বঞ্চিত স্থানীয়রা, সুবিধা নিচ্ছে কিছু জনপ্রতিনিধি

বিশেষ প্রতিনিধি ও জগন্নাথপুর অফিস
প্রবাসী অধ্যুসিত জগন্নাথপুর উপজেলায় গত প্রায় ১০ বছর ধরেই ভুয়া নাগরিক সনদে চাকুরি নিচ্ছে বহিরাগতরা। এ কারণে স্থানীয় লোকজন চাকুরি প্রাপ্তি থেকে বঞ্চিত হচ্ছে। সম্প্রতি নিয়োগ পরীক্ষায় উত্তীর্ণ হওয়া ভুয়া নাগরিক সনদধারী ১০ জনের যোগদান স্থগিত রাখা হয়েছে। সোমবার থেকে ১০ বছর আগে চাকুরি হওয়া অস্থানীয় আরও ২৮ জনের বিরুদ্ধে তদন্ত শুরু হয়েছে। অস্থানীয়দের ভুয়া সনদ দিয়ে কোন কোন জনপ্রতিনিধি হাজার হাজার টাকা হাতিয়ে নিচ্ছেন বলেও অভিযোগ ওঠেছে।
গত ১৪ সেপ্টেম্বর জগন্নাথপুর উপজেলার প্রাথমিক শিক্ষক নিয়োগ পরীক্ষায় উত্তীর্ণদের যোগদানপত্র নেবার জন্য জেলা প্রাথমিক শিক্ষা কর্মকর্তার অফিস থেকে চিঠি দেওয়া হয়। চিঠিতে জানানো হয় ১০ অক্টোবর জেলা শিক্ষা কর্মকর্তার অফিস থেকে এসে তাদের পদায়নের চিঠি নিতে হবে।
এর মধ্যেই এলাকাবাসীর পক্ষ থেকে গত ২৬ সেপ্টেম্বর অভিযোগ জানানো হয়, ভুয়া নাগরিক সনদধারী মিজানুর রহমান (রোল-৫৪২৩৮০৮) জগন্নাথপুরের বাসিন্দা নয়। অথচ তিনি বাড়ী কাঠাইলখাইড়, ইউনিয়ন আশারকান্দি, জগন্নাথপুর উল্লেখ করে চাকুরি নিয়েছেন। এছাড়া আব্দুল মজিদ (রোল-৫৪২৫২৯০), বাড়ী- কাঠাইলখাইড়, ইউনিয়ন আশারকান্দি, জগন্নাথপুর। আশিকুর রহমান (রোল নং-৫৪২৪৮২০) বাড়ী- ইসহাকপুর, জগন্নাথপুর পৌরসভা। সুমা আক্তার (রোল-৫৪২৪৩১৭), বাড়ী- পূর্ব ভবানীপুর, জগন্নাথপুর পৌরসভা। রুবি রানী দাশ (রোল ৫৪২৪৫৭৩) বাড়ী- জগন্নাথপুর, পৌরসভা জগন্নাথপুর, অর্ণিবান দাস (রোল ৫৪২৪৬২১) বাড়ী- করিমপুর, সিএ মার্কেট, জগন্নাথপুর পৌরসভা। লুৎফা তাহের (রোল- ৫৪২৩৯৮৫), বাড়ী- কেশবপুর, জগন্নাথপুর পৌরসভা। বিথী (রোল ৫৪২৩৮৫৯) বাড়ী- কলকলিয়া, ইউনিয়ন কলকলিয়া, জগন্নাথপুর। আখিঁ সরকার (রোল ৫৪২৪১৪১) বাড়ী- তাজপুর, ইউনিয়ন আশারকান্দি, জগন্নাথপুর। নাজমা আক্তার (রোল ৫৪২৪১৭৫) বাড়ী- কাঠাইলখাড়, আশারাকান্দি ইউনিয়ন, জগন্নাথপুর, দেখিয়ে চাকুরি নিয়েছেন।
আশারকান্দি ইউপি চেয়ারম্যান আবু ইমানি বললেন,‘গত ১২ জুলাই আব্দুল মজিদ নামের একজনের সনদ আমার ইউনিয়ন থেকে নেওয়া হয়েছে। এই নামে ইউনিয়নের কাঠাইলখাইড়ে শিক্ষক হিসাবে চাকুরি হয়েছে এমন কোন মানুষ নেই। ঐ নাগরিক সনদ নেবার সময় আমি যুক্তরাজ্যে ছিলাম। ভারপ্রাপ্ত চেয়ারম্যান বকুল চন্দ্র দাস নাগরিক সনদ দিয়েছেন। তিনি (বকুল চন্দ্র দাস) জানিয়েছেন, আব্দুল মজিদ তাঁকে জন্মসনদ ও ভোটার আইডি দেখিয়েছেন।’ তিনি জানান, তাঁর ইউনিয়নের অন্য আরও তিন ভুয়া সনদধারীর মুড়ি বই খুঁজে পাওয়া যাচ্ছে না। ঐ ৩ জনের নাগরিকত্ব তিনি চেয়ারম্যান হবার আগে নেওয়া হয়েছে বলে দাবী তাঁর।
আশিকুর রহমান, সুমা আক্তার ও অর্ণিবার দাসকে জগন্নাথপুর পৌর এলাকার বাসিন্দা নয় উল্লেখ করে প্রত্যয়নপত্র দিয়েছেন জগন্নাথপুর পৌরসভার প্যানেল মেয়র শফিকুল হক।
রুবি রানী দাশ জগন্নাথপুরের স্থায়ী বাসিন্দা না হলেও দীর্ঘদিন ধরে তার পরিবার জগন্নাথপুর গ্রামে বসবাস করছে বলে দাবী স্থানীয় পৌর কাউন্সিলর গিয়াস উদ্দিনের।
লুৎফা তাহের নামের আরও একজনের জগন্নাথপুর পৌরসভার নাগরিক সনদ নিয়ে চাকুরি হয়েছে। লুৎফা তাহের নিজের বাড়ী কেশবপুর উল্লেখ করলেও কেশবপুরের একাধিক বাসিন্দা জানিয়েছেন লুৎফার বাড়ী কেশবপুরে নয়।
জগন্নাথপুর পৌরসভার মেয়র আব্দুল মনাফ মুঠোফোন রিসিভ না করায় এ ব্যাপারে তাঁর বক্তব্য জানা যায়নি।
বিথী নামের আরও একজনের কলকলিয়া ইউনিয়নের নাগরিক সনদ দিয়ে চাকুরি হয়েছে। তার বিরুদ্ধেও স্থানীয় নয় বলে অভিযোগ করা হয়েছে।
কলকলিয়া ইউনিয়নের ভারপ্রাপ্ত চেয়ারম্যান আব্দুল হাসিম অবশ্য দাবী করেছেন বিথীদের কলকলিয়ায় নিজস্ব বাড়ী রয়েছে। সে কলকলিয়া ইউনিয়নের বাসিন্দা।
অস্থানীয়দের নয়, স্থানীয়দের চাকুরি চাই, এই দাবীতে সোচ্চার জগন্নাথপুরের নাগরিক সংগঠন জগন্নাথপুর উন্নয়ন কমিটির আহ্বায়ক সুদীপ ভট্টাচার্য বললেন,‘আমরা শুনেছি কোন কোন স্থানীয় সরকার প্রতিনিধি প্রথম ভুয়া নাগরিক সনদ দিয়েছেন। পরে আবার প্রত্যয়ন দিয়ে বা মৌখিকভাবে জানিয়েছেন সংশ্লিষ্টরা তাঁর ইউনিয়ন বা পৌরসভার নাগরিক নয়। এখন আবার শুনা যাচ্ছে তাঁরা ভুয়া সনদধারীদের স্থায়ী নাগরিক সনদ দিচ্ছেন। এটি দুঃখজনক।’ তিনি জানান, দীর্ঘদিন ধরে জগন্নাথপুরে এমন জালিয়াতি চলছে। এ কারণে স্থানীয়রা চাকুরি প্রাপ্তি থেকে বঞ্চিত হচ্ছে।
জেলা প্রাথমিক শিক্ষা কর্মকর্তা পঞ্চানন বালা বললেন,‘ভুয়া নাগরিক সনদ দিয়ে চাকুরি নিয়েছেন দাবী করে জগন্নাথপুরের ৭ জনের বিরুদ্ধে লিখিত অভিযোগ হয়েছে। আগামী তিনদিনের মধ্যেই এই অভিযোগের তদন্তের জন্য কমিটি হবে। তদন্ত করে প্রাপ্ত তথ্যের ভিত্তিতে ২৪ তারিখের মধ্যে ব্যবস্থা গ্রহণ করা হবে।’ তিনি জানান, ১০ বছর আগে চাকুরি নিয়েছেন, এমন ২৮ জন শিক্ষকের বিরুদ্ধেও অস্থানীয় বলে অভিযোগ উঠেছে এবং সোমবার থেকে তাদের বিরুদ্ধেও বিভাগীয় তদন্ত শুরু হয়েছে।