বঙ্গবন্ধুর কৃষকবান্ধব নীতিমালার কার্যকর বাস্তবায়ন দেখতে চাই

মাত্র সাড়ে তিন শতাংশ কৃষকের কাছ থেকে উৎপাদিত ধানের কিয়দংশ কিনে সরকার কৃষকদের কী প্রণোদনা দিতে চাইছেন তা আমাদের বোধগম্য নয়। তাও এই সাড়ে তিন শতাংশের মধ্যে অল্প সংখ্যকই নিজেরা সরাসরি গুদামে ধান বিক্রি করতে সক্ষম হবেন। বেশিরভাগ ধানই মধ্যস্বত্বভোগীরা বাগিয়ে নেবেন নানা কায়দায়। অর্থাৎ প্রকৃত অর্থে সরকার নির্ধারিত মূল্যে ধান বিক্রি করার কপাল এই দেশের কৃষক সমাজের হয়ে উঠেনি। তাই তারা মিলার বা ফরিয়াদের নিকট উৎপাদনের চাইতে মণপ্রতি দুই/তিন শ’ টাকা লোকসান দিয়েই ধান বিক্রি করতে বাধ্য হবেন। সেই ধানকে চাল বানিয়ে ওই মধ্যস্বত্বভোগীরা দ্বিগুণ লাভ বাগিয়ে নিবে। এই হচ্ছে দেশের খাদ্য নিরাপত্তা নিশ্চিতকারী কৃষক সমাজের বিধির লেখন। বিধির লেখন না বলেই বা উপায় কী। কারণ বিদ্যমান সামাজিক বাস্তবতায় এই অন্যায্যতার বিরুদ্ধে কার্যকর অর্থে সোচ্চার হতে দেখা যাচ্ছে না কোন সামাজিক-রাজনৈতিক শক্তিকে। পৃথিবীর বহু দেশে উৎপাদকদের প্রণোদনা তথা লোকসানের হাত থেকে বাঁচাতে সরকারের হস্তক্ষেপ করার নজির আছে। উপযুক্ত মূল্য দিয়ে কৃষকদের উৎপাদিত পণ্য সরকার কিনে নেয়। পরে প্রয়োজনে ভর্তুকি দিয়ে কম মূল্যে সেই পণ্য বাজারে বিক্রি করে। আমাদের দেশে সরকার যদি সব ধানও কিনে নেয় ১০৪০ টাকা মণ দরে তাহলেও লোকসানের কোন ঝুঁকি নেই। কারণ ১০৪০ টাকা দরে ধান কিনে সেই ধানকে চাল বানিয়ে যদি ১৫০০ টাকা মণ দরেও সরকার বিক্রি করে তাহলে ক্ষতির কোন ঝুঁকি থাকে না। বাজারে ১৫০০ টাকা চালের দাম থাকলে অকৃষক শ্রমজীবীরাও যারপরনাই খুশি হবে। এখন কৃষকদের বঞ্চিত করে বাজারে চালের দাম স্থিতিশীল রাখার যে কৌশল, সেটি সঠিকভাবে বাজারব্যবস্থ্য়া কার্যকর থাকছে না। কৃত্রিম কারসাজির মধ্য দিয়ে চালের দাম সারা বছরই গড়পড়তা ৪০ টাকা কেজি’র নীচে নামানো যাচ্ছে না।
সরকার যদি নিজে ধান কিনতে নাও পারে তাহলেও বিকল্প পদ্ধতি প্রয়োগের মাধ্যমে মুক্তবাজার অর্থনীতির কৃষক-সর্বনাশা চরিত্রকে রুখতে পারে। এক্ষেত্রে সংবিধানস্বীকৃত সমবায় পদ্ধতির কার্যকর করা যেতে পারে। এখন বাংলাদেশের প্রায় সকল গ্রামেই কৃষকদের সমবায় সমিতি আছে। যদিও এগুলোর সিংহভাগই এখন নিষ্ক্রিয় অবস্থায় পড়ে আছে। এই সমিতিগুলোকে সক্রিয় ও সক্ষম করে গড়ে তুলে তাদেরকে কৃষকদের উৎপাদিত পণ্যের ন্যায্যমূল্য পাওয়ার জন্য কাজে লাগানো যেতে পারে। উদাহরণ স্বরূপ, গ্রামের কৃষক সমবায় সমিতি ওই গ্রামের সকল কৃষকের বিক্রয়যোগ্য ধান একটি নির্দিষ্ট মূল্যে কিনে নিয়ে গ্রামেই গুদামজাত করে রাখতে পারে। সরকারের এই জায়গায় প্রতি গ্রামে একটি করে ছোট গুদাম তৈরি ও সমবায় সমিতিকে পুঁজি সরবরাহ করতে হবে। বাংলাদেশের বর্তমান অর্থনৈতিক সক্ষমতায় সেই কাজ তেমন কঠিন নয়। শুধু ধান নয়, এই প্রক্রিয়ায় কৃষকদের উৎপাদিত সকল পণ্যই সমবায় সমিতির মাধ্যমে বিক্রির ব্যবস্থা করতে পারে। এক্ষেত্রে মধ্যস্বত্বভোগী দালালচক্র, মজুদদার, মিলার, বড় ব্যবসায়ী প্রভৃতি শোষণমূলক ব্যবস্থার মূলোৎপাটন ঘটবে। এই প্রক্রিয়ায় সমবায় সমিতি গুদামজাতকৃত পণ্য বিক্রি করে যে মুনাফা অর্জন করবে তাও আবার কৃষকের হাতেই চলে যাবে। তবে এখানে সমবায় সমিতির ব্যবস্থাপনার বিষয়টি গুরুত্বপূর্ণ। সমবায় সংগঠনে যাতে কোনভাবেই দুর্নীতি না ঢুকে, সংগঠন যাতে পুরোপুরি গণতান্ত্রিক ও রাজনৈতিক প্রভাবমুক্ত থাকে সেই ব্যবস্থা করতে হবে। আমাদের মতো দেশে কখনও মুক্তবাজার অর্থনীতি চলতে পারে না। এই সত্য বঙ্গবন্ধু উপলব্ধি করেছিলেন। করেছিলেন বলেই দেশ স্বাধীন হওয়ার পর সমবায়কে সম্পদের মালিকানা অর্জনের তৃতীয় খাত হিসেবে সংবিধানে অন্তর্ভূক্ত করেছিলেন।
বঙ্গবন্ধুর সেই কৃষকবান্ধব নীতিমালার কার্যকর বাস্তবায়ন দেখতে চায় এই দেশের লক্ষ কোটি উৎপাদক কৃষক সমাজ।