বাঁধকে সড়কে রূপান্তর করা সৃজনশীল পরিকল্পনার অংশ

ফসল রক্ষার জন্য নির্মিত বাঁধগুলোকে যদি যাতায়াত সড়কে রূপান্তর করা যায় তাহলে সেটি করার জন্য প্রয়োজনীয় পদক্ষেপ গ্রহণ করা সমীচীন। কারণ এর মধ্য দিয়ে বাঁধটি যেমন স্থায়ী রূপ পেয়ে যাবে তেমনি গ্রামীণ সড়ক অবকাঠামোর উন্নয়নের মধ্য দিয়ে যোগাযোগ ব্যবস্থাকে আরও সুগম করে তোলা সম্ভব। হাওড়ে যেসব বাঁধ দেয়া হয়, প্রাকৃতিক প্রয়োজনে বর্ষাকালে তার অনেক অংশ ভেঙে দিতে হয়। ভেঙে দিতে হয় এ কারণে যে, নদীগুলোর পানি যাতে হাওড়ে প্রবেশ করে। নদীর পানি হাওড়ে প্রবেশ করার সুযোগ না পেলে নদীর দুই কুল প্লাবিত হয়ে লোকালয় ও গ্রামকে বন্যা কবলিত করে তুলবে। হাওড়গুলো যেমন আমাদের খাদ্যভা-ার তেমনি এগুলো একই সাথে মিঠা পানির মাছের ভা-ারও বটে। হাওড় বর্ষার অতিরিক্ত পানি ধারণ করে ভাটির লোকালয়কে যেমন বন্যার হাত থেকে রক্ষা করে তেমনি মাছের প্রজনন, বিচরণ ক্ষেত্র হিসাবেও ভূমিকা রাখে। আর এই কাজে প্রকৃতি নিজস্ব নিয়মে তাকে সহযোগিতা করে। এসব কারণে হাওড়ে স্থায়ী বাঁধ নির্মাণ করার কথা এতদিন ছিল চিন্তার বাইরে। কিন্তু মানুষের উন্নত ও অগ্রসর চিন্তা হাওড়ের বাঁধগুলোকে স্থায়ী রূপ দেয়ার বাস্তবতায় নিয়ে গেছে। বাংলাদেশের বহু জায়গায় পানি উন্নয়ন বোর্ডের বন্যা প্রতিরোধী বাঁধগুলো যোগাযোগ সড়ক হিসাবে ব্যবহৃত হচ্ছে। একটু চেষ্টা করলে হাওড়ের ফসল রক্ষা বাঁধগুলোকেও অনুরূপ যোগাযোগ সড়ক রূপে ব্যবহার করা যেতে পারে। গতকাল দৈনিক সুনামগঞ্জের খবরে বিশ্বম্ভরপুর উপজেলার খরচার হাওড়ে নির্মিত কয়েকটি বাঁধকে স্থায়ী সড়কে রূপান্তরের বিষয়ে এলাকাবাসীর মতামত নিয়ে একটি প্রতিবেদন প্রকাশিত হয়েছে। এই বাঁধগুলোকে সড়কে রূপান্তর করা হলে বর্তমানে ওই উপজেলার সড়ক যোগাযোগ বিচ্ছিন্ন ফতেপুর ইউনিয়নের প্রায় সবগুলো গ্রামকেই উপজেলা সদরের সাথে সরাসরি সড়ক নেটওয়ার্কের আওতায় আনা সম্ভব। বাঁধের বহুমুখী ব্যবহারের মধ্য দিয়ে সরকারি অর্থ ব্যয়কে আরও ফলপ্রসূ করে তোলার এই চিন্তা-ভাবনাকে তাই আমরা স্বাগত জানাই।
হাওড়ে পানি ঢুকার জন্য সাধারণত কয়েকটি নির্দিষ্ট অংশ থাকে। নদীর সাথে সংযোগ পয়েন্টগুলোকে ক্লোজার বলা হয়। এছাড়া হাওড়ের অভ্যন্তরস্থ খালগুলো, যেগুলো হ্ওাড়ের সীমানা ডিঙিয়ে চলে গেছে, সেগুলোর সংযোগস্থলগুলোতেও এরূপ ক্লোজার বাঁধ নির্মাণ করা হয়। এর বাইরে বিশাল বাঁধ এলাকার অন্য অংশগুলো মোটামুটি স্থায়ীই থাকে। এখন ক্লোজার অংশগুলোতে যদি কালভার্ট বা স্লুইসগেট নির্মাণ করে দেয়া হয় এবং পুরো বাঁধকে এমন উচ্চতায় নির্মাণ করা হয় যাতে বর্ষায় জলমগ্ন না হতে পারে, তখন পুরো বাঁধটি সড়ক হিসাবে ব্যবহারের সুােযগ তৈরি হয়ে যায়। বাঁধের খরচে যদি সড়কের ক্ঠাামো আমরা পেয়ে যাই তাহলে সেখানে বাড়তি আরও কিছু টাকা খরচ করে সড়ক গড়ে উঠবে। এই ধরনের বহুমুখী ব্যবহার উপযোগী বাঁধগুলোর বিষয়ে সরকারের মনোযোগ বাড়ানো দরকার।
একসময় বাঁধের নামে আসা সরকারি বরাদ্দের টাকা পঞ্চভুতে লুটেপুটে খেত। কোথাও বাঁধের কাঠামো তেমন নজরে পড়ত না। গত দুই বছর যাবৎ বাঁধের কাজে দুর্নীতি উল্লেখযোগ্য পরিমাণে কমে এসেছে। বাঁধগুলোও এখন দৃশ্যমান হচ্ছে। মানুষ বুঝতে পারছে এই বাঁধগুলোই তাদের সড়ক হতে পারে। তাই তারা বিষয়টির প্রতি সরকারের দৃষ্টি আকর্ষণের চেষ্টা করছেন নানা উপায়ে। আমরা আশা করব যেসব বাঁধকে সড়কে রূপান্তর করা সম্ভব, পানি উন্নয়ন বোর্ড সেগুলোর তালিকা করে সরকারের নিকট পেশ করবেন। সরকার তখন সড়কের বাকি কাজ করার জন্য যথোপযুক্ত কর্তৃপক্ষকে দায়িত্ব দিতে পারেন।