বরাক-সুরমা উপত্যকার লোকসাহিত্য চর্চা

নন্দলাল শর্মা
এক.
বিশ্বের সকল দেশেই লিখিত সাহিত্যচর্চা আরম্ভ হওয়ার বহু আগে থেকেই লোকসাহিত্যের উদ্ভব ও বিকাশ। লোকসাহিত্য প্রাজ্ঞ মানুষের অভিজ্ঞতালব্ধ মনীষার নির্যাস। এজন্য এ সাহিত্যের লেখকের নাম অজ্ঞাত। আমাদের পূর্বপুরুষগণ লেখক ছিলেন না । কারণ তখন লেখার ব্যবস্থা ছিলনা। লিখনপদ্ধতি আরম্ভ হলেও তা সাধারণ মানুষের নাগালের বাইরে ছিল। নাগালের মধ্যে আসার পরও লোকসাহিত্য সৃষ্টি হয়েছে। এখনও যে হচ্ছে না তা বলা যায় না। তাই লোকসাহিত্য রচনা ঠিক কখন আরম্ভ হয়েছিল তা বলা যাবে না। তবে লোকসাহিত্য সংগ্রহ ও চর্চা আমাদের দেশে খুব বেশি দিনের ঘটনা নয়।
উনিশ শতকে বাঙালির নবজাগরণ ঘটে। এই নবজাগরণের ফলে বাঙালি আত্ম আবিষ্কারে ব্রতী হয়। এর সুফল সাহিত্যে নানাভাবে আসতে থাকে। লোকসাহিত্য ও সংস্কৃতি চর্চা নবজাগরণেরই ফল। বরাক-সুরমা উপত্যকার ভাষা ও সংস্কৃতি বহুকাল থেকেই অভিন্ন। ১৮৭৪ সালে বাংলার তৎকালীন শ্রীহট্ট জেলা নবগঠিত আসাম প্রদেশের সঙ্গে যুক্ত হয়। ১৯০৫ সালে বঙ্গভঙ্গ হলে শ্রীহট্ট পূর্ববঙ্গে ফিরে আসে। ১৯১১ সালে বঙ্গভঙ্গ রদ হলে শ্রীহট্ট আবার আসামের সঙ্গে যুক্ত হয়। ১৯৪৭ সালে ভারত বিভক্ত হওয়ার পূর্ব পর্যন্ত বরাক-সুরমা উপত্যকার সাহিত্যের ইতিহাস এক ও অভিন্ন।
বরাক-সুরমা উপত্যকায় লোকসাহিত্য চর্চার “সূচনা হয়েছিল ঊনবিংশ শতাব্দীর একেবারে শেষ লগ্নে। ১৮৯৮ খ্রিস্টাব্দের শেষভাগে এ. পোর্টিয়স সিলেটের ডেপুটি কমিশনার হয়ে আসেন। তখন শ্রীহট্টের এবং কাছাড়ের স্কুলসমূহের ডেপুটি ইন্সপেক্টর ছিলেন পদ্মনাথ ভট্টাচার্য। চাকুরির আবশ্যিক রীতি অনুযায়ী পদ্মনাথ ভট্টাচার্য ডেপুটি কমিশনার ও সাবডিভিশনাল অফিসারের সঙ্গে পরিচিত ছিলেন। কিন্তু এর অতিরিক্ত এমন দু একটি বিষয় এসে উপস্থিত হয়েছিল যেগুলোকে কেন্দ্র করে পদ্মনাথ ভট্টাচার্যের সঙ্গে ডেপুটি কমিশনারের প্রীতিকর ঘনিষ্ঠতা গড়ে উঠেছিল।” (অমলেন্দু ২০০০:৫)
পদ্মনাথ ভট্টাচার্যের লেখা থেকে জানা যায় গ্রিয়ার্সন (পরে স্যার ও জর্জ)তখন সারা ভারতের ভাষাতত্ত্ব সঙ্কলনের কাজ করছিলেন। সমকালে
ভারতের প্রচলিত লোকাচার সম্পর্কে প্রত্যেক জেলার তথ্য সংগ্রহে ব্রতী হন উত্তর প্রদেশে কর্মরত সিভিলিয়ান উইলিয়ম ক্রুকস। বরাক-সুরমা উপত্যকায় প্রচলিত লোকাচার বিষয়ক তথ্য সংগ্রহের দায়িত্ব এ. পোর্টিয়স-এর মাধ্যমে পদ্মনাথ ভট্টাচার্যকে প্রদান করা হয়। এব্যাপারে তিনি নিজেই স্মৃতিচারণ করে লিখেছেন, “এই বিষয়ে তথ্য সংগ্রহার্থে আমাকে অনেক বিদ্যালয়ের সেক্রেটারী, শিক্ষক ও মৌলভীর নিকট প্রশ্ন পাঠাইয়া উত্তর আনাইতে হইয়াছিল। আমার অভিভাবককল্প মৎপূর্ববর্তী ডেপুটী ইন্সপেক্টর রায়সাহেব নবকিশোর সেন মহাশয়ও যথেষ্ট সাহায্য করিয়াছিলেন। এই ব্যাপারে স্বদেশের তথ্য সংগ্রহ বিষয়ে আমার হাতেখড়ি হইয়াছিলÑপরিণাম শ্রীহট্টের ইতিবৃত্ত।” (পদ্মনাথ ১৩৩৬:৪)
সিলেট অঞ্চলে লোকসাহিত্য সংগ্রহ ও আলোচনা আরম্ভ হয়েছে উনিশ শতকের শেষ প্রান্তে। কিন্তু এর বিকাশ সাধিত হয়েছে বিশ শতকের সূচনা লগ্নে। এ ব্যাপারে যাঁরা পথিকৃৎ-এর ভূমিকা পালন করেছেন তাঁদের মধ্যে উল্লেখযোগ্য হলেনÑঅচ্যুতচরণ চৌধুরী, পদ্মনাথ ভট্টাচার্য, প্রেমদাময়ী আদিত্য, রেবতীমোহন আদিত্য চৌধুরী, প্রফুল্ল কুমার দে চৌধুরী, প্রভাতচন্দ্র দেবশর্মা, সুতপা দেবী, সুপ্রভা দত্ত, বেলারাণী দেবী, সৈয়দা নজিবুন্নেছা খাতুন, শৈলজাসুন্দরী দত্ত, কৃষ্ণবিহারী রায়চৌধুরী, তারিণীচরণ দাস, জগন্নাথ দেব, গুরুসদয় দত্ত, মোহাম্মদ আশরাফ হোসেন, আব্দুল আজিজ মাস্টার, ব্রজেন্দ্রনাথ অর্জুন, রাজমোহন নাত, মতিন ইদ দীন আহমদ, মুহাম্মদ আবদুল বারী, সৈয়দ মুর্তাজা আলী, যতীন্দ্রমোহন ভট্টাচার্য, আবদুল গাফফার চৌধুরী, আবদুল জব্বার প্রমুখ।
প্রাথমিক পর্যায়ে বরাক-সুরমা উপত্যকায় যাঁরা লোকসাহিত্য সংগ্রহ ও আলোচনায় ব্রতী হন তাঁরা বৈরী পরিবেশে কাজ করেছেন। তখন যাতায়াত ব্যবস্থা উন্নত ছিল না। গ্রাম থেকে গ্রামান্তরে পায়ে হেঁটে বা নৌকাযোগে তারা ঘুরে বেড়িয়েছেন। এজন্য তাদের কোন পৃষ্ঠপোষকতা ছিল না, ছিল না কোন প্রতিষ্ঠান। ব্যক্তিগত উদ্যোগে তাঁরা কাজ করেছেন প্রাণের তাগিদে। তখন লোকসাহিত্য প্রকাশের জন্য কোন সাময়িক পত্র ছিল না। তাই অনেকের আলোচনা প্রকাশিত হয় নি, সংগৃহীত মালমশলাও ছাপার অক্ষরে প্রকাশিত হয় নি। লিখিত পা-ুলিপিও ধ্বংস হয়ে গেছে। এ অঞ্চলে কোন সংগ্রহশালা বা আরকাইভ গড়ে উঠেনি এখনও। সেকালের সংগ্রাহকগণ “প্রাণপাত কষ্ট স্বীকার করে, অনেক সময় জীবনের ঝুঁকি নিয়ে সংগ্রহ করেছেন দুর্গম পল্লীর পথে প্রান্তরে, হাটে মাঠে ছড়ানো ছিটানো লোকসাহিত্য ও সংস্কৃতির অসংখ্য উপাদান, উপকরণ।” (মহবুবুল ২০১৬:)
বরাক-সুরমা উপত্যকায় লোকসাহিত্য চর্চাল প্রাথমিক স্তরে ব্যক্তি ছাড়াও সংগঠন ও সাময়িকপত্রের ভূমিকা উল্লেখযোগ্য। সুরমা সাহিত্য সম্মিলনীর প্রথম অধিবেশন হয় ১৯১২ সালে করিমগঞ্জে। তখন করিমগঞ্জ অবিভক্ত শ্রীহট্ট জেলার একটি মহকুমা ছিল। ঐ অধিবেশনে একটি সাময়িকপত্র প্রকাশের প্রস্তাব গৃহীত হয়। সুরমা সাহিত্য সম্মিলনীর দ্বিতীয় অধিবেশন হয় শিলচরে ১৯১৪ সালের ২৮ ও ২৯ ডিসেম্বর । এই সম্মেলনে ‘শ্রীহট্ট কাছাড় অনুসন্ধান সমিতি’ স্থাপনের সিদ্ধান্ত গৃহীত হয়। এই অধিবেশনের সূত্র ধরেই ১৩২২ বঙ্গাব্দের বৈশাখ মাসে করিমগঞ্জ থেকে প্রকাশিত হয় বরাক সুরমা উপত্যকার প্রথম সাহিত্য পত্রিকা শ্রীভূমি। এই পত্রিকা লোকসাহিত্য চর্চার সূচনা লগ্নে উল্লেখযোগ্য ভূমিকা পালন করেছিল।
তখন একটি প্রতিষ্ঠানকে কেন্দ্র এ অঞ্চলে লোকসাহিত্য সংগ্রহ ও আলোচনায় গতি সঞ্চারিত হয়েছিল। প্রতিষ্ঠানটির নাম শিলচর নর্মাল স্কুল। শিক্ষক প্রশিক্ষণ বিদ্যালয় হিসেবে ১৯০৭ সালে শিলচরে এটি প্রতিষ্ঠিত হয়। “এই স্কুলের গোড়াকার সময়েরশিক্ষকরা ছিলেন সমাজের উজ্জ্বল জ্যোতিষ্ক। দেশ, কাল ও সমাজ সচেতন এই সুশিক্ষিত ব্যক্তিরা স্কুলের কর্মধারার পাশাপাশি এ অঞ্চলের ইতিহাস, লোকায়ত ঐতিহ্য, ধর্মনৈতিক দর্শন ইত্যাদি সাংস্কৃতিক বিষয়ের আধুনিক মূল্যবোধ প্রতিষ্টায় তৎপর ছিলেন।এই কর্ম তৎপরতা এক গুরুত্বপূর্ণ সামাজিক আন্দোলনের আকার নিয়েউপত্যকার নবীন সাহিত্য সংস্কৃতির ভিঃ গড়ে দিয়েছিলÑএকথা অতিরঞ্জিত নয়।এঁরাই উদ্যোগ নিয়ে ‘শ্রীহট্ট কাছাড় অনুসন্ধান সমিতি’ গড়ে একদিকে যেমন অতীত ইতিহাসও লোকসাহিত্যের উদত্ধারে যতœবান হয়েছিলেন, তেমন তাঁদের হাতেই বাছ্ছিত সমাজ গঠনে শিক্ষার গুরুত্ব ও সমাজনীতির বাস্তব রূপায়লে মানুষ গড়ার মহান উদ্দেশ্যে ১৩৩২ বঙ্গাব্দের শ্রাবণমাসে (১৯২৫) ‘শিক্ষাসেবক পত্রিকার জন্ম হয়েছিল।”(অনুরূপা ১৯৯৭:৫৩) ‘শিক্ষাসেবক’ পত্রিকায় বরাক-সুরমা উপত্যকার লোকসাহিত্য বিষয়ক অনেক রচনা প্রকাশিত হয়েছিল। ‘শ্রীভূমি’ ও ‘শিক্ষাসেবক’ ছাড়া ‘শ্রীহট্টদর্পণ’, ‘কমলা’, ‘দাসী’, ‘বঙ্গলক্ষী’, ‘কোহিনূর’, ‘যুগবেরী’, ‘বাংলার শক্তি’, ‘শিক্ষক’, ‘শিক্ষালোক’ প্রভৃতি পত্র পত্রিকায় লোকসাহিত্য ভিষয়ক প্রবন্ধ প্রকাশিত হয়েছে।
‘বরাক-সুরমা উপত্যকায় লোকসাহিত্য সংগ্রহ ও চর্চার ক্ষেত্রে ইংরেজি শিক্ষার কার্যকর ভূমিকা লক্ষণীয়। বিশ শতকের সূচনা লগ্নেই ইংরেজি শিক্ষায় শিক্ষিত কতিপয় যুবক সংস্কৃতির শিকড়সন্ধানে ব্রতী হয়ে ফোকলোর চর্চায় এগিয়ে আসেন। এ কাজে তাঁরা ইংরেজ মিশনারিদের দ্বারা অনুপ্রাণিত ও প্রভাবিত হয়েছিলেন। ১৩৪২ বঙ্গাব্দের ১৬ কার্তিক প্রতিষ্ঠিত হয় শ্রীহট্ট সাহিত্য পরিষৎ। এই পরিষৎ বিভিন্ন প্রাচীন পুথি সংগ্রহ করার পাশাপাশি লোকসাহিত্য বিষয়ক প্রবন্ধ বিভিন্ন অধিবেশনে উপস্থাপন করে এবং ‘শ্রীহট্ট সাহিত্য পরিষৎ পত্রিকা’য় প্রকাশ করে। এই সংগঠন ভট্টকাব্য এবং প্রবাদবাক্য সংগ্রহের উদ্যোগ গ্রহণ করেছিল। ‘শ্রীহট্ট সাহিত্য পরিষৎ পত্রিকা’য় যাঁদের লোকসাহিত্য বিষয়ক প্রবন্ধ প্রকাশিত হয়েছিল তাঁরা হলেনÑ অচ্যুতচরণ চৌধুরী, পদ্মনাথ ভট্টাচার্য, কৃষ্ণবিহারী রায়চৌধুরী, শশিমোহন চক্রবর্তী, মোহাম্মদ আশরাফ হোসেন, মুহম্মদ আবদুল বারী, সৈয়দ মুর্তাজা আলী, যতীন্দ্রমোহন ভট্টাচার্য, মো. আবদুল জব্বার প্রমুখ।
মুসলমান সমাজকে বাংলা ভাষা চর্চার দিকে আকর্ষিত করার লক্ষ্যে ১৯৩২ সালের নভেম্বর-ডিসেম্বর মাসে সিলেট থেকে প্রকাশিত হয় মুহম্মদ নূরুল হক সম্পাদিত মাসিক ‘আল ইসলাহ’। ‘মুসলিম আসামের বাঙলাভাষী অজ্ঞাতনামা কবি ও সাহিত্যিকগণের রচিত সাহিত্য সংকলন, প্রাচীন পুঁথি সংগ্রহ এবং মুসলিম সাহিত্য চর্চার সুযোগ প্রদান’-এর লক্ষ্যে ১৯৩৬ সালে প্রতিষি।ঠত হয় সিলেট কেন্দ্রীয় মুসলিম সাহিত্য সংসদ। ১৯৩৯ সালে কতিপয় শর্তসাপেক্ষে মুহম্মদ নূরুল হক ‘আল ইসলাহ’কে সাহিত্য সংসদের হাতে অর্পণ করেন। এই পত্রিকায় লোকসাহিত্য বিষয়ক বহু প্রবন্ধ প্রকাশিত হয়েছে।
১৯৪০ সালে কবিগুরু রবীন্দ্রনাথ ঠাকুরের আশীর্বাদ লাভ করে শিলচর থেকে প্রকাশিত হয় মহিলাদের দ্বারা পরিচালিত জ্যোৎ¯œা চন্দ সম্পাদিত মাসিক ‘বিজয়িনী’।এইর পত্রিকায় সুপ্রভা দত্ত, সুতপা দেবী, বেলা রাণী দেবী ও সৈয়দা নজিবুন্নেছা খাতুনের লোকসাহিত্য বিষয়ক প্রবন্ধ প্রকাশিত হয়েছিল।
দুই.১
অচ্যুতচরণ চৌধুরী (১৮৬৬-১৯৫৩) তাঁর অক্ষয়কীর্তি ‘শ্রীহট্টের ইতিবৃত্ত’ দ্বিতীয় খ-ের শেষার্ধে কয়েকজন লোককবির জীবনী সংকলন করেছেন। গ্রন্থের পরিশিষ্ট অংশে বিস্মৃতপ্রায় লোককবিদের নাম ও তাঁদের গ্রন্থের নাম উল্লেখ করেছেন। ১৮৯৬ সালের এপ্রিল সংখ্যা ‘দাসী’ পত্রিকায় প্রকাশিত হয় তাঁর মূল্যবান প্রবন্ধ ‘মুসলমান বৈষ্ণব কবি’। বরাক-সুরমা উপত্যকার যে সকল মুসলমান লোককবি রাধাকৃষ্ণ বিষয়ক পদ মুখেমুখে রচনা করেছেন তাঁদের সম্পর্কে লেখক এ প্রবন্ধে আলোচনা করেছেন। পঞ্চদশ বা ষোড়শ শতাব্দীতে রচিত রাজা গৌড়গোবিন্দ বিষয়ক লোকগীতিকা ‘পাগল ঠাকুরের ছড়া’ তিনি সংগ্রহ করেছিলেন।
অচ্যুতচরণ চৌধুরী এ অঞ্চলের গ্রাম্য শব্দ সংগ্রহ করে একটি পুথি সংকলন করেন। এর নাম ‘শ্রীহট্ট জেলার গ্রাম্যশব্দ’। এখানকার গ্রাম্যশব্দ সংগ্রহে তাঁর নিষ্ঠা ও অধ্যবসায় আগামী দিনের গবেষকদের অনুপ্রাণিত করবে। এই শব্দবিন্যাস তিনি যে পদ্ধতিতেই করুন না কেন, বৈজ্ঞানিক প্রণালী অনুসৃত না হলেও সিলেটের শব্দচয়ন, বিশ্লেষণ ও সংকলনে তিনি পথিকৃৎ।
দুই.২
পদ্মনাথ ভট্টাচার্য (১৮৬৮-১৯৩৮) ১৮৯৮ সালে ঋড়ষশ ঈঁংঃড়সং ধহফ ঋড়ষশষড়ৎব ড়ভ ঝুষযবঃ উরংঃৎরপঃ রহ ওহফরধ গধহ ড়ভ ওহফরধ (ঠড়ষ.ঢ. ঘড়ং.২-৩,৪) নামে একটি গবেষণামূলক দীর্ঘ প্রবন্ধ রচনা করেন। বরাক-সুরমা উপত্যকার ফোকলোর সম্পর্কে ইংরেজিতে লেখা প্রথম প্রবন্ধ হিসেবে এর গুরুত্ব অপরিসীম। প্রবন্ধটি ১৯৩০ সালে গধহ ড়ভ ওহফরধ (ঠড়ষ.ঢ. ঘড়ং.২-৩,৪) প্রকাশিত হয়। এ ছাড়া তিনি ভট্টকবিতা সংগ্রহে তিনি অগ্রণী ভূমিকা পালন করেন। তিনি সাঁইত্রিশটি ভট্টকবিতা সংগ্রহ করেছিরেন। শ্রীহট্ট সাহিত্য পরিষৎ পত্রিকা ২য় বর্ষ ১ম সংখ্যায় তাঁর ‘ভট্ট কবিতা সংগ্রহ’ প্রবন্ধ প্রকাশিত হয়। এতে তিনি ভট্ট কবিতার উদ্ভব ও ক্রমবিকাশ সম্পর্কে সারগর্ভ আলোচনা করেন। পদ্মনাথ ভট্টাচার্য সংগৃহীত ভট্টকবিতাগুচ্ছ অধ্যাপক যতীন্দ্রমোহন ভট্টাচার্য সম্পাদিত “শ্রীহট্টের ভট্টসঙ্গীত’ (১৯৮৯) গ্রন্থে প্রকাশিত হয়েছে। ‘শ্রীহট্টের প্রবাদবাক্য’ (শ্রীভূমি, ফাল্গুন ১৩২২)এবং ‘শ্রীহট্টের প্রবাদবাক্য : অবতরণিকা’ (কমলা, অগ্রহায়ণ ১৩৩৩) প্রবন্ধদ্বয়ে পদ্মনাথ ভট্টাচার্য সিলেটে প্রচলিত প্রবাদবাক্য সম্পর্কে মূল্যবান আলোচনা করেন। ‘দৈখোরা সাধু’ কোহিনূর, পৌষ ১৩১৮) এবং ‘দৈখোরা মোনসী’ (প্রভাত, কার্তিক ১৩১৮) প্রবন্ধদ্বয়ে তিনি মুনসী মনিবউদ্দিন ওরফে দৈখোরা মুনসীর মরমি গান সম্পর্কে আলোচনা করেন।
দুই.৩
বরাক-সুরমা উপত্যকায় লোকসাহিত্য বিষয়ক প্রথম মুদ্রিত গ্রন্থ প্রেমদাময়ী আদিত্যের ‘রমণী সঙ্গীত’ ও ‘ব্রতকথা (মাঘব্রত)’। দুটি গ্রন্থই ১৯১৪ সালে করিমগঞ্জ থেকে প্রকাশিত হয়েছিল। ‘রমণী সঙ্গীত’-এ আছে চল্লিশটি বিয়ের গীত। ‘ব্রতকথা (মাঘব্রত)’ পুস্তিকাটিতে “এ অঞ্চলে প্রচলিত মাঘব্রতের ছড়াগুলো সংকলিত হয়েছে। সংগ্রহের পদ্ধতি প্রকরণ সঠিক না হলেও প্রেমদাময়ীর উদ্দেশ্যটি অত্যন্ত স্পষ্ট। কোমলমতি বালিকাদিগকে দেশের সংক্ষিপ্ত ইতিবৃত্ত শিক্ষা দেওয়া এবং তাদের কোমলপ্রাণে কিয়ঃ পরিমাণ উচ্চাভিলঅষ জাগিয়ে তোলাই ছিল সংকলনটির উদ্দেশ্য।” (অমলেন্দু ২০০০:৫)
দুই. ৩
‘শ্রীভূমি’ পত্রিকায় ২য় বর্ষ ৪র্থ সংখ্যায় (শ্রাবণ ১৩২৩ বঙ্গাব্দ) রেবতীমোহন আদিত্য সংগৃহীত অজ্ঞাতনামা কবির একটি লোকসঙ্গীত প্রকাশিত হয়। গানটি মিস্টিক, এর ভাষা চর্যাপদের মত। রূপক ভেদ করে গূঢ় অর্থ অনুধাবন করা প্রায় অসম্ভব।
দুই.৪
প্রফুল্লকুমার দে চৌধুরী সংগৃহীত লোককবির একটি গান (ভণিতায় নাম স্বরূপ) ‘শ্রীভূমি’ ২য় বর্ষ ৮ম সংখ্যায় (অগ্রহায়ণ ১৩২৩) প্রকাশিত হয়েছিল ‘কুড়ান ফুল’ নামে।
দুই.৪
প্রভাতচন্দ্র দেবশর্মা রচিত ‘প্রবচনে কবিপ্রতিভা’ প্রবন্ধ ‘শ্রীভূমি’ ১ম বর্ষ ৫ম সংখ্যায় (ভাদ্র ১৩২২) প্রকাশিত হয়েছিল।
দুই.৫
¤্রীহট্ট সাহিত্য পরিষৎ পত্রিকা ২য় বর্ষ ২য় সংখ্যায় (শ্রাবণ ১৩৪৪) প্রকাশিত হয়েছিল কৃষ্ণবিহারী রায়চৌধুরীর (১৮৭২-১৯৫০) প্রবন্ধ ‘শ্রীহট্টের মাঘব্রত’। এই প্রবন্ধে তিনি সিলেটের গ্রাম্য হিন্দু সমাজে কুমারীদের মধ্যে প্রচলিত লৌকিক উৎসব মাঘব্রত সম্পর্কে সারগর্ভ আলোচনা করেছেন।
দুই.৬
শিলচর নর্মাল স্কুলে শিক্ষকতা করার সময় জগন্নাথ দেব (১৮৭৮-১৯২৭) সিলেট ও কাছাড়ের বহুস্থান ঘুরে প্রাচীন হস্তলিখিত পুথি সংগ্রহ করেন। তাঁর পবন্ধ ‘শ্রীহট্ট কাছাড়ের প্রাচীন পুথির বিবরণ’ বঙ্গীয় সাহিত্য পত্রিকায় (শারদীয়া সংখ্যা ১৩১৯) প্রকাশিত হয়। ‘শিক্ষাসেবক’ পত্রিকায় জগন্নাথ দেবের ‘সেকালের লোকশিক্ষা’ ধারাবাহিকভাবে (কার্তিক ১৩৩২ ও মাঘ ১৩৩২) প্রকাশিত হয়।লোকশিক্ষার বিভিন্ন উপাদান সম্পর্কে তিনি মূল্যবান আলোচনা করেছেন।
দুই.৭
শিলচর নর্মাল স্কুলের শিক্ষক তারিণীচরণ দাস (১৮৮০-?)এর ‘শ্রীহট্টের প্রচলিত প্রবচন’ ‘শিক্ষাসেবক’ পত্রিকায় বৈশাখ ১৩৩৪Ñমাঘ ১৩৪১) ধারাবাহিকভাবে প্রকাশিত হয়।“একই বক্তব্য সমন্বিত ভিন্নভিন্ন দেশে যে ভিন্নভিন্ন প্রবাদ প্রচলিত আছে লেখক তার দৃষ্টান্ত দিয়েছেন।” (বরুণ ১৯৮৬:৫২৩) একই পত্রিকায় তারিণীচরণ দাসের ‘শ্রীহট্টে প্রচলিত শব্দদ্বৈত’ (শ্রাবণ ১৩৩৫Ñকার্তিক ১৩৩৫) এবং ‘শ্রীহট্টে প্রচলিত গ্রাম্যশব্দ’ বৈশাখ ১৩৪২Ñমাঘ ১৩৪৭) প্রবন্ধদ্বয় প্রকাশিত হয়। প্রবন্ধদ্বয়ে লেখক সিরেটে প্রচলিত দ্বিরুক্ত শব্দ ও গ্রাম্যশব্দ সম্পর্কে াালোচনা করেছেন এবং শব্দ সংকলন করেছেন।
দুই.৮
ব্রতচারী আন্দোলনের প্রতিষ্ঠাতা গুরুসদয় দত্ত (১৮৮২-১৯৪১) সিলেটের বিভিন্ন অঞ্চল থেকে চার শতাধিক লোকগীতি সংগ্রহ করেছিলেন। তাঁর ‘ব্রতচারীসখা’(১৯৩৪) গ্রন্থে কয়েকটি লোকগীতি স্থান পেয়েছে। তাঁর ‘পটুয়া সঙ্গীত’ (কলিকাতা বিশ্ববিদ্যালয় ১৯৩৯) গ্রন্থে ২৯টি পটুয়া সঙ্গীত সংকলিত হয়েছে। গ্রন্থের “প্রথমাংশে সংযোজিত বিস্তৃত ‘পরিচায়িকা’ অংশটি পাঠককে এই প্রাচীন সঙ্গীত ও শিল্পকলার নানা দিক সম্পর্কে একটা ধারণা গঠনে সহায়তা করে স্বীকার করতে হয়।” (সৈকত ১৯৯৪:৭৮) ১৯৩৯ সালের সেপ্টেম্বর গুরুসদয় দত্ত সিলেট থেকে সংগৃহীত ৪২৩টি লোকসঙ্গীত কলিকাতা বিশ্ববিদ্যালয়ের রেজিস্ট্রারের কাছে জমা দেন। তাঁর মৃত্যুর পঁচিশ বৎসর পর ১৯৬৬ সালে ড. নির্মলেন্দু ভৌমিকের যৌথ সম্পাদনায় এটি ‘শ্রীহট্টের লোকসঙ্গীত’ নামে গ্রন্থাকারে প্রকাশিত হয়। এছাড়া ‘বাংলার শক্তি’ পত্রিকায় ফোকলোর বিষয়ক তাঁর বেশ কিছু প্রবন্ধ প্রকাশিত হয়েছিল।
দুই.৯
মুরারিচাঁদ কলেজের ইংরেজির অধ্যাপক এবং শ্রীহট্ট সাহিত্য পরিষৎ-এর সম্পাদক শশিমোহন চক্রবর্তী (১৮৯০-১৯৭৪) সিলেটের প্রবাদবাক্য সংগ্রহ করেছিলেন। শ্রীহট্ট সাহিত্য পরিষৎ পত্রিকায় প্রবাদবাক্য সম্পর্কে তাঁর আলোচনা প্রকাশিত হয়েছিল। তাঁর সংকলিত প্রবাদ প্রবচনকে তিনি ব্যাখ্যা বিশ্লেষণ করেছেন এবং অনেক ক্ষেত্রে সমার্থক ইংরেজি প্রবাদ পাশাপাশি সংযোজন করে তুলনামূলক আলোচনা করেছেন। ফলে সংকলনটি কেবল সংগ্রহকর্ম হিসেবে নয়, বিশ্লেষণ কর্ম হিসেবেও সমাদৃত হয়েছে। প্রবাদ প্রবচনের সংজ্ঞা ও স্বরূপ সম্পর্কে ভূমিকায় তিনি বিস্তারিত আলোচনা করেছেন। ‘শ্রীহট্টীয় প্রবাদ প্রবচন’ সংকলনের পঁচিশ বৎসর পর ১৯৭০ সালে কলকাতা থেকে প্রকাশিত হয়েছে।
দুই.১০
শেখ মুহম্মদ সিকন্দর আলী (১৮৯১-১৯৬৪)-এর ‘সিলটিয়া মাঘের ডাক’ প্রবন্ধটি ‘আল ইসলাহ’ ষষ্ঠ বর্ষ ১ম সংখ্যায় (ভাদ্র ১৩৪৭) প্রকাশিত হয়েছিল। ডাক এক ধরণের লোকগীতি। প্রবন্ধে বলা হয়েছে, “ এই ডাক মাঘ মাসে রাত্রি দ্বিপ্রহরের পর দলবদ্ধ হইয়া আবৃত্তি করার নিয়ম।” আলোচ্য প্রবন্ধে লেখকগাছের ডাক সম্পর্কেও আলোচনা করেছেন।নদী থেকে বড়বড় গাছ টেনে উপরে তোলার সময় যে ডাক সুর করে শ্রমিকরা গেয়ে থাকে তাকে গাছের ডাক বলে। গাছের ডাকের গানগুলো অর্থবোধক নয়, শ্রুতিমধুর মাত্র।
দুই.১১
মোহাম্মদ আশরাফ হোসেন সাহিত্যরতœ (১৮৯২-১৯৬৫) ১৯২১ সালে গুরু ট্রেনিং গ্রহণের জন্য শিলচর নর্মাল স্কুলে ভর্তি হন সেখানে জগন্নাথ দেব, তারিণীচরণ দাস প্রমুখ কৃতবিদ্য এবং লোকসাহিত্য সংগ্রহ ও চর্চায় আগ্রহী শিক্ষকদের সংস্পর্শে এসে তিনি লোকসাহিত্য সংগ্রহ, আলোচনা ও প্রকাশনায় ব্রতী হন। ব্যক্তিগত ভাবে গ্রামে ঘুরেঘুরে তিনি সংগ্রহ করেন বারমাসী, গীতিকা, পালাগান,মারফতি গান, বাউল গান ও নাগরী পুথি। কোন পৃষ্ঠপোষকতা ছাড়া ব্যক্তিগত উদ্যোগে তিনি লোকসাহিত্য সংগ্রহে যে শ্রমদান করেছেন তা আগামী দিনের লোকসাহিত্য চর্চায় শ্রদ্ধার সঙ্গে স্মরণীয় হবে।
মোহাম্মদ আশরাফ হোসেন ২২টি বারমাসী সংগ্রহ করেছিলেন। তন্মধ্যে নয়টি বারমাসী (শুয়ার বারমাসী, মনের বারমাসী, শরার বারমাসী, কলির বারমাসী, জালুয়ার বারমাসী, নিমাইচান্দর বারমাসী, সীতার বারমাসী, কালার বারমাসী ও জুলেখার বারমাসী) সম্পর্কে তিনি আল ইসলাহ পত্রিকায় আলোচনা করেন ১৩৪২ বঙ্গাব্দের শ্রাবণ থেকে ১৩৪৬ বঙ্গাব্দের শ্রাবণ মাসের মধ্যে। অধিকাংশ বারমাসী তিনি পুস্তিকাকারে প্রকাশ করেছিলেন। তিনি তেরটি গীতিকা সংগ্রহ করেছিলেন। কয়েকটি গীতিকা পুস্তকাকারে প্রকাশিত হয়েছিল। “কিন্তু তিনি প্রায় প্রতিক্ষেত্রেই াাদি রচয়িতা বা গায়কের ভাষা পরিবর্তন করে গীতোক্ত কাহিনী রচনা করেছিলেন নিজের ভাষায় । ফলে তাঁর এই সংগ্রহ অনেকখানি মূল্যহীন হয়ে পড়েছে।” (সুধীর ১৩৭৮:৪২)
মোহাম্মদ আশরাফ হোসেন শাহ হাজির আলীর ও রাধারমণ দত্তের গানের সংকলন যথাক্রমে ‘হাজির তরান’ ও ‘রাধারমণ সঙ্গীত প্রকাশ করেন। তাঁর সংকলিত ও প্রকাশিত অন্যান্য মরমি গীতি সংকলন হচ্ছেÑ‘রাগবাউল ১ম ভাগ’ (১৯৩০), ‘রাগ মারিফত ১ম ভাগ’ (১৯৩০), ‘ঘাটু সঙ্গীত’, ‘বন্যার কবিতা ও দুর্ভিক্ষ সঙ্গীত’ এবং ‘কিষাণ সঙ্গীত’ (চৌধুরী গোলাম আকবর সহযোগে)।
লোকসাহিত্য বিষয়ে মোহাম্মদ আশরাফ হোসেন রচিত প্রবন্ধগুলো হচ্ছেÑ‘পল্লী সাহিত্যে বাউল গানের স্থান’ (আল ইসলাহ, বৈশাখ ১৩৪৪), ‘সাধককবি হাছন রাজা’ (আল ইসলাহ, আষাঢ় ১৩৪৫), ‘আমাদের পল্লীকবিগণ’ (আল ইসলাহ, শ্রাবণ ১৩৪৫), সাধককবি নিয়ামত আলী (আল ইসলাহ, পৌষ ১৩৪৫), ‘সাধক কবি ভবানন্দ’ (শ্রীহট্ট সাহিত্য পরিষৎ পত্রিকা, শ্রাবণ ও কার্তিক ১৩৪৫), ‘সাধক কবি ইয়াছিন’ (আল ইসলাহ, আশ্বিন ১৩৪৭), ‘হাজিরাত গান’ (আল ইসলাহ, কার্তিক ১৩৪৭), ‘আমাদের পল্লী সাহিত্য’ (আল ইসলাহ, আষাঢ় ১৩৪৯), ‘সাধক কবি শেখচান্দ’ (আল ইসলাহ, অগ্রহায়ণ ১৩৫৩), ‘সাধক কবি সৈয়দ জহুরুল হক’ (আল ইসলাহ, অগ্রহায়ণ ১৩৫৩), ‘সাধক কবি মৌলভী ইয়াছিন’ (আল ইসলাহ, আষাঢ় ১৩৫৬), ‘ভট্টকাব্যে সিলেটের মুসলমান’ (শ্রীহট্ট সাহিত্য পরিষৎ পত্রিকা, কার্তিক ১৩৪৬ থেকে বৈশাখ ১৩৪৯) ইত্যাদি।
দুই.১২
আবদুল আজিজ মাস্টার (১৮৯৩-১৯৬০)-এর মরমি সঙ্গীতের সংকলন ‘রাগ বাউলা দিল দেওয়ানা’, ‘রাগ বাউলা এস্কে মওলা’ এবং ‘রাগ বাউলা ভবতরান’ বিশ শতকের ত্রিশের দশকে প্রকাশিত হয়েছিল।
দুই.১৩
ক্ষীরোদচন্দ্র দেব (১৮৯৩-১৯৩৭)-এর প্রবন্ধ ‘শ্রীহট্টে সাহিত্যের উপকরণ’ ‘শিক্ষাসেবক’ পত্রিকায় (১০ম বর্ষ ৪র্থ সংখ্যা, বৈশাখ ১৩৪২)প্রকাশিত হয়। এই প্রবন্ধে তিনি সিলেটের লোকসাহিত্যের নানা শাখা কীভাবে আমাদের সাহিত্যকে সমৃদ্ধ করেছে তা আলোচনা করেন।
দুই.১৪
শিলচর থেকে প্রকাশিত জ্যোৎ¯œা চন্দ সম্পাদিত মাসিক ‘বিজয়িনী’ প্রথম বর্ষ চতুর্থ সংখ্যায় (পৌষ ১৩৪৭) সুতপা দেবীর প্রবন্ধ ‘পৌষপার্বণ’প্রকাশিত হয়েছিল।
দুই. ১৫
মাসিক ‘বিজয়িনী’ প্রথম বর্ষ ৮ম সংখ্যায় (বৈশাখ ১৩৪৮) প্রকাশিত হয়েছিল বেলারাণী দেবীর প্রবন্ধ ‘বর্ষ শেষ ও বর্ষারম্ভ’।
দুই. ১৬
সৈয়দা নজিবুন্নেছা খাতুন সংগৃহীত ‘নারীর বারমাসী’ মাসিক ‘বিজয়িনী’ প্রথম বর্ষ নবম সংখ্যায় (জ্যৈষ্ঠ ১৩৪৮) প্রকাশিত হয়েছিল।
দুই. ১৭
মাসিক ‘বিজয়িনী’ পত্রিকায় শৈলজাসুন্দরী দত্তের লোকসাহিত্য বিষয়ক দুটি প্রবন্ধ প্রকাশিত হয়েছিল। প্রবন্ধদ্বয় হচ্ছেÑ‘ববাহের গ্রাম্যনীতি’ (প্রথম বর্ষ দশম সংখ্যা, আষাঢ় ১৩৪৮) এবং ‘শ্রাবণ ও ভাদ্র সংক্রান্তির উৎসব’ (প্রথম বর্ষ একাদশ সংখ্যা, শ্রাবণ ১৩৪৮)।
দুই. ১৮
ব্রজেন্দ্রনাথ অর্জুন (১৮৯৯-১৯৯০)গ্রাম্য প্রবাদ প্রবচন সংগ্রহ করেছিলেন। তাঁর সংকলিত ‘শ্রীহট্ট জেলার গ্রাম্য প্রবচন ও ছড়া’ গ্রন্থাকারে প্রকাশিত হয় নি।
দুই.১৯
রাজমোহন নাথ (১৯০০-১৯৬৫) সংগৃহীত ও সম্পাদিত সিলেটের লোকগীতিকা ‘সোনাধনের গীত’ ১৯৪৭ সালে শ্রীহট্ট সাহিত্য পরিষদ থেকে প্রকাশিত হয়। শ্রীহট্ট সাহিত্য পরিষৎ পত্রিকায় রাজমোহন নাথের ‘শান্তির বারমাসী’ (শ্রাবণ ১৩৪৪) এবং ‘নিমাইর বারমাসী’ (শ্রাবণ ১৩৪৫) প্রকাশিত হয়। তিনি তাঁর সংগৃহীত বারমাসী দুটি বিচার বিশ্লেষণ সহ প্রকাশ করেন। ফোকলোর চিন্তায় তিনি ছিলেন বিজ্ঞানমনস্ক এবং তুলনামূলক আলোচনায় আগ্রহী।
দুই.২০
মুরারিচাঁদ কলেজের অধ্যাপক কুঞ্জলাল দত্ত (১৯০০-?) ছাত্র জীবনে মুরারিচাঁদ কলেজ বার্ষিকীতে (১৯২১-২২)‘শ্রীহট্টে প্রচলিত প্রবচন’ নামে একটি মূল্যবান প্রবন্ধ প্রকাশ করেছিলেন।
দুই.২১
সিলেট অঞ্চলের বিশিষ্ট লোকগীতি গোবিন্দভোগের গান। কিন্তু এই গান খুব কমই সংগৃহীত হয়েছে। শ্রীহট্ট সাহিত্য পরিষঃ পত্রিকায় (শ্যাবণ ১৩৫৩) কালীচরণ দাস সংগৃহীত ‘গোবিন্দ ভোগের গান’ প্রকাশিত হয়েছিল।
দুই.২২
স্বামী ভূমানন্দের ‘মুসলমান বৈষ্ণব’ (শ্রীহট্ট সাহিত্য পরিষৎ পত্রিকা, কার্তিক ১৩৫০) প্রবন্ধে পদকর্তা দরিয়া সাহেব, জগজ্জীবন সাহেব, করিম বক্শ, আদিল শাহ, নফীস খলীলী, দীন দরবেশ, নিজামুদ্দীন আউলিয়া, কবীর প্রমুখ চল্লিশ জন মুসলমান কবির পদাবলী সম্বন্ধে সারগর্ভ আলোচনা করেছেন।
দুই.২৩
মুহাম্মদ আবদুল বারী (১৯০১-১৯৬৯) সিলেট ও কাছাড়ের লোকসাহিত্য সংগ্রহে নিবেদিতপ্রাণ ছিলেন। তাঁর সাহিত্যজীবনের প্রধান কীর্তি সিলেট ও কাছাড় অঞ্চলের লোকসাহিত্য ও সংস্কৃতির লুপ্তপ্রায় ানেক অজানা সম্পদ পুনরুদ্ধার। এগুলোর মধ্যে উল্লেখযোগ্য শিতালং শাহ, দীন ভবানন্দ, ইরফান শাহ, রাধারমণ দত্ত প্রমুখের গান সংগ্রহ।
শিলচর নর্মাল স্কুলের তত্ত্বাবধায়ক অঘোরনাথ অধিকারীর ানুপ্রেরণায় মুহম্মদ আবদুল বারী সুরমা উপত্যকার “বিশেষভাবে বরাক উপত্যকার লোকায়ত জীবনের বহতা ঐতিহ্যের ানুসন্ধানে ব্রতী ছিলেন।বরাক উপত্যকার লোকসাহিত্যের নানা ধারার প্রথম ও প্রধান সংগ্রাহক ও প্রচারক রূপে আজ তিনি স্বীকৃতিধন্য। গ্রামেগঞ্জে বিস্তীর্ণ জনজীবনে প্রবাহিত লোকসঙ্গীত চয়ন করে ‘শিক্ষাসেবক’ পত্রিকায়” (অনুরূপা ১৯৯৭:৫৪) বৈশাখ ১৩৩৫ সংখ্যায় তিনি ‘শ্রীহট্ট কাছাড়ের মোশ্লেম পল্লীসাহিত্য’ নামে একটি প্রবন্ধ প্রকাশ করেন। “প্রবন্ধটিতে লেখক শীতালং শাহ, বেলওয়া শাহ প্রভৃতিদের কয়েকটি গানের উল্লেখ করে হিন্দু মুসলমানের ভাবের আদানপ্রদানের যে পরিচয় দিয়েছেন, তা উল্লেখযোগ্য। তাছাড়া ফকির শীতালং শাহ, ফকির বেলওয়া শাহ, মুন্সী ইরফান আলী উত্যাদিদের বিরচিত একাধিক আধ্যাত্মিক সঙ্গীতের পরিচয় দানও আলোচ্য প্রবন্ধটির গুরুত্ভকে বৃদ্ধি করেছে।” (বরুণ ১৯৮৬:৫২৯) শিক্ষাসেবক পত্রিকায় মুহাম্মদ আবদুল বারীর ধারাবাহিক প্রবন্ধ ‘বিজনকুসুম’ (কার্তিক ১৩৩৫ থেকে বৈশাখ ১৩৩৭)-এ বিভিন্ন লোককবির গান সংকলিত ও আলোচিত হয়েছে। ‘শিক্ষাসেবক’ পত্রিকায় প্রকাশিত তাঁর আর একটি প্রবন্ধ ‘শ্রীহট্টের প্রচলিত শব্দ’ (বৈশাখ ১৩৪৩)
মৌলভীবাজার সরকারি উচ্চ বিদ্যালয়ে শিক্ষকতা করা কালে (১৯২৯) মুহাম্মদ আবদুল বারী সংগ্রহ করেন ‘দেওয়ান কটু মিয়ার গান’, ‘বেলওয়া সুন্দরী’, ‘কোকিলাকন্যার বারমাসী’, ‘যাদুয়ার বারমাসী’, ‘শান্তির বারমাসী’, ‘শরার বারমাসী’, ‘আলাল দুলারের উপাখ্যান’, ‘শ্যামরূপ’, ‘শীতবসন্ত’ প্রভৃতি লোকগাঁথা।
মাসিক ‘আল ইসলাহ’ পত্রিকায় প্রকাশিত মুহম্মদ আবদুল বারীর উল্লেখযোগ্য প্রবন্ধ হচ্ছেÑ‘শ্রীহট্ট কাছাড়ের পল্লীসাহিত্য’ (বৈশাখ ১৩৪৬), ‘প্রবাদবাক্য’ (ভাদ্র ১৩৪৪), ‘শ্রীহট্ট কাছাড়ে প্রচলিত প্রবাদবাক্য’ (বৈশাখ ১৩৪৫ ও ভাদ্র ১৩৪৫), ‘শ্রীহট্ট কাছাড়ের প্রবাদবাক্য (বৈশাখ ১৩৪৯), ‘শ্রীহট্ট কাছাড়ে প্রচলিত প্রবাদবাক্য’ (আষাঢ় ১৩৫১)। ‘শ্রীহট্ট সাহিত্য পরিষৎ পত্রিকা’য় প্রকাশিত হয়েছিল মুহম্মদ আবদুল বারীর প্রবন্ধ ‘পল্লীকবি ইরফান আলী’ (মাঘ ১৩৪৩)
সম্প্রতি (২০১৬) মহবুবুল বারীর সম্পাদনায় মুহম্মদ আবদুল বারীর লোকসাহিত্য বিষয়ক নির্বাচিত প্রবন্ধের সংকলন ‘বিজনকুসুম’ শিলচর থেকে প্রকাশিত হয়েছে।
দুই.২৪
সৈয়দ মুর্তাজা আলী (১৯০১-১৯৮১) শ্রীহট্ট সাহিত্য পরিষৎ পত্রিকায় ‘গোপীচন্দ্রের গান’ (কার্তিক ১৩৪৮)ও ‘ময়মনসিংহ গীতিকা’ (শ্রাবণ ১৩৪৯)প্রবন্ধদ্বয়ে গোপীচন্দ্রের গান ও ময়মনসিংহ গীতিকায় ব্যবহৃত সিলেটী শব্দ নিয়ে বিচার বিশ্লেষণ করেছেন। গ্রন্থদ্বয়ের সম্পাদকগণ সিলেটি শব্দের প্রয়োগ নিয়ে যে ভুল ব্যাখ্যা দিয়েছেন তার প্রতিবাদেই প্রবন্ধ দুটি রচিত।
দুই.২৫
সিলেট গভর্নমেন্ট হাই স্কুল ম্যাগাজিন (১৯৪২)-এ প্রকাশিত হয় হরিধন কাব্যতীর্থের ‘শ্রীহট্টের মেয়েলী সঙ্গীত’। এই প্রবন্ধে লেখক সিলেটের মেয়েলী সঙ্গীতের বৈশিষ্ট্য ও তার অবদান সম্পর্কে আলোচনা করে কয়েকটি মেয়েলী সঙ্গীত সংকলন করেছেন।
দুই.২৬
শিলচর থেকে প্রকাশিত ‘বিজয়িনী’ পত্রিকায় সুপ্রভা দত্তের (১৯০৫-?) দুটি প্রবন্ধ প্রকাশিত হয়েছিল। প্রবন্ধদ্বয় হলÑ‘মাঘব্রত’ (মাঘ ১৩৪৭ ও ফাল্গুন ১৩৪৭) এবং ‘গ্রাম্য প্রবচন বা মেয়েলি ছড়া’ (চৈত্র ১৩৪৭)
দুই. ২৭
অধ্যাপক যতীন্দ্রমোহন ভট্টাচার্য (১৯০৫-১৯৯০) সংকলিত ‘শ্রীহট্ট সাহিত্য পরিষৎ গ্রন্থাগারে রক্ষিত বাঙ্গালা পুঁথির তালিকা’ (প্রথম খ-, ১৩৫২) গ্রন্থে লোকতত্ত্ব ও লোকসঙ্গীত বিষয়ক পুঁথির পরিচিতি আছে। তাঁর সম্পাদিত ‘গোপাল ঠাকুরের পদাবলী’ (১৯৪৫) গ্রন্থে গোপাল ঠাকুরের পদ সম্পর্কে সারগর্ভ াালোচনা সন্নিবেশিত হয়েছে। ‘বাঙ্গালার বৈষ্ণব ভাবাপন্ন মুসলমান কবি’ শীর্ষক সন্দর্ভের জন্য তিনি ১৯৪৫ সালে কলিকাতা বিশ্ববিদ্যালয়ের ‘খুজাস্তা আখতার বানু সোহরাওয়ার্দী সুবর্ণপদক’ লাভ করেন। সন্দর্ভটি ১৯৪৯ সালে গ্রন্থাকারে প্রকাশিত হয়। ১৯৪১ সালে মুরারিচাঁদ কলেজে অধ্যাপনা কালে তিনি রাধারমণ দত্তের গান সংগ্রহ করেছিলেন।
দুই.২৮
আল ইসলাহ ৫ম বর্ষ ৮ম সংখ্যায় (জ্যৈষ্ঠ ১৩৪৬) প্রকাশিত হয় মনির উদ্দিন আহমদের প্রবন্ধ ‘বাউলের জীবনধারা’।
দুই.২৯
আবদুল গফফার দত্তচৌধুরী (১৯১১-১৯৬৬) “১৯৩৩ সালে গুরুসদয় দত্তের আহ্বানে সিরেটের লোকসঙ্গীত সংগ্রহে াাত্মনিয়োগ করেন। তিনি সিলেট, করিমগঞ্জ, মৌলভীবাজার ও সুনামগঞ্জের প্রত্যন্ত অঞ্চল থেকে লোকগীতি সংগ্রহ করতে শুরু করেন। তিনি শীতালং শাহ, আরকুম শাহ, ফকির ভেলা শাহ, গোলোকচান্দ, শেখ ভানু, রাধারমণ, হাসন রাজা, দীন ভবানন্দ, জ্ঞানচান্দ, দয়ালদাস বৈরাগী, কাঙ্গাল রতনদাস সহ শতাধিক বাউল কবির প্রায় চারশ গান সংগ্রহ করেন। (আজিজ ১৯৯৬:১৩৬)
‘বাংলার শক্তি’ পত্রিকায় আবদুল গাফফার চৌধুরী ‘গ্রামের গান’ (আশ্বিন ১৩৪৬ ও জ্যৈষ্ঠ-আষাঢ় ১৩৪৭) প্রবন্ধে গ্রাম্য লোকসঙ্গীতের রূপ ও রস বিশ্লেষণ করেছেন।
দুই.৩০
মৌলভীবাজার থেকে প্রকাশিত ‘আবাহনী’ (শারদীয়া সংখ্যা ১৩৫৩)-তে প্রকাশিত হয় মথুরানাথ চৌধুরীর প্রবন্ধ ‘বাউল ভাটিয়ালী’। এই প্রবন্ধে তিনি বাউল ও ভাটিয়ালী গানের রূপ ও রস সম্পর্কে আলোচনা করেন। তিনি প্রাচীন পল্লীগীতি ও বারমাসী সংগ্রহ করেছিলেন। (রেবা ১৯৮৪:২৯৮)
তিন.
ব্রিটিশ আমলে বরাক-সুরমা উপত্যকা থেকে প্রকাশিত পত্র-পত্যিকা অধুনা দুষ্প্রাপ্য। যে সকল পত্রিকা দেখার সুযোগ আমার হয়েছে তার উপর ভিত্তি করেই সেকালের লোকসাহিত্য চর্চার একটি প্রাথমিক রূপরেখা রচনা করা গেল। যাঁদের কথা এখানে আলোচিত হয়েছে তাঁদের অনেক রচনা হয়তো বাইরে রয়ে গেছে। এছাড়া একটি বা দুটি প্রবন্ধ লিখেছেন এমন কিছু লেখক আমার অগোচরে রয়ে গেছেন।
সেকালে ব্যক্তিগত উদ্যোগে যাঁরা লোকসাহিত্য সংগ্রহ ও চর্চায় ব্রতী হয়েছিলেন তাঁদের এ ব্যাপারে কোন প্রশিক্ষণ ছিল না, বিজ্ঞানসম্মত আধুনিক রীতিনীতির সঙ্গেও তাঁদের পরিচয় ছিল না। তবু তাঁরা লোকসাহিত্য চর্চার যে ক্ষেত্র তৈরি করেছেন তার উপর ভিত্তি করেই আগামী দিনের গষেকগণ এগিয়ে যাবেন।
সহায়ক তথ্যপঞ্জি
গ্রন্থ :
নন্দলাল শর্মা, ২০১৩ খ্রি. রচনা সমগ্র, প্রথম খ-।কালিকলম প্রকাশনা, ঢাকা
মো. আবদুল আজিজ (স), ১৯৯৬ খ্রি. কবি আবদুল গফফার চৌধুরী স্মারকগ্রন্থ, সিলেট।
সুধীর সেন, ১৩৭৮ ব. বাংলা সাহিত্যে আসামের বাঙ্গালীদের অবদান। গৌহাটি
সৈকত আসগর, ১৯৯৪খ্রি. গুরুসদয় দত্ত। বাংলা একাডেমি, ঢাকা
প্রবন্ধ :
অনুরূপা বিশ্বাস, ১৯৯৭ খ্রি বরাকের সাহিত্য : সূচনা থেকে প্রাক স্বাধীনতা। স্মরণিকা, বরাক উপত্যকা বঙ্গসাহিত্য ও সংস্কৃতি সম্মেলন, শিলচর; ১৯৯৭
অমলেন্দু ভট্টাচার্য, ২০০০ খ্রি. বরাক-সুরমা উপত্যকার লোকসাহিত্য চর্চা পথিকৃৎদের উদ্দেশ্যে শ্রদ্ধাঞ্জলি। অর্ধ সাপ্তাহিক সাময়িক প্রসঙ্গ, শিলচর; ১ সেপ্টেম্বর ২০০০
পদ্মনাথ ভট্টাচার্য, ১৩৩৬ ব. আমার দেখা মানুষ মি, এ. পোর্টিয়স সি. আই. ই। শিক্ষাসেবক, শিলচর; বৈশাখ
মহবুবুল বারী, ২০১৬
রেবা রাণী সেন, ১৯৮৪ খ্রি. সিলেটের নারী শিক্ষা ও কতিপয় কৃতী মহিলা। সিলেট কথা, কৃষ্ণকুমার পালচৌধুরী সম্পাদিত ,সিলেট