বজ্রপাত নিয়ে ব্যাপক বৈজ্ঞানিক গবেষণা প্রয়োজন

হাওরাঞ্চলের প্রধান প্রাণঘাতী প্রাকৃতিক দুর্যোগ বজ্রপাত ঝুঁকি মোকাবিলায় করণীয় বিষয়ে সুনামগঞ্জে একটি কর্মশালা করেছে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের আবহাওয়া বিজ্ঞান বিভাগ। জেলা শিল্পকলা একাডেমীর হাছনরাজা মিলনায়তনে এই কর্মশালাটি অনুষ্ঠিত হয়েছে শনিবার। ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের আবহাওয়া বিজ্ঞান বিভাগের চেয়ার পার্সন অধ্যাপক ড. তৌহিদা রশিদসহ বিশেষজ্ঞরা নিজেদের অভিমত ব্যক্ত করেছেন কর্মশালায়। কর্মশালায় উপস্থাপিত তথ্য থেকে উঠে এসেছে যে, বজ্রপাত জনিত প্রাকৃতিক দুর্যোগের ২০ বছরের পরিসংখ্যানের ভিত্তিতে দেশের ব্রজ্রপাতপ্রবণ ৫টি জেলার মধ্যে সুনামগঞ্জ প্রথম। সারা দেশে বজ্রপাতে প্রাণ হানির ৪.৮২ শতাংশই ঘটেছে সুনামগঞ্জে। গণমাধ্যমের প্রসার ও তথ্যপ্রযুক্তির উন্নতির ফলে এখন বজ্রপাতে মৃত্যুর ঘটনাগুলো অন্তরালে চাপা পড়ে থাকে না। গণমাধ্যমে প্রকাশিত হয়ে যায়। গত কয়েক বছর ধরে বজ্রপাতে মৃত্যুর যেসব ঘটনা সংবাদপত্রে প্রকাশিত হচ্ছে তা আশংকাজনক। অবস্থা এমন নয় যে, এই কয় বছরেই বজ্রপাতের প্রবণতা বেড়েছে। এই প্রবণতা আগেও ছিল, পার্থক্য হলÑআগে এসব দুর্ঘটনার খবর গণমাধ্যমে আসত কম। অথচ বজ্রপাতের মত সাংঘাতিক প্রাণঘাতী এই প্রাকৃতিক দুর্যোগ নিয়ে জাতীয় পর্যায়ে তেমন কোনো মনোযোগ ছিল না। এই ভয়ানক দুর্যোগ থেকে রক্ষা বা পরিত্রাণ পেতে করণীয় সম্পর্কেও বিশেষজ্ঞ চিন্তার অনুপস্থিতি ছিল প্রবলভাবে। দেশে যে জাতীয় দুর্যোগ প্রস্তুতি নীতিমালা প্রণীত হয়েছিল, সেখানে বজ্রপাত অন্তর্ভুক্ত হয়নি। নীতিমালায় বজ্রপাতের অন্তর্ভুক্ত না হওয়ার প্রধান কারণ হলো, এ সংক্রান্ত তথ্যের ঘাটতি। গত কয়েক বছর ধরে দৈনিক সুনামগঞ্জের খবর, বিশেষ করে ২০১২ সনের ১১ আগস্ট ধর্মপাশার সরস্বতিপুরে এক রাতের বজ্রপাতে ১৩ ব্যক্তির প্রাণ হানির পর থেকে, এ নিয়ে ধারাবাহিক আলোচনা শুরু করে। আমরা এ বিষয়ে একাধিক সংবাদ প্রতিবেদন, সম্পাদকীয় মন্তব্য, মন্তব্য প্রতিবেদন ইত্যাদি প্রকাশ করে ভয়াবহ এই দুর্যোগ সম্পর্কে নীতি নির্ধারণী মহলের দৃষ্টি আকর্ষণ করা শুরু করি। পরে অপরাপর গণমাধ্যমগুলোও এতে যুক্ত হয়। এর পরিণামে দুই বছর আগে সরকার জাতীয় দুর্যোগ ব্যবস্থাপনায় বজ্রপাতকে দুর্যোগ হিসাবে তালিকাভুক্ত করে এর প্রতিরোধে চিন্তা-ভাবনা শুরু করে। হাওর এলাকায় তালগাছ রোপণ করা কিংবা বজ্রনিরোধী দ- স্থাপনের চিন্তা ওই আলোচনারই ফলশ্রুতি। ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের আবহাওয়া বিজ্ঞান বিভাগের এই কর্মশালাটিও এরই ধারাবাহিকতায় আয়োজিত হচ্ছে বলে আমরা মনে করি।
বজ্রপাতের হাত থেকে রেহাই পেতে এখন পর্যন্ত যে আলাপ-আলোচনাগুলো হচ্ছে তার সবই এ থেকে ক্ষয়-ক্ষতির পরিমাণ কমানোর বিষয়ে। মূলত বজ্রপাতের হাত থেকে রক্ষা পেতে বৈজ্ঞানিক পন্থা উদ্ভাবনে গবেষণা কাজ শুরু হতে দেখছি না আমরা। আবহাওয়া বিজ্ঞানীরা প্রচলিত ধারণা অনুসারে নিজেদের মতামত ব্যক্ত করছেন। তাঁরা নিজেদের মত করে কিছু করণীয়রও সুপারিশ দিচ্ছেন, আলোচ্য কর্মশালায়ও এরকম কিছু সুপারিশ এসেছে। কিন্তু আমরা মনে করি, হাওরাঞ্চলের বজ্রপাত বিষয়ে বৈজ্ঞানিক গবেষণা পরিচালনার মাধ্যমে এ থেকে পরিত্রাণের পথ খোঁজতে হবে। হাওর এমন এলাকা যে, বজ্রপাতের মৌসুমেও সেখানে কাজে যেতে হবে কৃষক ও জেলে সম্প্রদায়কে। ঘুর্ণিঝড়ের মত বজ্রপাতটি একটি নির্দিষ্ট সময়ের মধ্যে ঘটে না। পুরো মৌসুম জুরেই বজ্রপাতের ঝুঁকি থাকে। তাই বজ্রপাতের ভয়ে যদি মানুষ পুরো মৌসুম হাওরে যাওয়া বন্ধ রাখেন তাহলে অত্রাঞ্চলের উৎপাদন ব্যবস্থা বিপর্যস্ত হয়ে পড়বে। সুতরাং হাওরাঞ্চলের কর্মপরিবেশ বজায় রেখে এই প্রাণঘাতী দুর্যোগ থেকে পরিত্রাণের উপায় বের করতে হবে।
বজ্রপাত সম্পর্কে রাষ্ট্র ও গবেষকদের এখন যে আগ্রহ তৈরি হয়েছে তাতে আমরা মনে করি, অচিরেই এ নিয়ে আরও ব্যাপকভিত্তিক বৈজ্ঞানিক কার্যক্রম শুরু হবে। এবং আমরা প্রকৃতির অভিশাপকে জয় করেই টিকে থাকার উপায় উদ্ভাবনে সক্ষম হব বলে আশা পোষণ করি। বর্ণিত কর্মশালাটি তারই প্রাথমিক পদক্ষেপ মাত্র।