বরের পিসি কনের মাসী দালালদের উৎখাত করুন

আইনগত প্রতিবন্ধকতা না থাকলে পাসপোর্ট লাভ যেকোন নাগরিকের অধিকার। বৈশ্বিক বিচরণের এই সময়ে মানুষ ঘরে বসে থাকতে পারে না। জীবন-জীবিকার প্রয়োজনে ব্যক্তি মানুষকে এখন ‘থাকবো নাকো বদ্ধ ঘরে/দেখবো এবার জগৎটাকে’ এর মত হতে হয়। শিক্ষা গ্রহণের জন্য, জীবিকার অন্বেষণে, চিকিৎসার প্রয়োজনে, বেড়াতে, আত্মীয়-স্বজনের সাথে মিলতে, আত্মিক-সাংস্কৃতিক মেলবন্ধনের টানে; এখন দেশ ছাড়তে হয় বহু জনকে। বাঙালির বিদেশ যাত্রার ইতিহাস খুব বেশি পুরানো না হলেও ইতোমধ্যে এই ইতিহাস প্রায় তিন শ’ বছর অতিক্রম করতে চলেছে। এই সময়ে সারা বিশ্বে ছড়িয়ে পড়েছে বাঙালি। ব্রিটেন, আমেরিকা বা কানাডার মতো উন্নত রাষ্ট্রে বাঙালিরা ইতোমধ্যে নিজেদের পরিচয়পর্বের বিস্তৃতি ঘটাতে সক্ষম হয়েছেন। এই বিশ্বপরিক্রমায় ব্যক্তির সাথে নানা দেশে নানা জাতিতে বাঙালি সংস্কৃতির প্রভাব পড়েছে। এই যে বিশ্বময় বাঙালির পদচারণা, এই যে পরিশ্রমি বাঙালিরা বিদেশ-বিভুঁইয়ে হাড়ভাঙা পরিশ্রম করে দেশের জন্য আহরণ করছেন বৈদেশিক মুদ্রা, যার বদৌলতে বাংলাদেশ গরিবানার কলঙ্কচিহ্ন মোচন করতে সক্ষম হয়েছে, সেখানে আমাদের রাষ্ট্রীয় আনুকূল্য ও সহযোগিতা কতটুকু সেই প্রশ্ন সামনে আসা খুব বেশি অসংগত নয়। আর এই প্রশ্নের উত্তরে স্বাভাবিকভাবেই বিভিন্ন সরকারি দপ্তরের আচরণের দৃষ্টিকটু বিষয়টিই সামনে চলে আসবে। এর একটি হলো পাসপোর্ট লাভে দীর্ঘসূত্রিতা ও বিড়ম্বনা।
হাতে লেখা পাসপোর্টের যুগ পেরিয়েছে সেই কবে। এখন মেশিন রিডেবল পাসপোর্ট। এই যুগটিও গত হতে চলেছে। আসছে ডিজিটাল বা ই-পাসপোর্ট। পাসপোর্ট বইটির এই রূপান্তরজনিত অগ্রগতির সাথে যদি পাসপোর্টগ্রহীতার সাথে পাসপোর্ট অফিসের আচরণটিকে তুলনা করা হয় তাহলে হুছট খেতে হয়। এখনও দেশের পাসপোর্ট অফিসগুলোতে বিদেশগামী মানুষকে মক্কেল ভাবার বাইরে আর কিছু ভাবার বাস্তবতা তৈরি হয়নি। ফলে বিদেশযাত্রীদের একটি পাসপোর্ট পেতে পদে পদে বিড়ম্বনা সইতে হয়, খরচ করতে হয় নির্ধারিত ফির চাইতে অনেক বেশি টাকা, অপচয় হয় অহেতুক একটি দীর্ঘ সময়ের। পাসপোর্ট অফিসের সেবার সামান্য কিছু নমুনা উঠে এসেছে গতকাল প্রকাশিত দৈনিক সুনামগঞ্জের খবরের ‘পাসপোর্ট অফিসে কী হচ্ছে’ শীর্ষক সরেজমিন পর্যবেক্ষণে। ওখানে জনৈক আইনজীবীর অভিজ্ঞতা থেকে জানা যায়, তার দুই আত্মীয় একসাথে পাসপোর্টের আবেদন করলেও একজন অতিরিক্ত ১২ শ’ টাকা দেয়ার কারণে পাসপোর্ট পেয়ে গেছেন, অন্যজন এমন টাকা না দেয়ায় পাসপোর্টটি কবে পাবেন সেটি এখনও ঘোর অনিশ্চয়তায়। এই ছোট্ট একটি ঘটনাই পুরো পাসপোর্ট অফিসের পরিবেশ বুঝতে যথেষ্ট। মূলত এই অফিসে সাধারণ মানুষের টাকা ছাড়া কোন সেবা পাওয়ার উপায় নেই। পাসপোর্ট অফিসে আমাদের সেই চিরচেনা দালালদের অবাধ বিচরণ। এরা বরের পিসি কনের মাসী হয়েই মক্কেল ও অফিসের মধ্যে যোগসূত্রের অবলম্বন। এরা দুর্দ- ক্ষমতাশালী। এদের হাত থেকে রক্ষা নেই কারও।
সারা বিশ্বকে এখনও একটি মাত্র রাষ্ট্র ভাবার অবকাশ তৈরি হয়নি। কিন্তু আকাক্সক্ষাটি এমনই। তথ্যপ্রযুক্তির বদৌলতে রাষ্ট্রীয় সীমানার তথাকথিত প্রাচীর ভেঙ্গে পড়েছে বহু আগেই। এখন এক সংস্কৃতি ভিন্ন সংস্কৃতিতে সহজেই আত্তীকৃত হয়ে পড়ছে। সেই দিন সম্ভবত বেশি দূরে নয় যখন এক দেশ থেকে আরেক দেশে চলাচল করতে বিশ্ব-নাগরিকদের কারও কোন অনুমতির প্রয়োজন পড়বে না। কিন্তু যতক্ষণ সেটি না হচ্ছে ততক্ষণ পর্যন্ত পাসপোর্ট,ভিসা ইত্যাদি রাষ্ট্রীয় অনুমোদননামা পেতে নির্ঝঞ্ঝাট ও বেদালালি সেবা নিশ্চিত করা জরুরি।