বঙ্গবন্ধু ও স্বাধীনতা

মনোরঞ্জন তালুকদার
লিখার শুরুতেই বাংলাদেশ নামক একটি স্বাধীন জাতি রাষ্ট্র প্রতিষ্ঠায় ১৯৫২ থেকে ১৯৭১ সালের ১৬ ডিসেম্বর পর্যন্ত যাঁরা আমদের ভবিষ্যৎ বিনির্মাণের জন্য তাঁদের বর্তমানকে উৎসর্গ করেছেন তাদের প্রতি গভীর শ্রদ্ধা নিবেদন করেই বলছি, বঙ্গবন্ধু ও বাংলাদেশ সমার্থক শব্দ। আর এই সত্যটাই আমি আমার এই ক্ষুদ্র লেখায় ব্যাখ্যা করার চেষ্টা করব।
২৬শে মার্চ মহান স্বাধীনতা দিবস। উত্তাল বাঙালি জাতির রক্তঝরা স্বাধীনতা অভিমুখে যাত্রার অগ্নিঝরা মাস মার্চ। ১লা মার্চ ইয়াহিয়া খান যখন জাতীয় পরিষদের অধিবেশন স্থগিত ঘোষণা করলো, সাথে সাথেই বাঙালি বিক্ষোভ ও দ্রোহের আগুনে জ্বলে উঠে। জানুয়ারি, ফেব্র”য়ারি থেকে উত্তপ্ত ঢাকা শহরে দ্রোহের অগ্নুৎপাত ঘটে। খেলার মাঠ, অফিস-আদালত, স্কুল- কলেজ, বিশ্ববিদ্যালয়, ব্যবসা প্রতিষ্ঠান বন্ধ করে লোকজন রাস্তায় নেমে আসে। শুর” হয় পাকিস্তানের পতাকা পুড়ানো আর জয় বাংলা শ্লোগান। বঙ্গবন্ধু ৭ই মার্চের কর্মসূচি ঘোষণা করলেন।
তারপরের সব কিছুই শুধু একটি জাতি রাষ্ট্র প্রতিষ্ঠার ত্যাগ, তিতিক্ষা আর লড়াইয়ের ইতিহাস। স্বাধীনতার ৪৮ বছর পূর্তির এই পুণ্য লগ্নে দাঁড়িয়ে নির্মোহ দৃষ্টিতে স্বাধীনতা ও বঙ্গবন্ধু এই বিষয়টা নিয়ে আলোচনা করা যেতেই পারে।
বংগবন্ধুকে বলা হয় হাজার বছরের শ্রেষ্ঠ বাঙালি। সবাই যে বলে এমনটি নয়। বুদ্ধিজীবীদের মধ্যে যারা বলে না তারা অন্তর থেকে বাঙালি জাতীয়তাবাদে বিশ্বাস করে না। আর রাজনৈতিক দলগুলোর মধ্যে যারা এই সত্য স্বীকার করে না তারাও নানা কারণেই এটা স্বীকার করে না। এর বিস্তারিত ব্যাখ্যা দিতে গেলে প্রসঙ্গ থেকে অনেক দূরে চলে যেতে হবে।
যারা বিশ্বাস করে বঙ্গবন্ধু হাজার বছরের শ্রেষ্ঠ বাঙালি, তারা কি শুধু আবেগ তাড়িত হয়েই তা বিশ্বাস করে নাকি ইতিহাস ই স্বাক্ষ্য দেয় যে, বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমানই হাজার বছরের শ্রেষ্ঠ বাঙালি? ইতিহাসের আলোকেই আমরা তা বিশ্লেষণ করার চেষ্টা করব।
বাঙালি জনগোষ্ঠীর ইতিহাসে ১৯৭১ সালেই বাঙালি জাতি রাষ্ট্র প্রথম প্রতিষ্ঠিত হয়। ইতিহাস ঘাটলে জানা যায়, পাল রাজারাই এই অঞ্চলের অধিবাসী হিসেবে সমতট, বরেন্দ্র, হরকল প্রভৃতি অঞ্চল শাসন করেন। তবে সেগুলো জাতি রাষ্ট্র ছিল না। পাল রাজত্বের পর আসে সেন রাজারা। তারা ভারতের দক্ষিণাঞ্চল থেকে আসেন। তারা প্রায় শত বছর শাসন কার্য পরিচালনা করে। সেন রাজাদের পরাজিত করে বাংলায় মুসলমান শাসনের সূচনা হয়। যা প্রায় ৫৫০ বছর চলে। তাঁরাও ছিলেন বহিরাগত। মুসলমানদের পরাজিত করে ইংরেজ শাসনের সূত্রপাত। ইংরেজরা শাসন করে ১৯০ বছর। সাথে পাকিস্তানিদের ২৪ বছর যুক্ত হলে বাঙালির পরাধীনতার ইতিহাস প্রায় হাজার বছরের। এই হাজার বছরের মধ্যে কেউ কেউ বাঙালির স্বাধীনতার স্বপ্ন দেখেছেন কেউ কেউ হয়ত চেষ্টাও করেছেন, কিন্তু কেউই সফল হননি। বংগবন্ধুই হচ্ছেন প্রথম বাঙালি পুর”ষ যিনি হাজার বছর ধরে পরাধীনতার শৃংখলে বাধা বাঙালি জাতিকে স্বাধীনতা এনে দেন। আর এখানেই তিনি হাজার বছরের শ্রেষ্ঠ বাঙালি। এটাই ইতিহাসের চিরন্তন সত্য। কারো স্বীকার করা বা না করায় এই সত্যের কিছু যায় আসে না।
বঙ্গবন্ধুর রাজনৈতিক দর্শন নিয়ে আলোচনার পূর্বে একটি কথা বলে নিতে চাই। বঙ্গবন্ধুর রাজনৈতিক চরিত্রের একটি গুর”ত্বপূর্ণ দিক হচ্ছে তিনি ফলোয়ার থেকে লিডার হয়ে উঠতে পেরেছিলেন। এমনটি বাংলার রাজনীতিতে আর দেখা যায়নি। এখানেই তাঁর অনন্যতা। আজও যারা এ দেশের রাজনীতির অঙ্গনে বিচরণ করছেন তারা সবাই, মার্কস-লেনিন, মাও সেতুং এমনকি মওদুদীর ফলোয়ার। তারা কেউ কিন্তু লিডার হয়ে উঠতে পারেননি-এই সত্যটাও আমাদের বিবেচনায় রাখতে হবে। তাহলেই আমরা অনেক অহেতুক তুলনামূলক আলোচনার কুৎসিত মানসিকতাকে ধরতে পারবা।
ইংরেজ শাসন আমলেই বঙ্গবন্ধুর রাজনৈতিক জীবনের সূত্রপাত। পাকিস্তান আন্দোলনে সক্রিয় ভাবে অংশগ্রহণ করেন। পাকিস্তান রাষ্ট্র প্রতিষ্ঠায় গুর”ত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করেন। খুবই লক্ষ্যণীয় একটি বিষয় হচ্ছে, যে শেখ মুজিবুর রহমান ছাত্র নেতা হিসাবে পাকিস্তান প্রতিষ্ঠায় গুর”ত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করেছিলেন তিনিই আবার বঙ্গবন্ধু হিসেবে বাংলাদেশ প্রতিষ্ঠায় নেতৃত্ব দিয়েছেন। এখানেই তাঁর রাজনৈতিক দর্শন স্পষ্ট।
বঙ্গবন্ধুর রাজনৈতিক দর্শনের মূল ভিত্তি ছিল বাঙালি জাতির রাজনৈতিক, অর্থনৈতিক, সাংস্কৃতিক ও সামাজিক মুক্তি। তিনি আশা করেছিলেন পাকিস্তান রাষ্ট্র কাঠামোতে হয়ত তা সম্ভব হবে। তাই তিনি পাকিস্তান আন্দোলনে ঝাঁপিয়ে পড়েন। কিন্তু পাকিস্তান রাষ্ট্র প্রতিষ্ঠার পর পরই যখন ভাষার দাবিকে কেন্দ্র করে পাকিস্তানিদের সাথে বাঙালিদের বিরোধের সূত্রপাত হয় এবং তখনই তিনি বুঝতে পারেন পাকিস্তান রাষ্ট্র কাঠামোতে বাঙালির অধিকার প্রতিষ্ঠা করা সম্ভব নয়। তাই ১৯৪৯ সালে আওয়ামী মুসলীমলীগ প্রতিষ্ঠা করেন বাঙালি মুসলমানদের স্বার্থ রক্ষা করার জন্য। যা ১৯৫৩ সালে আওয়ামী লীগ নামে একটি অসাম্প্রদায়িক রাজনৈতিক দলে পরিণত হয় ও স্বাধীন বাংলাদেশ প্রতিষ্ঠায় নেতৃত্ব দেয়।একটা বিষয় একটু লক্ষ্য করলে দেখা যায় যে, যাঁরা
পাকিস্তান প্রতিষ্ঠায় খূব গুর”ত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করেছিলেন তারাই বাংলাদেশ প্রতিষ্ঠায় গুর”ত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করেছেন। পাকিস্তান প্রতিষ্ঠায় বাঙালি মুসলমানদের খুব গুর”ত্বপূর্ণ একটা ভূমিকা ছিল। ১৯৪৬ সালের প্রাদেশিক আইন পরিষদের নির্বাচনে মুসলীমলীগ একমাত্র বাংলা প্রদেশেই নিরঙ্কুশ সংখ্যাগরিষ্ঠতা অর্জন করে। যা পাকিস্তান দাবিকে জোড়ালো করে তুলে। তাহলে এই প্রশ্ন এখন তোলা যেতেই পারে, যে বাঙালি মুসলমানরা পাকিস্তান রাষ্ট্র প্রতিষ্ঠায় এত গুর”ত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করলো তারাই কেন আবার পকিস্তান ভেংগে বাংলাদেশ প্রতিষ্ঠা করল? এই প্রশ্নের উত্তরের মধ্যে এই বাংলাদেশ রাষ্ট্র প্রতিষ্ঠার কারণ ও বঙ্গবন্ধুর রাজনৈতিক দর্শন লুকিয়ে আছে।
ব্রিটিশদের প্রায় দু’শ বছরের শাসনে বাংলার মুসলমান সমাজ এক হতদরিদ্র গোষ্ঠীতে পরিণত হয়। ইংরেজরা যখন ক্ষমতা দখল করে তখন হিন্দুরা এটাকে স্বাভাবিক ভাবে গ্রহণ করলেও মুসলমান সমাজ সেটাকে স্বাভাবিক ভাবে গ্রহণ করতে পারেনি। কারণ ভারতবর্ষ হিন্দু অধ্যূষিত হলেও দীর্ঘ ৫০০ শত বছরের উপর শাসিত হয়েছে মুসলমান শাসকদের দ্বারা। তাই মুসলমানদের মধ্যে একটা মানসিক ধারণার জন্ম হয় যে, তারা হচ্ছে রাজার জাতি। ইংরেজদের রাষ্ট্র ক্ষমতা দখলের মাধ্যমে সেই রাজার জাতি রাতারাতি প্রজার জাতিতে পরিণত হয়। এই ব্যাপারটা মুসলমান সমাজের জাত্যাভিমানে তীব্র আঘাত করে। চতুর ইংরেজরা বুঝতে পারে ভারতবর্ষ শাসনে তারা মুসলমান সমাজের সহযোগিতা পাবে না। তাই তারা হিন্দুদের সহযোগিতায় মুসলমান সমাজের শক্তি কেন্দ্রগুলো ধ্বংসে উদ্যোগী হয়। ফার্সির স্থলে ইংরেজিকে শিক্ষার মাধ্যম করে চাকুরি থেকে মুসলমানদের বিতাড়িত করে, চিরস্থায়ী বন্দোবস্থ ব্যবস্থা প্রবর্তনের মাধ্যমে ভূমি থেকে উচ্ছেদ করা হয়। যার ফলশ্র”তিতে মুসলমান সমাজ এক দরিদ্র জনগোষ্ঠীতে পরিণত হয়। বিশেষতঃ এই বাংলার অধিকাংশ জমিদার যেহেতু হিন্দু ছিল এবং তারা অত্যাচারীও ছিল তাই জমিদার বিরোধী মনোভাব হিন্দু বিরোধী মনোভাবে পরিণত হয়ে পাকিস্তান রাষ্ট্র প্রতিষ্ঠায় বাংলার মুসলমান সমাজ সক্রিয় অংশগ্রহণ করে। তাদের স্বপ্ন ছিল মুসলমান মুসলমান মিলে একটা মুসলিম রাষ্ট্র প্রতিষ্ঠা করতে পারলে তাদের যাপিত জীবনে বিরাজমান সঙ্কটের অবসান হবে। কিন্তু পাকিস্তান প্রতিষ্ঠার পর বাঙালির সেই স্বপ্ন বিবর্ণ হতে শুর” করে। ৫২ এর ভাষা আন্দোলনে ২১শে ফেব্র”য়ারি বুকের রক্তের বিনিময়ে বাঙালি তার আপন জাতিসত্বায় প্রত্যাবর্তন করে। ৫৪ এর নির্বাচনে যুক্তফ্রন্টের বিজয় এই তত্ত্বকে প্রমাণিত করে। ১৯৬৬ সালে লাহোরে বিরোধীদলের সম্মেলনে বঙ্গবন্ধু তাঁর ৬ দফা কর্মসূচী ঊপস্থাপনে ব্যর্থ হয়েও বাঙালির দাবির ব্যাপারে কোন আপোষ না করে দেশে ফিরে এসে জনগণের কাছে সে কর্মসূচি নিয়ে হাজির হন। তার এই কর্মসূচী বিপুল জনপ্রিয়তা পেলে পাকিস্তানি শাসকগোষ্ঠী তাঁর বির”দ্ধে নানা ষড়যন্ত্রে লিপ্ত হয়। পাকিস্তান রাষ্ট্রের ২৪ বছরের ইতিহাসে ১২ বছরই তাঁর পাকিস্তানের জেলে কেটেছে তবুও তিনি বাঙালির অধিকারের প্রশ্নে কোন আপোষ করেননি কখনো। ২৫শে মার্চ কালো রাতে মৃত্যু হতে পারে জেনেও পালিয়ে গিয়ে বাঙালি জাতিকে ছোট করেননি। বাঙালি জাতির আত্মসম্মান তার রাজনৈতিক দর্শনের একটি গুর”ত্বপূর্ণ জায়গা দখল করে আছে। তাছাড়া বাঙালি জাতির সার্বিক মুক্তিই ছিল তাঁর মূল রাজনৈতিক দর্শন। গণতান্ত্রিক সমাজ ও রাষ্ট্র প্রতিষ্ঠার জন্য যেমন তিনি সারা জীবন সংগ্রাম করেছেন তেমনি শোষণহীন, বৈষম্যহীন রাষ্ট্র প্রতিষ্ঠার জন্যও তিনি সংগ্রাম করেছেন। এমনকি বৈষম্যহীন সমাজ ও রাষ্ট্র প্রতিষ্ঠা করতে গিয়েই তিনি জীবন দিয়েছেন। এক কথায় বলা যায় বাঙালির সার্বিক মুক্তিই তাঁর রাজনৈতিক দর্শন। আর স্বাধীন রাষ্ট্র ছাড়া এই মুক্তি কোন অবস্থাতেই সম্ভব ছিল না বলেই তিনি হাজার বছরের পরাধীন একটি জাতিকে ধীরে ধীরে সংগঠিত করে, নানা চড়াই-উৎরাই পেরিয়ে এবং বারবার মৃত্যুর মুখোমুখি দাঁড়িয়েও নিজের আদর্শ ও উদ্দেশ্যের প্রতি অবিচল থেকে স্বাধীন সার্বভৌম বাংলাদেশ প্রতিষ্ঠা করতে সক্ষম হন।
লেখক : সহকারী অধ্যাপক, রাষ্ট্র বিজ্ঞান বিভাগ, জগন্নাথপুর, সরকারি কলেজ।