বঙ্গবন্ধু ও বাংলাদেশ পরিকল্পনা কমিশন রাষ্ট্রীয় পরিকল্পনার ধারাবাহিকতা

এম এ মান্নান এমপি
বর্তমান বাংলাদেশ রাষ্ট্রের রূপরেখা ও কর্মপরিকল্পনা সাজিয়েছেন স্বয়ং জাতির পিতা বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমান। বঙ্গবন্ধুর চিন্তা, চেতনায় এবং কর্মে এ বিষয়টি সদা জাগ্রত ছিল। এদেশকে একটি সংগঠিত, পরিকল্পিত ও ন্যায়ানুগ রাষ্ট্র হিসাবে গড়ে তুলতে চেয়েছিলেন তিনি।
বাংলাদেশ রাষ্ট্র হওয়ার পেছনে আরেকটি প্রধান চালিকা শক্তি ছিল ব্যাপক জনগণের অর্থনৈতিক মুক্তি। ঐতিহাসিকভাবেই আমরা অর্থনৈতিকভাবে নিষ্পেষিত, পিছিয়ে পড়া এবং লুন্ঠিত ছিলাম। বঙ্গবন্ধু ও তাঁর সতীর্থরা বুঝতে পেরেছিলেন এ দুর্দশার প্রধান কারণ ঔপনিবেশিক লুন্ঠন ; সেটি রুখতে হবে এবং অর্থনৈতিক মুক্তি আনতে হবে। বঙ্গবন্ধু ও তখনকার বাঙালিরা সিদ্ধান্ত নিয়েছিলেন যে আমাদের মাটি, পানি আমাদের সকল সম্পদ আমাদের হাতে ফিরিয়ে আনতে হবে। তাহলেই কেবল আমরা অর্থনৈতিক অর্জন করতে পারব। আমাদের সবই আছে, কিন্তু কীভাবে এগুলো কাজে লাগাব- এই প্রশ্ন থেকেই পরিকল্পনার বিষয়টি সামনে আসে। স্বাধীনতার পরপরই তাই বঙ্গবন্ধু ও তার সহযোদ্ধারা সিদ্ধান্ত নিয়েছিলেন আমাদের ব্যাপক অর্থনৈতিক কর্মপরিকল্পনা প্রণয়ন করতে এবং তা বাস্তবায়ন করতে হবে। লক্ষ অর্জনে তারা অন্যতম প্রধান যে কাজটি করেছিলেন সেটি হলো বাংলাদেশ পরিকল্পনা কমিশন গঠন। এর লক্ষ্য ছিল একটি পরিকল্পিত রাষ্ট্র গঠন। আমার মনে হয় তাদের চিন্তায় সমসাময়িক সমাজতান্ত্রিক চিন্তা জাগরূক ছিল। সমাজতন্ত্র অর্থেসামাজিক ন্যায়বিচার প্রতিষ্ঠা করা, পীড়াদায়ক বৈষম্য-শোষণ রোধ এবং অভ্যন্তরীণ লুণ্ঠন আইনের মাধ্যমে পরিহার করা।
তাঁর রাজনৈতিক চিন্তার সঙ্গে যারা পরিচিত ছিলেন, বঙ্গবন্ধু যাদের চিনতেন এবং ছয় দফায়ও যাদের ভূমিকা ছিল তাদেরই কয়েকজনকে তিনি পরিকল্পনা কমিশনে নিয়ে এলেন। অধ্যাপক নূরুল ইসলাম-কে ডেপুটি চেয়ারম্যান, পূর্ণ মন্ত্রীর মর্যাদাসহ এবং অধ্যাপক ডক্টর মোশাররফ হোসেন, অধ্যাপক রেহমান সোবহান, অধ্যাপক ডক্টর আনিসুর রহমান-কে সদস্য তথা প্রতিমন্ত্রীর মর্যাদায় কমিশনে নিয়োগ দেন। পরিকল্পনা প্রণয়নের জন্য কমিশনকে পূর্ণ স্বাধীনতা তিনি দিয়েছিলেন। অনেক তরুণ অর্থনীতিবিদদেরও তখন কমিশনে নিয়োগ দেয়া হয়েছিল। এটিই মোটা দাগে পরিকল্পনা কমিশনের যাত্রার পটভূমি।
১৯৭২ এ প্রথম পঞ্চবার্ষিক পরিকল্পনা তারা তৈরি করেছিলেন। ১৯৭৭ সালে এর সময়সীমা শেষ হওয়ার কথা ছিল। কিন্তু দুঃখের বিষয় তার আগেই ১৯৭৫ এর আগস্টের এই দিনে জাতির পিতা জাতীয় প্রতিক্রিয়ার হাতে প্রায় সপরিবারে নৃশংসভাবে নিজ বাড়ীতে খুন হন, বঙ্গবন্ধুর স্বপ্নে বড় ধরনের কুঠারাঘাত এল। যেসব নিবেদিত প্রাণ উজ্জীবিত ব্যক্তিবর্গ কমিশনে সংযুক্ত হয়েছিলেন তারাও কমিশন ছেড়ে অন্যত্র চলে গেলেন।
নতুন শাসক যারা এল তারা পরিকল্পনা কমিশনকেও হত্যা করল। হয়ত প্রাতিষ্ঠানিকভাবে হত্যা করল না, কিন্তু অযতেœ-অবহেলায় সংস্থাটিকে এক পাশে ফেলে রেখে দিল। ফলে পরিকল্পনা কমিশন ধীরে ধীরে গুরুত্ব হারাল, পর্যায়ক্রমে প্রতিপক্ষ শাসক গোষ্ঠী পঞ্চবার্ষিক পরিকল্পনার ধারণা থেকেও সরে আসল। শক্তিশালী বৈশ্বিক গোষ্ঠী সংস্থার পরামর্শে তারা সমাজতান্ত্রিক চিন্তাধারা বাদ দিয়ে বাজার অর্থনীতির দিকে পা ফেলতে শুরু করলো। তথাকথিত ‘দাতাদের’ পরামর্শে কাঠামোগত সংস্কার কর্মসূচি গ্রহণ করলো। প্রাসঙ্গিকভাবে নতুনত্বের কিছু চমকও দেখা গেল। কিন্তু অচিরেই এর অন্তনির্হিত নেতিবাচক চরিত্র (প্রাতিষ্ঠানিক লুণ্ঠন) প্রকাশ পেতে শুরু করল। ১৯৭৫ সালে বঙ্গবন্ধুকে হত্যার পর থেকে ১৯৯৫ সাল পর্যন্ত টানা দুই দশক স্বাধীনতা কেন্দ্রিক সার্বিক কল্যাণমূলক উন্নয়নের আকাক্সক্ষারুদ্ধ হল।


১৯৯৬ সালে জনগণের ভোটে বাংলাদেশ আওয়ামী লীগ বর্তমান প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনার নেতৃত্বে ক্ষমতায় এলো। শেখ হাসিনা আবার পঞ্চবার্ষিক পরিকল্পনার ধারণা পুনরুজ্জীবিত করলেন। পরিকল্পনা কমিশনের কাজ চাঙা হল; তবে স্বাধীনভাবে নয় সরকারের একটি অন্যতম মন্ত্রণালয় হিসাবে। পুরনো জঞ্জালগুছিয়ে অর্থনীতি একটা পর্যায়ে পৌঁছাল। কিন্তু ২০০১ সালে আবার সুক্ষ্ম কূটচালের মাধ্যমে সরকার পরিবর্তন হল। গোটা রাষ্ট্রীয় ব্যবস্থায় পুরনো প্রতিক্রিয়াশীলতায় দর্শন দিয়ে এল। ২০০৫ সাল পর্যন্ত এভাবেই চলল।
২০০৬-২০০৮ সাল সময়সেনা সমর্থিত তত্ত্বাবধায়ক ব্যবস্থা নামে এক ধরনের অসংজ্ঞায়িত, অগণতান্ত্রিক শাসন চলল।
২০০৮ সালে সাধারণ নির্বাচনে জয়ী হয়ে আওয়ামী লীগ পুনরায় ক্ষমতায় ফিরে এলো এবং পরবর্তী টানা ১১ বছর ধরে এখন চলছে আওয়ামী লীগ সরকারের শাসন। এই সরকারের নীতিমালা অর্থনীতির বিচারে কোন চরিত্রের সেটি আমার বলার বিষয় নয়। সেটি চূড়ান্তভাবে ইতিহাস ও এদেশের জনগণ বিচার করবে। তবে নীরব আরেক দল আছে যারা বিচার করার মালিক, তারা এদেশের মানুষ। তারা দেখছেন, তাদের জীবনযাত্রার মান গত এক দশকে আগের চেয়ে উন্নত হয়েছে। তাদের মাথাপিছু আয় বেড়েছে; দেশ মধ্যম আয়ের দেশের স্বীকৃতি পেয়েছে; নিত্যপণ্যের দাম স্থিতিশীল রয়েছে।
তবে চলমান করোনা সংকটের কারণে আমরা সবাই বেশ কষ্টে পড়েছি। অর্থনৈতিক কর্মযজ্ঞ সচল হবে শীঘ্রই আশা করছি। পোশাক খাত ঘুরে দাঁড়াচ্ছে। আগে যে ক্রয়াদেশ বাতিল হয়েছিল, এখন বর্দ্ধিত হারে তারা নতুন ক্রয়াদেশ পাচ্ছেন। বিশেষত মেডিকেল প্রোডাক্ট, পিপিই প্রভৃতি নতুন ধরণের পণ্যের ক্রয়াদেশ তারা পাচ্ছেন। কৃষি খাতের শক্তিশালী অর্থনীতি ঘুরে দাঁড়িয়েছে। আশা করছি, সারা বিশ্বের সঙ্গে সঙ্গে আমাদের দেশেও করোনা ক্রমান্বয়ে কমে আসবে। বিশ্লেষণ করলে দেখা যায়, আনুপাতিক হারে আমরা তুলনামূলক বিচারে করোনা দুর্দশার মাত্রায় একটু ভালো অবস্থানে আছি। স্বাস্থ্যবিধি সবাই মেনে চললে আমাদের অবস্থা আরো ভালো হবে। অনেক ঝুঁকি নিয়ে প্রধানমন্ত্রী কিছুটা অনেকের ধারনায় তাড়াহুড়ো ভাবে অর্থনীতি খুলে দিয়েছেন। আমরা মনে করি এটা তার বাস্তবভিত্তিক পরিকল্পনা, ঝুঁকির মধ্যে সিদ্ধান্ত গ্রহণের সাহস ও দূরদর্শিতার প্রমাণ। এতে চূড়ান্ত বিচারে অর্থনীতির লাভ হয়েছে। অর্থনীতি দ্রুত পুনরুজ্জীবিত হচ্ছে। সামনের দিনে সরকারের আগামদর্শী পরিকল্পনায় বাংলাদেশ রাষ্ট্র অর্থনৈতিকভাবে দুর্বারগতিতে পুনরায় এগিয়ে যাবে; অর্থনৈতিক মুক্তির বঙ্গবন্ধুর স্বপ্নের সফল বাস্তবায়ন হবে। আর সেই কাজে পরিকল্পনা মন্ত্রণালয় (পরিকল্পনা কমিশন) যথার্থ ভূমিকা রাখবে এরূপ আশা করছি। সে লক্ষ্যে আমরা নিরলস কাজ করছি।
এটা সত্য যে, পরিকল্পনা কমিশন সময়ের আবর্তে বঙ্গবন্ধুর দেখানো পথ থেকে কিছুটা সরে এসেছে। বৈশ্বিক পরিম-লে পরিবর্তন এবং অভ্যন্তরীণ বাস্তবতার কারণে এমনটি হয়েছে। সোভিয়েত ইউনিয়নের পতন ঘটেছে। চীনও পুঁজিবাদের সঙ্গে সমন্বয় করে উচ্চমাত্রায় প্রবৃদ্ধি অর্জন করছে, এখন সেখানে বাজার অর্থনীতির জয়জয়কার। ভিয়েতনামও বাজার অর্থনীতির পথেই চলেছে। সুতরাং আমাদের অর্থনীতিতেও বাজারভিত্তিক সংস্কার ছাড়া উপায় ছিল না। তবে আমরা পঞ্চবার্ষিক পরিকল্পনা, প্রেক্ষিত পরিকল্পনা ইত্যাদি এখনো করছি, সেটি হয়ত ধ্রুপদি সমাজতান্ত্রিক ধরনের নয়। বাস্তবতার নিরীখে আমরা বাজার অর্থনীতিভিত্তিক নীতি-পরিকল্পনা সাজাচ্ছি। আমার কাছে প্রতীয়মান হয়েছে শেখ হাসিনা সরকারের বৈশিষ্ট্য হলো বাজার অর্থনীতির কল্যাণমূলক দিকগুলি শক্তিশালী করা এবং এর পুঁজিবাদী হিং¯্রতার ছোবলসমূহ অবদমিত রাখা, সামাজিক নিরাপত্তা বলয় বাড়ানো, দরিদ্র জনগোষ্ঠীকে সহায়তা দিয়ে ক্রমান্বয়ে উচ্চ আয়ের সোপানে তুলে আনা, শিক্ষার প্রসার ঘটানো, স্বাস্থ্যসেবার সম্প্রসারণ। এ সকল কাজের দ্বারা শেখ হাসিনা দারিদ্র্য বিমোচন করছেন (বর্তমানে ২০.৫ ভাগ) এবং বৈষম্য কমানোর জন্য এক দীর্ঘমেয়াদী পথে হাটছেন যা বৈপ্লবিক না হলেও দারিদ্র্য প্রশমনে অর্থবহ ভূমিকা রাখছে। বাজার অর্থনীতির মধ্যে থেকেও যাতে সামাজিক ন্যায়বিচার নিশ্চিত হয়, ব্যাপক অর্থে শ্রমজীবী ও দরিদ্র জনগোষ্ঠীর কল্যাণ হয়, সাধারণ মানুষের জীবনযাত্রার মান বাড়ে, বৈষম্য কমে, সেসব বিষয়ই বর্তমান সরকারের সামগ্রিক পরিকল্পনায় আবর্তিত হচ্ছে এবং পরিকল্পনা কমিশন সে লক্ষ্যেই সরকার প্রধানের সরাসরি নির্দেশে কাজ করে যাচ্ছে। এদিক থেকে বঙ্গবন্ধুর অন্তর্নিহিত চিন্তার সঙ্গে বর্তমান সরকারের চিন্তাগত-পরিকল্পনাগত তেমন বড় তফাত নেই বলে আমার কাছে মনে হয়।
আমার ধারণায় বঙ্গবন্ধু মোটা দাগে দুটি বিষয় চেয়েছিলেন: এক, মানুষ খেয়ে-পরে বাঁচুক এবং দুই, বাঙালিরাই বাংলাদেশকে শাসন করুক। স্বভূমিতে চিরতরে বিদেশি শাসনের অবসান ঘটুক। তাঁর দুটি লক্ষ্যই প্রায় অর্জিত হয়েছে। এখন প্রয়োজন স্বাধীনতা সুরক্ষা, বৃহত্তর জনগোষ্ঠীর সার্বিক উন্নয়ন নিশ্চিত করা এবং বাংলাদেশকে একটি কল্যাণমূলক ন্যায়ানুগ জনগণতান্ত্রিক রাষ্ট্র হিসেবে বিশ্ব সমাজে প্রতিষ্ঠা করা। দীর্ঘমেয়াদী ও সুদূরপ্রসারী জনবান্ধব পরিকল্পনার মাধ্যমে এটি রূপায়নেই আমরা নিবেদিতভাবে কাজ করে যাচ্ছি।
১৫ আগস্ট, জাতীয় শোক দিবসে পরিকল্পনা মন্ত্রণালয়/কমিশনে কর্মরত সকলের পক্ষ থেকে বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমানসহ ১৫ আগস্টের সকল শহীদের রুহের মাগফেরাত কামনা করছি। একই সাথে বঙ্গবন্ধুর জন্মশতবার্ষিকীতে জাতির পিতার স্বপ্নের সোনার বাংলা গড়ে তোলা এবং তার অসমাপ্ত কাজ সমাপ্ত করার প্রত্যয় ব্যক্ত করছি।
জয় বাংলা, জয় বঙ্গবন্ধু।
লেখক : এম এ মান্নান এমপি, পরিকল্পনামন্ত্রী, গণপ্রজাতন্ত্রী বাংলাদেশ সরকার।