‘বনশ্রী’ তোমার জন্য…

উজ্জ্বল মেহেদী
সময়টা এখন এনালগ থেকে ডিজিটাল। এই দুই সময়ের মাঝে দাঁড়িয়ে আমরা যারা সাংবাদিকতা করছি, তাদের চোখে বদলে যাওয়া সময়টা স্থিরচিত্রের মতো। বর্তমান তো বহতা নদী, দেখছি আর পথ চলছি। এই চলার পথে চোখ মুজলেই দেখা যায় আগের ছবি। আমি দেখি, একটি সময়কে। যে সময়ে ‘বনশ্রী’ ছিল আমাদের পাশে।
বনশ্রী একটি স্টুডিওর নাম। ছোট সুনামগঞ্জ শহরে একদিন আধুনিকতার ঢালা মেলে বনশ্রী স্টুডিও আত্মপ্রকাশ করল। সাধন, ছফেদা, মিন্টু ফটোস্টুডিও নামগুলোর সঙ্গে পাল্লা দিয়ে শহরের কেন্দ্রস্থল ডিএস রোডে নোঙর করল বনশ্রী। পুরোনো পৌর ভবনের ঠিক সামনে। প্রতিষ্ঠাতা দেবাংশু দাশ রেন্টু।
এই নামটির সঙ্গে পরিচিত এসএসসি পরীক্ষার রেজিস্ট্রেশন করার সময়। ফরম ফিলাপ করতে সদ্য তোলা সাদাকালো ছবি লাগে। আমার সেজু ভাই (রেজাউল করিম খান, আইনজীবী সিলেট বার) বলে দিলেন বনশ্রীতে যেতে। ভাইয়ের ক্লাসমেট, প্রথম সাক্ষাতে ‘রেন্টুদা’ বলে সম্মোধন করলাম। পাসপোর্ট সাইজ ছবি তুললেন। বসিয়ে রেখে হাতে দিলেন। কিন্তু কোনো টাকা রাখলেন না। ভাইয়ের ক্লাসমেট হওয়ার সুবাধে রাতারাতি ছবি হাতে পেলাম, টাকাও দিতে হলো না। রেন্টুদার ওপর ভাইয়ের ভরসা ভর করল সেদিন থেকে।
স্কুল থেকে কলেজে গেলাম। লাইব্রেরিতে গিয়ে দেখি বিখ্যাতজনদের বড় বড় পোট্টেট। নিচে বড় করে লেখা ‘রেন্টু আর্ট’। এই রেন্টু আর্ট কি সেই ফটোস্টুডিওর রেন্টুদা? রেজাউল ভাইকে জিজ্ঞেস করে নিশ্চিত হলাম। ফটো তোলার কারিগরের প্রতি আরেক মায়া, গুণী শিল্পী তিনি। সাংবাদিকতার পথ ধরে হাঁটার সময় ছবির প্রয়োজনে আবার রেন্টুদার পাশে যাওয়া। এবারও রেন্টুদা বাণিজ্যিক দৃষ্টি রাখলেন না। সাদাকালো ছবি তুলতে গেলে শুধু ফিল্মটার দাম নিতেন। বাকি সব কাজ ফ্রিতে করে দিতেন। এভাবে করতে করতে একদিন আমার ছবির এঙ্গেলেরও ভক্ত হয়ে গেলেন। একদিন ডেকে নিয়ে ডাকরুমে প্রবেশ করালেন। ফিল্মের ‘নেগেটিভ’ থেকে কিভাবে ছবি কার্ড করতে হয়, শেখালেন। বনশ্রীতে যে দু-একজন কর্মচারী ছিল, তাঁদেরকেও বলে দিলেন আমার ব্যাপারে। সেই থেকে বনশ্রী আমার সাংবাদিকতার সূচনা পর্ব থেকে সঙ্গী। ভালো কোনো ছবি পেলে তিনি খবর দিতেন। অথবা পথ চেয়ে বসে থাকতেন। আমাকে দেখলে ডাক দিতেন। কিন্তু একসঙ্গে খলিল আর আমি থাকতাম বলে, খলিলকে উজ্জ্বল আর উজ্জ্বলকে খলিল বলে ধন্দে পড়ে যেতেন। এই ধন্দে কখনো বাকিতে ফিল্ম নিতাম আমি। আর রেন্টুদা লিখে রাখতেন খলিলের নামে। মাস শেষে বিল দেওয়ার সময় গিয়ে ধন্দ ভাঙত। কখনো ভাঙতই না। কিন্তু রেন্টুদার এই খলিল-উজ্জ্বর ঘোরেরও অবসান হতো না।
একদিন আমরা দুজন বসে এই ঘোর কাটানোর চেষ্টা করি। রেন্টুদার ব্যস্ত সময়ে দীর্ঘক্ষণ বনশ্রীতে বসি। এভাবে মাসখানেক কাটানোর পর কিছুটা এই ঘোর কেটেছিল। কিন্তু পরক্ষণে আবার যেইসেই। কাটল না খলিল-উজ্জ্বল ধন্দ। শেষে বিরক্ত রেন্টুদা বললেন, ‘তোমরা তো জুটি, এই জন্য আর এই ঘোর কাটানো সম্ভব না।’ আমরা হাল ছেড়ে দেই। সিলেট আসার পর একদিন রাতে গেলাম বনশ্রীতে। রেন্টুদা দেখলাম, এবার ঠিকই খলিল-উজ্জ্বল ভেদ করলেন। জানালেন, তিনি ইচ্ছা করেই সেই ঘোরটা লালন করে রাখতেন। বনশ্রীর এই মায়াজাল ছিন্ন করে রেন্টুদা চলে গেলেন। কতকিছুই মনে পড়ছে, কোনটা রেখে কোনটা লিখি? করোনার এই সময়ে সামাজিক যোগাযোগমাধ্যম ফেসবুক তথ্য আদানপ্রদান, ক্রিয়া-প্রতিক্রিয়া বিনিময়ে বড় ভূমিকা রাখছে। ফেসবুকে চোখ রাখতেই রেজাউল ভাইয়ের একটি লেখা চোখে পড়ল। তিনি লেখক নন, কিন্তু সমঝদার পাঠক। করোনার ঘরবন্দী সময়ে তাঁকে লেখক তৈরি করেছে। সরল বন্ধুর প্রতি লেখাটি পড়ে চোখে জল গড়িয়ে পড়ল। পংকজদাকে বললাম, রেন্টুদাকে নিয়ে লিখতে চাই। পংকজদা-ও রেন্টুদার ক্লাসমেট। পত্রিকার গেটআপ মেকআপ শ্লথ করে তিনি সময় বেঁধে দিলেন। আমি লিখছি, লেখার পেটে ঢুকিয়ে দিলাম রেজাউল ভাইয়ের পুরো লেখাটিও-
‘আমার বন্ধু দেবাংশু দাশ রেন্টু। বনশ্রী আর্ট অ্যান্ড ষ্টুডিওর স্বত্বাধিকারী। চমৎকার ছবি আঁকতে পারতো। হাতের লেখা ছিল ছাপার অক্ষরের মতো। সুন্দর ছবি তুলতে পারত। শহরের সকল সামাজিক ও পারিবারিক অনুষ্ঠানেও ছবি উঠানোর ডাক পড়ত। তার ষ্টুডিওতে শহরের অনেক গণ্যমান্য প্রয়াত ব্যক্তিদের ছবি টাঙানো থাকতো। ছিলো অনেকের সাথে মধুর সম্পর্কও। রেন্টু নামেই সারা শহরে সবার কাছে পরিচিত ছিল । আমার সাথে তার পরিচয় হয় ১৯৯০ সালে সুনামগঞ্জ সরকারি কলেজের স্নাতক পড়াকালীন । সে আমার এক ক্লাস সিনিয়র হলেও স্নাতক শ্রেণিতে পড়ার সময় বন্ধুত্ব হয়। স্নাতক সমাপ্তির পর শহরের কালীবাড়ি রাস্তার মোড়ে বনশ্রী আর্ট অ্যান্ড ফটোষ্টুডিওর ব্যবসা শুরু করে। এরপর কালীবাড়ি থেকে পৌরবিপণি। সব শেষে পুরাতন পৌরসভার সামনে । আমার বেকার জীবনের অধিকাংশ সময়ই তার দোকানে আড্ডা দিয়ে সময় পার করতাম। অত্যন্ত বন্ধুসূলভ মানুষ ছিল। প্রতিদিন সন্ধ্যায় আমি কিবরিয়া, মিজান, হিরন আচার্য, হিমেন্দু, সুবীরসহ অনেকেই তার দোকানে আসতাম। চলত রাত দশটা-এগারোটা পর্যন্ত আড্ডা গল্প গুজব। আজ সবই স্মৃতি হয়ে গেল। তৎকালীন সময়ে শহরের অধিকাংশ সাংবাদিকরা ডিজিটাল যুগের আগে রেন্টুর বনশ্রী ষ্টুডিওতে ছবি প্রিন্ট করাতেন। সকলেই তখন সম্মানজনক দুরত্ব বজায় রেখে সিনিয়র-জুনিয়র সাংবাদিকরা সমান তালে তার সাথে আড্ডা দিতেন। কেউ দাদা ডাকতেন, আবার অনেকে তুই তোকারি করেও কথা বলতেন। কারো সাথে কখনো তার সম্পর্কের অবনতি ঘটত না। সব বয়সের লোকের সাথে তার সুসম্পর্ক ছিল। আমার ছোট ভাইয়ের সাথেও তার পরিচয় ছিল। একসময় আমবাড়িবাজারেও বনশ্রী ষ্টুডিওর একটি শাখা খুলেছিল। সেখানে সপ্তাহে দুই তিন দিন যেত। বউদিকেও সে ব্যবসার মধ্যে মাঝে মাঝে বসাত। বউদি শ্রীমঙ্গলের মেয়ে। তাকে খুব উৎসাহ দিতেন তার কাজে কর্মে । শেষ দিকে তার ব্যবসা খুব একটা ভালো ছিল না। মাত্র কিছু দিন আগে মোটা অংকের টাকা দিয়ে একটি ডিজিটাল ল্যাব ক্রয় করেছিল। তার সাথে আমার সর্বশেষ কবে দেখা হয়েছিল, তা খেয়াল নেই। তবে গত ফেব্রুয়ারির শেষে তার দোকানে গিয়ে জানলাম বউদি অসুস্থ এবং তাকে নিয়েই চিকিৎসার জন্য সে ব্যস্ত। বউদিকে নিয়ে সে ভারতও গিয়েছিল। তার অসুস্থতার খবর পেয়েছি গত রমজানের আগে। সরাসরি দেখা হয়নি দীর্ঘদিন। আজ সে করোনা আক্রান্ত হয়ে না ফেরার দেশে চলে গেল। আর কোনোদিন দেখা হবে না, আড্ডা হবে না। ভালো থাকিস বন্ধু।’
রেজাউল ভাইয়ের লেখা এখানেই শেষ। আমার শোক বিহ্বলতা আর কাটে না। মনে পড়ে,
তখন ছবি তুলতাম, রিপোর্টও করতাম। দুটো কাজ একসঙ্গে করতে গিয়ে সাপোর্ট নিতে হতো স্টুডিওর। ‘বনশ্রী’ সেই সাপোর্ট দিত। পংকজদা-ও বনশ্রীতে যেতেন। আমি একটু বেশি যেতাম, কারণ আমার কাজও ছিল বেশি। যখনতখন স্টুডিওতে গিয়ে সাদাকালো ছবির কাজ তাৎক্ষনিকভাবে করতাম। বাণিজ্যিক ব্যস্ততায় এক সময় সাদাকালো ছবি নিজে থেকে করে নিতে ‘ডাকরুম’ বিদ্যা রপ্ত করলাম। বনশ্রী আমাকে সেই সুযোগ করে দিল। এই সুযোগে কখনো রেন্টুদা আমাকে ডাকতেন, ছবির এঙ্গেল বোঝানোর জন্য। এটা হতো বেশি ভোটের সময়। প্রার্থী বা নেতাদের ছবি কিভাবে তুলবেন, কোন এঙ্গেলটা নতুন, সেই জন্য আমার অপেক্ষা চলতো। আমি যেতাম, অপেক্ষার তিক্ততা তাঁর এক মুখ নিরব হাসিতে ফুরাত।
এই লেখা যখন লিখছি, তখন পুরোনা পত্রিকায় ফাইল ঘাঁটছি। দেখি যত ছবি ছাপা হয়েছে, সিংহভাগ বনশ্রী থেকে কাজ করা।

২০০১ সালের ২০ ফেব্রুয়ারি বাউলসম্রাট শাহ আবদুল করিম একুশে পদক পান। কিন্তু নাম নিয়ে গোল বাধে। মন খারাপ শাহ আবদুল করিমের। একদিন বনশ্রীর সামনে দিয়ে হেঁটে শাহ আবদুল করিম তাঁর ছেলেকে নিয়ে যাচ্ছিলেন। শাহ আবদুল করিমকে স্টুডিওতে বিসিয়ে রেন্টুদা স্টুডিওর একজন কর্মচারীকে পৌর বিপণিতে পাঠান আমার খোঁজে। আমি হন্তদন্ত হয়ে এলাম। রেন্টুদা জানালেন, ছবি তুলে রাখতে চান। কিভাবে তুলবেন, সেই বিষয়টি জানার জন্য আমাকে তালাশ করেছেন। আমি জানালাম, দুজনকে পাশাপাশি দাঁড় করিয়ে ফুল ছবি নেন। কারণ, এই দুজন দীর্ঘদেহী মানুষ, দুজনের পাশাপাশি অনেক ছবি হয়তো আছে। কিন্তু পা থেকে মাথা পর্যন্ত একসঙ্গে বাবা ছেলের ছবি হয়তো এটাই প্রথম হবে।
রেন্টুদা মনের আনন্দে ছবি তুলেছিলেন সেদিন। আমি সেই ছবির একটি পত্রিকায় দিলাম। কোনো কাটাকুটি ছাড়াই ছবিটি ছাপা হয়েছিল। রেন্টুদা দেখে বললেন, ‘বাহ! তোমার মতো তোমার পত্রিকাও বুঝল ফুল ছবির কদর!’
শুরুতে বলেছিলাম ডিজিটাল সময়, এই কথায় ফিরছি। গণমাধ্যমের জন্য সময়টার আরেক নাম হতে পারে মহাসমুদ্র। নদীর স্রোতের মতো সব ঘুরেফিরে। এভাবে একটি ছবি সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমেও ঘুরছে। সাদাকালো ছবিটি হিমুখ্যাত চরিত্রাভিনেতা ফজলুল কবীর তুহিনের। তুহিন ভাই তখন ‘ওই জা বোর্ড’ নাটকে ‘আইজ পাশা খেলবো রে শ্যাম’ গান গেয়ে (মূল গায়ক সেলিম চৌধুরী, তুহিন ভাই গানে অভিনয় করেছিলেন) বেশ পরিচিত। সুনামগঞ্জ শহরে যখন গেলেন, তখন আমি তাঁর একটি ছবি বনশ্রীতে গিয়ে তুলতে বলি। তার আগে ছবির এঙ্গেল রেন্টুদাকে বলে চলে যাই। তুহিন ভাই গেলেন। রেন্টুদা সাদাকালো ছবি তুললেন। অসাধারণ। প্রিন্ট করে যখন আমার হাতে দিলেন, তখন ছবি তোলার প্রশংসা করতেই রেন্টুদা তোমরার জন্যই সুন্দর হয়েছে ছবিটি। সেই ছবি তুহিন ভাই সংগ্রহ করে নিয়ে গিয়েছিলেন। এখনো ফেসবুক প্রোফাইলে আছে ছবিটি।
রেন্টুদাবিহীন বনশ্রী এখন। বনশ্রী তোমার জন্যই বলছি, এ রকম শতসহস্র ছবির মধ্যে নীরবে বেঁচে থাকবেন একজন দেবাংশু দাশ রেন্টু।
লেখক : উজ্জ্বল মেহেদী : সিলেটে প্রথম আলো’র নিজস্ব প্রতিবেদক।