বন্যার পানি নামতেই নদী ভাঙন শুরু

বিশেষ প্রতিনিধি
সুনামগঞ্জের নদীর পাড়ের বাসিন্দারা বন্যার পানি নামার পর নতুন ভোগান্তিতে পড়েছেন। শুরু হয়েছে নদী ভাঙন। জেলার দুটি বড় নদীর ১৫ টি গুরুত্বপূর্ণ জনবসতিতে ভাঙন শুরু হয়েছে। নদী পাড়ের বাসিন্দারা বলেছেন, ‘মরার উপর খাঁড়ার ঘা’ শুরু এখন। দেখতে দেখতে নদীর পাড় ভেঙে বাড়িঘর বিলীন হয়ে যাচ্ছ্।ে
সুনামগঞ্জ শহরের পাশ দিয়ে বয়ে যাওয়া সুরমা নদীর পাড় উপচে গেল ১৭ মে থেকে দোয়ারাবাজার, সুনামগঞ্জ সদর ও ছাতক উপজেলা বন্যা কবলিত হয়েছিল। নদীর পানি কমতে শুরু হয় ছয়দিন আগে থেকেই। পানি কমতি শুরু হতেই নদী ভাঙনের দুর্গতি শুরু হয়েছে। প্রতিদিনই নদী গ্রাস করছে বাড়ি-ঘর, দোকানপাঠ- জনবসতি। বিপদে পড়েছেন তীরবর্তী এলাকার বাসিন্দারা। সুনামগঞ্জ শহরের লঞ্চঘাট, জেলরোড, শহরতলির ইব্রাহিমপুর, সদরগড়, দোয়ারাবাজার উপজেলা সদর. এই উপজেলার আমবাড়ি এলাকা ব্যাপকভাবে ভাঙছে। সুনামগঞ্জ সদর উপজেলার ইব্রাহিমপুর, অচিন্তপুর, ধারারগাঁও ও ব্রাহ্মণগাঁও নদীগর্ভে বিলীন হতে চলেছে। কুশিয়ারা গ্রাস করছে জগন্নাথপুর উপজেলার ফেচীর বাজার, রানীগঞ্জ বাজার ও বাঘময়না গ্রাম। শাল্লার ফয়জুল্লাপুর ও প্রতাপপুর এবং দিরাইয়ের আখিলশাহ্ বাজার ভাঙচে সুরমা নদী।
সুনামগঞ্জ শহরতলির সদরগড় গ্রামের ফুলেছা বেগম (৭০) বললেন, ‘বন্যার পাইন্নেতো হকলতা নেয় না, নদীয়ে ধরলে রাইক্কা যায় না কোনতা, আমরা বাবা অখন নদী ভাঙনো পড়ছি। বাইচ্চা-কাইচ্চা নাতি নাতল লইয়া কোনান যাইতাম।’ এই গ্রামের মো. বারিক মিয়া (৫০), আয়াতুননেছা (৪৫) ও আম্বিয়া বেগম (৪০) একই ধরণের মন্তব্য করলেন।
দোয়ারাবাজারের মাঝেরগাঁওয়ের বীর মুক্তিযোদ্ধা নুরুল ইসলাম বললেন, হেমন্তের শুরুতেই ভাঙন এলাকায় জিও ব্যাগ বিছিয়ে ব্লক বিছানোর কথা বলেছিলাম। বানানো ব্লক ফেলে নি তারা (ঠিকাদারের লোকজন)। এখন বাড়ি-ঘর নদীগর্ভে যাচ্ছে। শেখ হাসিনা ঘর দিয়েছিলেন, এটিও নদীগর্ভে যাবে। গেল চার পাঁচ দিনে মাঝেরগাঁওয়ের ছত্তার মিয়া, বাদশা মিয়া, আলাউদ্দিন, ইসলাম উদ্দিন, সমর আলী ভট্টু, শফিকুল ইসলাম, নূর উদ্দিন ও হাবিবুল ইসলামের ঘর নদীতে গেছে।
নদী ভাঙন ঠেকাতে দোয়ারাবাজারে প্রতিরক্ষার কাজ দুই বছর আগে শুরু হলেও ভাঙন এলাকার মানুষ এখনো এর সুরক্ষা পায় নি।
দোয়ারাবাজার উপজেলা সদরের ভবনের সামনের অংশ, মংলারগাঁও, মাঝেরগাঁও, মুরাদপুর, পূর্ব মাছিমপুর ও পশ্চিম মাছিমপুর এলাকা নদী ভাঙনে বিলীন হচ্ছে কয়েক বছর ধরেই। ইতিমধ্যে এসব এলাকার দোকানপাঠসহ দুই শতাধিক বসতবাড়ি নদীতে বিলীন হয়েছে।
পানি সম্পদ মন্ত্রণালয় দোয়ারাবাজারের ভাঙন ঠেকাতে ২০২০ সালের নভেম্বরে দুটি প্রকল্প হাতে নেয়। ৭৮ কোটি টাকায় ছয় প্যাকেজে নদী খনন এবং ৮৪ কোটি টাকায় নয় প্যাকেজে নদী সংরক্ষণ কাজ শুরু করে।
নদী খননের তিনটি প্যাকেজ রাজধানী ঢাকার একোয়া মেরিন এবং আরও তিনটি প্যাকেজের কাজ পায় ঢাকার জামিল এ- ব্রাদার্স।
নদী সংরক্ষণ প্রকল্পের পাঁচ প্যাকেজ রাজধানী ঢাকার আতাউর রহমান খান, দুটি নেত্রকোণার অসিম সিংহ, দুটি জয়েন্ট ভেঞ্চারে পায় ঢাকার টেকবে ইন্টারন্যাশনাল ও প্রিডম কন্সট্রকসন।
এরা সকলেই মন্থরগতিতে কাজ করছেন। স্থানীয়দের দাবি তারা ভাঙন ঠেকাতে গুরুত্ব দিয়ে দ্রুত কাজ করলে এবারের বর্ষায় ভাঙন কম হতো। এলাকাবাসীর ক্ষয়ক্ষতি হতো না।
পানি উন্নয়ন বোর্ডের দোয়ারাবাজার নদী ভাঙন প্রকল্পের দায়িত্বপ্রাপ্ত সুনামগঞ্জ পাউবো’র উপ-বিভাগীয় প্রকৌশলী শমশের আলী মন্টু বললেন, হেমন্ত মওসুমে জিওব্যাগ দিয়ে ব্লক বিছানোর জন্য তাগাদা দেওয়া হয়েছিল। ঠিকাদারদের কাজের মেয়াদ আরও প্রায় এক বছর বাকী আছে। এজন্য কাজ বাস্তবায়নে গড়িমসি করছে তারা। এখন পানি আরও না কমলে কোন কাজই করা সম্ভব নয়।
সুনামগঞ্জ পানি উন্নয়ন বোর্ডের নির্বাহী প্রকৌশলী শামছুদ্দোহা বললেন, শনিবার নদীর পানি ৮২ সেন্টিমিটার নীচ দিয়ে যাচ্ছিল। নদীর পানি কমা শুরু হলেও নদী ভাঙন প্রতিবছরই শুরু হয়। গত কয়েকদিন নদী টইটুম্বুর ছিল, পানি উপচে জনবসতি প্লাবিত করেছে। এখন পানি কিছুটা কমেছে। তবে নদী এখনো ভরাট রয়েছে। এখন ভাঙন যতটা আছে, পানি কমলে আরও বেশি ভাঙবে। দোয়ারাবাজারে নদীর তীর প্রতিরক্ষার কাজ চলছে। সুনামগঞ্জে সুরমা নদীর সাড়ে নয় কিলোমিটার তীর সংরক্ষণ ও ড্রেজিংয়ের জন্য প্রকল্প হচ্ছে। এই প্রকল্পের সমীক্ষা কাজ শীঘ্রই শুরু হবে।