বজ্রপাতের বিপর্যস্ততা – আমাদের জ্ঞান এবং করণীয়

ড. এম. এ. ফারুখ
বজ্র্রপাত
উত্তপ্ত বায়ু যখন দ্রæতগতিতে ঠান্ডা হয় তখন বজ্রমেঘের সৃষ্টি হয়। এই বজ্রমেঘের ভেতরে বাতাসের দ্রæতগতির আলোড়নের সৃষ্টি হয়। এর ফলে বাতাসের জলীয়বাষ্প একই সময়ে বৃষ্টিকণা, শিশিরবিন্দু ও তুষার কণায় পরিণত হয়। বৃষ্টিকণা ও তুষার কণার পারস্পরিক সংঘর্ষের ফলে তুষারের ইলেকট্রন চার্জ ধাক্কা খায়। ফলে স্থির বৈদ্যুতিক চার্জের সৃষ্টি হয়। আকাশে মেঘের ভেতর বিদ্যুতের অতিরিক্ত চার্জ সঞ্চিত হতে হতে একসময় প্রবল শব্দে মাটিতে নেমে আসে ও বিপরীতধর্মী চার্জের সঙ্গে মিলিত হয়ে নিস্ক্রিয় হয়, এটাই বজ্রপাতের অন্যতম একটি গ্রহণযোগ্য ধারনা। সাধারণত উত্তপ্ত ও আর্দ্র আবহাওয়ার কারণে বজ্রপাত বেশি হয়। বজ্রপাত সাধারণত দুই ধরনের। একটি হল ‘মেঘ থেকে মেঘে’ এবং অপরটি ‘মেঘ থেকে মাটিতে’। এছাড়া একটি মেঘের ভেতরেও বজ্রপাত ঘটে থাকে। আমাদের দেশে বজ্রঝড়ের সাথে বৃষ্টি একটি অত্যাবশ্যকীয় উপাদান। পৃথিবীর অনেক দেশেই বজ্রঝড়ের সাথে বৃষ্টি হয় না বা হলেও ২.৫ মিমি এর কম বৃষ্টি হয়, যাকে শুষ্ক বজ্রপাত বলা হয়। এই ধরনের বজ্রপাত অনেকগুন বেশি ধ্বংসযজ্ঞ ঘটাতে সক্ষম।
বজ্রপাত এবং বজ্রনাদ
বাতাসের মধ্য দিয়ে দ্রæত প্রবাহিত বজ্রবিদ্যুৎ বা লাইটনিং বোল্ট প্রায় ৩০০ কিলোভোল্ট শক্তি এবং তার চারপাশের বাতাসে প্রায় ২৮ হাজার ডিগ্রি সেলসিয়াস তাপমাত্রা উৎপাদন করতে সক্ষম যা সূর্যের উপরিভাগের তাপমাত্রার প্রায় ৫ গুণ। এই উচ্চ তাপমাত্রার ফলেই বায়ুর দ্রæত প্রসারণ হয় ও তীব্র শব্দের (বজ্রনাদ) সৃষ্টি হয়। অধিকতর গরম বায়ুর দ্রæততর ঊর্ধ্বমুখী প্রবাহ এবং ঠান্ডা বায়ুর নিম্নমুখী প্রবাহে কোন স্থানের বাতাস ভীষণ অস্থিতিশীল হয়ে উঠে এবং বাতাসের এই অস্থিতিশীলতার মাত্রা বজ্রপাতের সংখ্যা ও তীব্রতা নির্ধারণে বিশেষ ভূমিকা রাখে। অস্থিতিশীল মেঘে বিদ্যমান ধনাত্মক ও ঋণাত্মক চার্জ থেকে বিদ্যুৎ সঞ্চালনকালে বজ্রের সৃষ্টি হয় যা প্রচুর ঝলকানি দিয়ে পৃথিবীর বুকে আছড়ে পড়ে।
বজ্রাঘাতে মানুষের ক্ষতির আশংকা
অতি উচ্চ মাত্রার বজ্রবিদ্যুৎ সঞ্চালনকালে সামনে উপস্থিত যেকোন প্রাণীর মৃত্যুই অতি সাধারণ ব্যাপার। এই প্রকার একটি বিদুৎপ্রবাহ যখন মানব শরীরে প্রবেশ করে এবং বেরিয়ে যায় তখন তা নিশ্চিতভাবেই ক্ষত তৈরি করবে। বজ্রাঘাতপ্রাপ্ত ব্যক্তির পরিধানকৃত জামা-কাপড়ে আগুন লেগে যাবার সম্ভাবনা থাকবে, পায়ে জুতো থাকলে তা ছিটকে বেরিয়ে যাবার সম্ভাবনা থাকবে, চুল বা শরীরের আঘাতপ্রাপ্ত অংশবিশেষ পুড়ে যেতে পারে। বজ্রাঘাতপ্রাপ্ত ব্যক্তির হৃদকম্পন তৎক্ষণাৎ বন্ধ হয়ে কার্ডিয়াক এরেস্ট হতে পারে বা মাথার খুলি আঘাতপ্রাপ্ত হলে মস্তিস্কের স্থায়ী ক্ষতি হতে পারে বা রোগী কোমায় চলে যেতে পারেন, আঘাতপ্রাপ্ত অঙ্গে প্যারালাইসিস হতে পারে, কানের পর্দা ফেটে যাওয়া এক্ষেত্রে একটি অতি সাধারণ ঘটনা, অনেক বজ্রাঘাতপ্রাপ্ত ব্যক্তির মাংসপেশির খিঁচুনিসহ পারকিনসন্স রোগের লক্ষণ দেখা দেয়। আমেরিকায় প্রতিবছর প্রায় ২৫ মিলিয়ন বজ্রপাত হলেও মোট বজ্রপাত আক্রান্ত মানুষের শতকরা মাত্র ১২ জন তৎক্ষণাৎ মারা যায়, বাকী ৮৮ জন মানুষই বেঁচে যায়। যদিও তাঁদের স্নায়ুবিক সমস্যা, মাথা ব্যথা, স্মৃতিভ্রষ্টটা, শ্রবণ সমস্যা, মনযোগ ও আবেগগত সমস্যা দেখা দিতে পারে। দীর্ঘসময়ের চিকিৎসায় এই সমস্যাগুলো কাটিয়ে উঠা গেলেও কোন কোন ক্ষেত্রে তা সম্ভবপর হয় না। আমাদের দেশে বজ্রাঘাতপ্রাপ্ত ব্যক্তির ক্ষেত্রে তৎক্ষণাৎ কোন প্রাথমিক বা সুচিকিৎসার ব্যবস্থা না হওয়া বর্তমান সময়ে বজ্রাঘাতে অধিক মৃত্যুর অন্যতম একটি বড় কারণ।
বজ্রাঘাতে মৃত ব্যক্তির লাশ চুরি
বজ্রাঘাতে মৃত মানুষের লাশ চুরির পেছনে রয়েছে আমাদের যথাযথ জ্ঞানের অভাব এবং সেই সাথে কিছু কুপমন্ডুকতা ও কুসংস্কার। বজ্রপাতে নিহত ব্যক্তির শরীর প্রাকৃতিক চুম্বকে পরিণত হয় বলে এখনও প্রামাঞ্চলে অনেকের ধারণা। অনেকেই বিশ্বাস করেন যে, বজ্রপাতে মৃত ব্যক্তির শরীরের বিশেষ বিশেষ হাড় প্রেত সাধনার কাজে কার্যকরী এবং এটা দিয়ে অলৌকিক ক্ষমতা অর্জন করা সম্ভব। এক্ষেত্রে স্বাভাবিকভাবে মৃত মানুষের চেয়ে বজ্রপাতে মৃত মানুষের হাড় অনেক বেশী কার্যকর বলেও কথিত রয়েছে। বজ্রাঘাতে মৃত ব্যক্তির শরীরে বা যেখানে বজ্রপাত হয় তার আশে পাশে মূল্যবান খনিজ টুকরা পাওয়া যায়, যা তথাকথিত ঝাঁড়-ফুকে ভালো কাজ দেয় বলে যে গুজব রয়েছে সেটিও শতভাগ ভিত্তিহীন। প্রসঙ্গক্রমে বিগত কয়েক বছরের কিছু ঘটনা তুলে আনবার চেষ্টা করছি যা আমাদের জ্ঞান ও মানবিকতাবোধকে নাড়া দেয়। বগুড়ার শেরপুর উপজেলার নন্দতেঘরি গ্রামে বজ্রপাতে মৃত এক গৃহবধূর লাশ দাফন করা হয়েছিল বাড়ির আঙিনায়। কারণ মৃতের লাশ চুরি যাবার ভয়। তারপরও দাফনের এক বছর চার মাস পর দুর্বৃত্তরা কবর খুঁড়ে লাশটি নিয়ে যায়। দিনাজপুরের ফুলবাড়ীতে বজ্রপাতে মৃত সাদ্দাম হোসেন (২২) নামে এক ব্যক্তির মৃতদেহ চুরি হওয়ার আশঙ্কায় তাঁর শয়নকক্ষে লাশটি দাফন করা হয়। সিরাজগঞ্জের তাড়াশ উপজেলায় মজিবর রহমানের ৩০ বছর বয়সের যুবক ছেলে বজ্রপাতে নিহত হলে তাকে ইট-সিমেন্ট দিয়ে পাকা কবরে সমাহিত করা হয় এবং কয়েকদিন রাতভর সে কবর পাহারা দেয়া হয়। কারণ কয়েক দিন আগে একই এলাকায় আরেকজনের বজ্রপাতে মৃত্যু হলে তাকেও পাকা কবরে শায়িত করা হয়েছিল। কিন্তু রাতের অন্ধকারে পাকা কবর ভেঙে ‘মহা মূল্যবান’ কঙ্কাল চুরি হয়ে যায়। চুয়াডাঙ্গা জেলার আলমডাঙ্গা উপজেলার অভয়নগর গ্রামের মৃত মকছেদ সর্দ্দারের ছেলে কৃষক রইচ সর্দ্দার মাঠে কাজ করার সময় বজ্রপাতে নিহত হন। এই দুর্ভাগা ব্যক্তির কবর থেকে কঙ্কালের খুলি চুরি যায় মৃত্যুর ৫ মাস পর। ময়মনসিংহের ভালুকা উপজেলার ভরাডোবা গ্রামের হেকিম পাঠানের ছেলে ইদ্রিস আলী পাঠান (৫৫) বজ্রপাতে মারা যান। মৃত্যুর প্রায় দেড় বছর পর একদল দুর্বৃত্ত পারিবারিক গোরস্থানে ইটের প্রাচীর ভেঙে ও কবর খুঁড়ে ইদ্রিস আলীর লাশটি চুরি করে নিয়ে যায়। নাটোরের লালপুর উপজেলার ওয়ালিয়া গ্রামে বজ্রপাতে মারা যাওয়া হাফিজুর রহমান (২৬) নামের এক তরুণের লাশ নিজ ঘরের ভেতর দাফন করা হয়েছে লাশ চুরি যাবার আশঙ্কায়। আমাদের উচিত এসব কুপমন্ডুকতা ও কুসংস্কার পরিহার করে মৃত ব্যক্তির পরিবারের পাশে দাঁড়ানো এবং মানুষকে বোঝানো যে, বজ্রপাতে মৃত ব্যক্তির লাশে আলাদা কোনো বিশেষত্ব নেই যে কারণে এই লাশ চুরি করে কংকাল বা মাথার খুলি বের করে নিতে হবে।
বজ্রাঘাতপ্রাপ্ত ব্যক্তির শরীরে পোড়াক্ষত
সরাসরি বজ্রপাত আক্রান্ত মানুষ বস্তুতপক্ষে বিদ্যুৎস্পৃষ্ট হয় না, কারণ এক্ষেত্রে বজ্রপাতের বিদ্যুৎ পটেনশিয়াল বজ্রাঘাত করবার সময় কোন বাঁধা/রোধ পায় না বরঞ্চ তা মানুষের শরীরের চামড়া দিয়ে মাটিতে চলে যায়। বেশিরভাগ বজ্রপাতে মৃত মানুষের শরীরে মারাত্মক কোন পোড়ার ক্ষত দেখা যায় না। এই ধরনের মৃত মানুষের পোষ্টমর্টেম করে শরীরের ভেতরেও বিশেষ কোন পোড়াক্ষত বা বিদ্যুৎস্পৃষ্টতার লক্ষণ দেখা যায় না। যদিও বজ্রবিদ্যুৎপ্রবাহের তাপমাত্রা সাংঘাতিক গরম কিন্তু বজ্রপাত আক্রান্ত মানুষের শরীরে তা ১-২ মাইক্রোসেকেন্ড স্থায়ী হয় বলেই তা শরীরে তেমন কোন পোড়াক্ষত বা সেকেন্ড ডিগ্রি বার্ণ করতে পারে না। তবে বজ্রাঘাতে মৃতুর পেছনে জন্য সবচেয়ে গ্রহণযোগ্য ব্যাখ্যাটি হল আক্রান্ত ব্যক্তির শরীরে বৈদ্যুতিক পোলারাইজেশন। মূলতঃ মানুষের শরীরের উপরিভাগ দিয়ে বজ্রবিদ্যুৎপ্রবাহের কারণে স্নায়ুতন্ত্রের কার্যক্রম মারাত্মকভাবে বাধাগ্রস্ত হয় এবং ফুসফুসের কার্যকারিতা হ্রাস পেয়ে শ্বাসপ্রশ্বাস বন্ধ হয়ে যায়। এমতাবস্থায়, দ্রæততার সাথে কৃত্রিম শ্বাসপ্রশ্বাসের ব্যবস্থা না করলে হৃদযন্ত্রের ক্রিয়া বন্ধ হয়ে আক্রান্ত ব্যক্তি মারা যেতে পারেন। এক্ষেত্রে আক্রান্ত ব্যক্তির হৃদযন্ত্রের ক্রিয়া বন্ধ হয়ে মৃত্যুর আরেকটি কারণ রক্তে অক্সিজেনের পরিমাণ অস্বাভাবিক কমে যাওয়া, বজ্রবিদ্যুৎস্পৃষ্টতা নয়। সদ্য বজ্রাঘাতপ্রাপ্ত অনেক ব্যক্তির কাছে গিয়েই তাকে শ্বাসপ্রশ্বাস বন্ধ অবস্থায় পাওয়া যায়। যদিও তাঁদের অনেককেই তৎক্ষণাৎ মুখে মুখ লাগিয়ে কৃত্রিমভাবে শ্বাসের ব্যবস্থা করে পূর্বাবস্থায় ফিরিয়ে আনা গেছে। যদিও বজ্রাঘাতপ্রাপ্ত ব্যক্তিরা বিদ্যুৎস্পৃষ্ট হয় না তবুও তাঁদের শরীর মাটি, ধাতব বেড়া, ধাতব পাইপ, টেলিফোনের তার, বা বৈদ্যুতিক সিস্টেমে সংযুক্ত কোন যন্ত্রের সংস্পর্শে থাকলে বৈদ্যুতিক প্রবাহের কারণে কিছুমাত্রায় বিদ্যুৎস্পৃষ্ট হতে পারে।
বজ্রবিদ্যুৎস্পৃষ্টতা এড়ানোর উপায়
বিল্ডিং বা বসতবাড়ির খুব কাছাকাছি বজ্রপাত হলে শক্তিশালী বৈদ্যুতিক প্রবাহ মাটি হতে ধাতব পাইপ বা তারের মাধ্যমে বিল্ডিংয়ের ভেতরে পরিবাহিত হতে পারে। এসকল ক্ষেত্রে শরীর মাটি, ধাতব বেড়া, ধাতব পাইপ, টেলিফোনের তার, বা বৈদ্যুতিক সিস্টেমে সংযুক্ত কোন যন্ত্রের সংস্পর্শে থাকলে কোন ব্যক্তি বিদ্যুৎস্পৃষ্ট হতে পারে এবং স্নায়ুতান্ত্রিক সমস্যায় আক্রান্ত হতে পারে। বৈদ্যুতিক কোন যন্ত্র যেমন টিভি, রেডিও, ফ্রিজ, কম্পিউটার ইত্যাদি প্লাগের মাধ্যমে বৈদ্যুতিক সার্কিটে সংযুক্ত থাকলে তা দ্রæতগতির বৈদ্যুতিক প্রবাহের কারণে মারাত্মকভাবে ক্ষতিগ্রস্ত হতে পারে। কিন্তু ব্যাটারিচালিত যন্ত্র বা ওয়াই-ফাই, বøুটুথ ইত্যাদি বৈদ্যুতিক সার্কিটে সরাসরি সংযুক্ত না থাকায় এগুলোর ক্ষতির সম্ভাবনা কম থাকে। এক্ষেত্রে ব্যাটারী চালিত হাতঘড়ি বা কোন স্বর্ণালঙ্কার কোনভাবেই বজ্রপাতকে আকৃষ্ট করে না, যা একটি ভ্রান্ত ধারণা হিসেবে অনেকের মনেই বিরাজমান রয়েছে। তবে সরাসরি বজ্রাঘাতে লোহাজাতীয় কোন ধাতব বস্তু বা চেইন, আংটি ইত্যাদির চুম্বকে পরিণত হওয়া অস্বাভাবিক নয়। বজ্রাঘাত এড়ানোর উপায় হিসেবে মূলতঃ কৃষক এবং জেলে ভাইদের জানাতে হবে, বজ্রঝড় হবার সম্ভাবনা দেখা দিলেই তাঁরা যেন সাময়িকভাবে একটি নিরাপদ আশ্রয়ে চলে যান, ভাল আবহাওয়ায় ভারী কৃষি যন্ত্রাংশ ব্যবহার করেন এবং বজ্রপাত থেকে নিজেকে রক্ষার কৌশলগুলো মেনে চলেন।
সীমানা পিলার, বজ্রপাত এবং তালগাছ
অনেকেই মনে করেন বৃটিশদের সময়ে গাঁথা সীমানা পিলারগুলি বজ্রপাত প্রতিহত করার জন্য বসানো হয়েছিল যার কাছে রেডিও নিয়ে গেলে রেডিও অচল হয়ে যেত বলে কথিত রয়েছে, এবং এই পিলারগুলি চুরি হওয়ার সাথে বজ্রপাত বাড়ার সম্পর্ক রয়েছে। বাস্তবতা হচ্ছে কোন টাওয়ার বা পিলার যদি বজ্রপাত প্রতিরোধক হিসাবে ব্যবহৃত হয় তবে সেটা সরিয়ে নিলে পার্শ্ববর্তী কয়েক বর্গমিটার থেকে কয়েক কিলোমিটার জায়গা অরক্ষিত হতে পারে। অর্থাৎ পিলারের নিকটবর্তী এলাকায় বজ্রপাতের সম্ভাবনা বাড়তে পারে কিন্তু গোটা দেশের উপর এর ব্যাপক কোন প্রভাব থাকা আদৌ যৌক্তিক নয়।
আপাততঃ বজ্রপাত ঠেকানোর মুল পদক্ষেপ হিসেবে উঁচু গাছ হিসেবে তালগাছকে দীর্ঘমেয়াদী পরিকল্পনার অংশ হিসেবে ব্যাপক হারে লাগানো প্রয়োজন। তালগাছ ৩০-৪৫ সেমি ব্যাসের গোলাকার গুঁড়িবিশিষ্ট প্রায় ৮০-৯০ ফুট উচ্চতার শাখাবিহীন ৯০-১০০ বছর জীবনকালের একটি বহুবর্ষজীবী উদ্ভিদ। তালগাছ ভূমি সংরক্ষণে ভাল কাজ দেয়, যেকোন প্রকার মাটিতে জন্মায়, মাটির গভীরে প্রধানমূলের মাধ্যমে দন্ডায়মান থাকে বলে ফসলের কোনো ক্ষতি করে না, কম বৃষ্টি-অধিক তাপমাত্রা-তীব্র বায়ুপ্রবাহে অনমনীয় এই গাছটির সবঅংশই কাজে লাগে, বিশেষ করে ষ্টিলের ন্যায় শক্ত ও টেকসই কাঠ সকলের পছন্দনীয়। তবে তা উচ্চতায় বজ্রপাতের ঝুঁকিহ্রাসের উপযোগী হতে কমপক্ষে ১৪-১৬ বছর বা তারও বেশি সময় প্রয়োজন। তালশাঁস বপনের প্রাথমিক অবস্থায় খুব মন্থর হলেও বয়স বাড়ার সাথে সাথে গাছের বৃদ্ধি ত্বরান্বিত হয়। মন্দের ভাল হিসেবে তালগাছ কৃষিজ-জমির আইলে ২৫ থেকে ৩০ ফুট পর পর বপন করলে অন্ততঃ আগামী দশকে তা মৃত্যুঝুঁকি কমাতে প্রভূত ভূমিকা রাখবে। তবে মধ্যমেয়াদী পরিকল্পনায় সুপারীগাছের কথা বিবেচনায় রাখা যেতে পারে যা তালগাছের তুলনায় দ্রæত বর্ধনশীল, প্রায় ৫০-৬০ ফুট উঁচু হয় এবং তালগাছের প্রতি ৩০ ফুটের মধ্যবর্তী স্থানে রোপণ করা যায়।
সুনামগঞ্জে বজ্রপাত
বাংলাদেশে প্রতি বছর বজ্রপাতে মৃত্যুর ৯৩ শতাংশ ঘটে থাকে গ্রামীণ জনগোষ্ঠীতে। এই হতভাগ্যদের প্রায় ৮৪ শতাংশই পুরুষ। আবার মোট মৃত্যুর প্রায় ৮৬ শতাংশ ঘটছে উন্মুক্ত স্থানে অবস্থানের কারণে যার মূল শিকার কৃষক, জেলে ও শ্রমিক শ্রেণীর মানুষ। বজ্রপাতের অবস্থানগত তথ্যবিশ্লেষণ (জিআইএস) করলে দেখা যায়, ২০১০ থেকে ২০১৭ পর্যন্ত বজ্রঝড়ের অপেক্ষাকৃত বেশি বিচরণ ছিল সিলেট, শ্রীমঙ্গল, ময়মনসিংহ, ফরিদপুর, রংপুর, নীলফামারী, চুয়াডাঙ্গা, সাতক্ষীরার উত্তরাংশ এবং পটুয়াখালীর আকাশে। একই সমীক্ষায় সুনামগঞ্জ-হবিগঞ্জ-কিশোরগঞ্জের পশ্চিমাংশ সর্বাপেক্ষা বজ্রপাত আক্রান্ত এলাকা হিসেবে প্রতীয়মান হয়। ভৌগোলিক অবস্থানের কারণে আমাদের দেশের উত্তর-পূর্বাঞ্চলে বজ্রপাতের পরিমাণ অপেক্ষাকৃত বেশি। তবে উপরোল্লিখিত জেলাগুলোর মধ্যে সিলেটের সুনামগঞ্জ সর্বাপেক্ষা বজ্রপাতগ্রস্ত এলাকা। কিন্তু জলাভূমির অধিক্য ও জনবসতি কম হওয়ায় সুনামগঞ্জে মানুষের মৃত্যুর হার বিগত বছরগুলোতে অপেক্ষাকৃত কম ছিল। দেশের উত্তর-পূর্বাঞ্চল বা মধ্যাঞ্চলের জেলাগুলোতে জনসংখ্যার ঘনত্ব বেশি হওয়ায় অধিক প্রাণহানির একটি সম্ভাব্য কারণ বলে প্রতীয়মান হয়। ভারতের খাসি পাহাড় ও মেঘালয় হতে মূলতঃ ‘মার্চ’ থেকে ‘মে’ পর্যন্ত পূঞ্জিভূত মেঘ পাদদেশে অবস্থিত সুনামগঞ্জে অধিক বজ্রপাতের সংখ্যাবৃদ্ধিতে প্রভাব ফেলে। তবে শীতের শেষভাগে বঙ্গোপসাগর হতে দেশের অভ্যন্তরে আগত উষ্ণ ও আর্দ্র বাতাস বাংলাদেশের বায়ূমন্ডলে বজ্রমেঘ তৈরির উপযুক্ত পরিবেশ সৃষ্টিতে সহায়ক ভূমিকা রাখে।
বজ্রপাতকে কাজে লাগানো
প্রকৃতি সৃষ্ট মেগাভোল্ট পটেনশিয়ালের কারণে সৃষ্ট কয়েক মাইক্রোসেকেন্ড স্থায়িত্বের তড়িৎপ্রবাহ হলো বজ্রপাত। যে পরিমাণ শক্তি এই সামান্য সময়ে উৎপন্ন হয় তা সংরক্ষণ করতে পারলে বিপুল বিদ্যুৎ চাহিদা মেটানো সম্ভবপর যদিও তা যথেষ্ট জটিল, ব্যয়সাপেক্ষ ও ঝুঁকিপূর্ণ পদ্ধতি। তবে আশার কথা এই যে, বাংলাদেশ সরকারের দুর্যোগ ব্যবস্থাপনা ও ত্রাণ মন্ত্রণালয় বজ্রপাতকে দুর্যোগের আওতায় এনেছে এবং সরকার নিহতদের পরিবারকে ২০ হাজার টাকা করে আর্থিক এবং মৃত ব্যক্তির পরিবারকে ৩০ কেজি ভিজিএফ চাল দেয়া হচ্ছে। গুরুতর আহত ব্যক্তি ৫ থেকে ১০ হাজার টাকা সহায়তা পাচ্ছে। পাশাপাশি দুর্যোগ ব্যবস্থাপনা সংক্রান্ত জাতীয় পরিকল্পনায় বজ্রপাতকে অন্তর্ভুক্ত করা উচিত এবং ইউনিয়ন দুর্যোগ ব্যবস্থাপনা কমিটি ও দুর্যোগ ব্যবস্থাপনা সম্পর্কিত সংস্থাগুলোকে অধিক মাত্রায় সম্পৃক্ত করতে উদ্যোগ নিতে হবে। পরিবেশ বিষয়ক সংগঠন, মসজিদ, মন্দিরসহ জনগুরুত্বপূর্ণ জায়গায় সতর্কতামূলক বার্তা প্রচার করতে হবে। স্কুল-কলেজের পাঠ্যপুস্তকে বজ্রপাত বিষয়ে সতর্কতামূলক শিক্ষা অন্তর্ভুক্ত করা প্রয়োজন। বিগত বছরগুলোর অভিজ্ঞতাকে কাজে লাগিয়ে এবং অধিক প্রাণহানির কথা বিবেচনায় রেখে আমাদের সমাজের দুটি মেহনতি শ্রেণীর মানুষ তথা কৃষক ও জেলেভাইদের অন্তত ‘মে’ মাসে অধিক সর্তক হয়ে বজ্রঝড়ের সময় যথোপযুক্ত সাবধানতা অবলম্বনের বিষয়ে পর্যাপ্ত নির্দেশনা ও প্রশিক্ষণের ব্যবস্থা গ্রহণ করলে বজ্রপাতে অনেক প্রাণহানি রোধ করা সম্ভব হবে।
লেখক: প্রফেসর ও বিভাগীয় প্রধান, পরিবেশ বিজ্ঞান বিভাগ, বাংলাদেশ কৃষি বিশ্ববিদ্যালয়, ময়মনসিংহ