বর্ষায় জলাবদ্ধতা আর শুকনায় ধুলা

আক্ষরিক অর্থেই ধুলার শহরে পরিণত হয়েছে সুনামগঞ্জ পৌরশহর। কুয়াশার মতো করে শহরের বিভিন্ন পাড়া মহল্লার রাস্তাগুলো ঢেকে রাখে ধুলো। ধুলোময় সড়ক দিয়ে দানবের গতিতে ছুটে চলে ট্রাক, ট্রাক্টর। তখন ধুলার ঝড় শুরু হয় রাস্তা-ঘাটে। মানুষ রাস্তায় বেরোতে ভয় পান। পারতপক্ষে জরুরি প্রয়োজন ছাড়া এখন আর কেউ রাস্তায় বেরোন না। রাস্তায় বেরোলেই ধুলোর আক্রমণে বিপর্যস্থ আজ নাগরিক কূল। পুরো শুকনোর মৌসুমই এই অবস্থা চলতে থাকবে। এই ধরনের ধুলোময় শহর ছেড়ে পালাতে পারলে বাঁচে মানুষ। কিন্তু পালাবে কোথায়? জীবিকার টান, সন্তানদের লেখাপড়ার বাধ্যবাধকতা, অফিস আদালতের জরুরি প্রয়োজন; এমনসব নানা কারণে শহর প্রতিনিয়ত লোকভারে ভারী হচ্ছে। বর্ষায় জলাবদ্ধতা আর শুকনায় ধুলা, এই যেন নিয়তির লিখন হয়ে গেছে, শহরবাসী মেনে নিয়েছেন এই বিড়ম্বনা। না মেনে উপায়ই বা কী? এ থেকে যারা পরিত্রাণ দিতে পারেন তাদের যে উদ্যোগের বড়ই অভাব। বরং বলা যায়, নেই ন্যূনতম উদ্যোগও।
শহরময় কেন এত ধুলার উৎপাত? একটি কারণ, শুকনো মৌসুমে বৃষ্টিপাত না হওয়ায় এমনিতেই রাস্তা-ঘাটে কিছু ধুলা থাকে। কিন্তু এখন শহরের রাস্তা-ঘাটে যে ধুলা তা শুকনা মৌসুমের সেই স্বাভাবিক ধুলা নয়। এই ধুলার পিছনে রয়েছে আরও বহুবিধ কারণ। সরকারি-বেসরকারি নির্মাণ কাজে ব্যবহৃত সামগ্রীর যথেচ্ছ সংরক্ষণ করা এর বড় কারণ। নির্মাণ সামগ্রী হিসাবে ব্যবহৃত, বালু, পাথর, মাটি ইত্যাদি রাখার একমাত্র স্থান এখন শহরের রাস্তা। আবাসিক এলাকাগুলোতে গেলেই দেখা যাবে বহু বাসা-বাড়ির সামনে এসব সামগ্রী ফেলে রাখা হয়েছে। এক জনের কাজ শেষ হলে আরেক জনের কাজ শুরু হয়। তাই রাস্তা কখনও ফাঁকা থাকে না। এইসব নির্মাণ সামগ্রী থেকেই ধুলা উৎপন্ন হয়ে নাগরিকদের বিড়ম্বনার কারণ হয়ে দাঁড়িয়েছে।
শহরের বাসাবাড়িগুলো এখন এতটাই ছোট হয়ে গেছে যে, দুই, তিন বা চার শতাংশ জায়গায় উপর মানুষের ঘর বানাতে হয়। ঘরের বাইরে এক চিলতে জায়গা থাকে না কারও। নির্মাণ কাজ করার সময় তাই নির্মাণসামগ্রী সংরক্ষণের জন্য তারা রাস্তাকেই নিরাপদ জায়গা মনে করেন। পাখির বাসার মত এইসব বাসা-বাড়ির মালিকদেরও কোনো উপায়ন্তর নেই। কিন্তু উপায়ন্তর না থাকলেও উত্তম নাগরিক হিসাবে তাদের কিছু নাগরিক কর্তব্য থাকার কথা। এরা যদি কিছুটা দায়িত্ব সচেতন হয়ে নির্মাণ সামগ্রী সংরক্ষণে যতœবান হন তাহলে অবস্থা এতটা অবনতি হত না। তারা দিনে দু’বেলা বাসার সামনের সড়কে পানি ছিটানোর ব্যবস্থা করতে পারেন অনায়াসে। কিন্তু কোনো মালিককেই এই উত্তম চর্চা করতে দেখা যায় না। সভ্য সমাজের বিধান হল, কেউ নিয়ম না মানলে তাকে আইনের সহায়তায় আইন মানতে বাধ্য করানো। কিন্তু আমরা সকলেই সকলের পরিচিত। মুখলজ্জার কারণে কাউকে কিছু বলতে পারি না। তাই নিয়মও মানা হয় না।
শহরময় এখন যে ধুলার রাজত্ব তাতে জনস্বাস্থ্যও প্রচ-ভাবে হুমকির সম্মুখীন। ধুলা শুধু ধুলা নয়। এ নানা জীবাণুতে আকীর্ণ থাকে। শ্বাসনালির মাধ্যমে ভিতরে গিয়ে এই ধুলা ফুসফুসের ক্ষতি ঘটায়। যারা এলার্জির সমস্যায় ভোগেন এই ধুলা তাদের কী পরিমাণ ক্ষতি করে তা ভুক্তভোগী ছাড়া কেউ বুঝবেন না। কাপড় ময়লা হওয়ার উৎপাতটি তো এই তুলনায় কিছুই নয়। ধুলার হাত থেকে পৌরশহরবাসীকে মুক্তি দিতে তাই আমরা পৌর কর্তৃপক্ষের সহৃদয় দৃষ্টি আকর্ষণ করি।
শুকনো মৌসুমে রাস্তা-ঘাটে দু’বেলা পানি ছিটানোর ব্যবস্থা করা অপরিহার্য। পৌরসভাকে এই কাজটি নিয়মিত করতে হবে। এছাড়া যারা রাস্তার পাশে নির্মাণ সামগ্রী রাখেন তারা যাতে আরও যতœশীল হন তার নিশ্চয়তা বিধানসহ এইসব মালিকদেরও পানি ছিটাতে বাধ্য করতে হবে। নির্মল বাতাসকে কলুষিত করা ধুলার হাত থেকে আমরা পরিত্রাণ চাই।