হয়েছে মল্লিকপুরে। আমি তখন দৈনিক পূর্বদেশের সুনামগঞ্জস্থ সংবাদদাতা। সেই হিসাবে একটি সিকুউরিটি পাস পেয়েছিলাম। মল্লিকপুরে হেলিপ্যাডে গেলেও খুব একটা কাছে যেতে পারিনি। নেতা কর্মীদের ভিড়ে আমরা সংবাদ কর্মীরা হারিয়ে গিয়েছিলাম।
১৯৭৫ সালের ১৫ আগস্ট আমি ঢাকায়। বঙ্গবন্ধুর বাড়ি ধানমন্ডি ৩২ নং এর কাছেই ৫নং রোডের উল্টোদিকে ভুতের গলিতে একটি মেসে থাকতাম। আমাদের বন্ধু অঞ্জন দেব (বর্তমানে চাটার্ড একাউটেন্ট) আর আমি মেসটিতে এক সাথে থাকতাম। আমাদের মেসে আলাউদ্দিন নামে একজন থাকতেন। তিনি একটা চকলেট ফ্যাক্টরিতে চাকুরি করতেন। আলাউদ্দিন সাহেবের একটা এক ব্যান্ড রেডিও ছিল। খুব সকালে তিনি ঘুম থেকে উঠে ফজরের নামাজ পড়ে রেডিওতে সংবাদ শুনতেন। আমাদের ঘুমের যাতে ব্যঘাত না হয় সেজন্য তিনি রেডিওর সাউন্ড কমিয়ে রাখতেন। ১৫ আগস্ট প্রথম বেতারে তিনি শুনছেন মেজর ডালিমের কথাগুলো। প্রথমে খুব একটা বিশ্বাস করতে পারিনি কিন্তু পরপর ডালিমের কথাগুলো শুনার পর আর থাকতে পারেননি।। ঘুম থেকে উঠে বেতারে মেজর ডালিমের বক্তব্য শুনে কান্না পাচ্ছিল। আমাদের মেস থেকে বের হয়ে রাস্তায় দেখি আরো লোকজন রাস্তায়। এরি মধ্যে আর্মির কনভয় চলাচল শুরু করেছে। মানুষের মাঝে একটি ভীতিকর পরিস্থিতির সৃষ্টি হয়েছে। কেউ তেমন কিছু স্পষ্ট করে বলতে পারছে না। অনেকে বলছে পুরো পরিবারকে হত্যা করা হয়েছে আবার কেউ কেউ বলছে এগুলো গুজব। পুরো বিষয়টাই অস্পষ্ট আমাদের কাছে। বিকালের দিকে সুনামগঞ্জের সাংসদ হাসনাত ভাই (আবুল হাসনাত আব্দুল হাই) এসেছেন। তিনি ছিলেন নাখালপাড়ার এমপি হোস্টেলে। বঙ্গবন্ধু হত্যার খবর পাওয়ার পরই সব সাংসদরা এমপি হোস্টেল থেকে বিভিন্ন জায়গায় চলে গেছেন। গ্রীন রোডে হাসনাত ভাই তার চাচার বাসায় এসেছিলেন। তিনি তার চাচার বাসায় থাকাটা নিরাপদ ভাবেননি। আমাদের মেসে এর আগেও তিনি এসেছিলেন । তাঁর কাছ থেকেই শুনলাম বঙ্গবন্ধু, তাঁর স্ত্রী ফজিলতুন্নেছা মুজিব, ছেলে শেখ কামাল, শেখ জামাল, শেখ রাসেল এবং শেখ কামাল ও শেখ জামালের স্ত্রীকে নৃশংসভাবে হত্যা করেছে একদল পথভ্রষ্ট সামরিক বাহিনীর সদস্যরা। সেদিনকার কথা স্মরণ হলে আজোও লোমকূপগুলো দাঁড়িয়ে যায়। বিশ্বাস করতে কষ্ট হয়। যার আহŸানে জীবন বাজী রেখে মুক্তিযুদ্ধে চলে গিয়েছিলাম, যাকে একদিন নিজ হাতে খাবার পরিবেশন করেছিলাম, তিনি নেই এই কষ্ট আজো অনুভব করি।
লেখক: বীর মুক্তিযোদ্ধা, সিনিয়র আইনজীবী ও উপদেষ্টা সম্পাদক, দৈনিক সুনামগঞ্জের খবর।