বাঁধের অপ্রয়োজনীয় প্রকল্প, কোটি টাকা আত্মসাতের ফন্দি

বিশেষ প্রতিনিধি
সুনামগঞ্জের বৃহৎ হাওরগুলোতে ফসল রক্ষা বাঁধের নামে কোটি কোটি টাকা আত্মসাতের ফন্দি এঁটেছেন কোনো কোনো পিআইসি (প্রকল্প বাস্তবায়ন কমিটি) ও সংশ্লিষ্ট দায়িত্বশীলরা। টাকা আত্মসাতের জন্য যেখানে বাঁধের প্রয়োজন নেই, সেখানে বাঁধ দেওয়া হচ্ছে। বোরো জমির বাঁধ হচ্ছে আমন জমিতে। এই নিয়ে উদ্বিগ্ন জেলা সংশোধিত কাবিটা নীতিমালা বাস্তবায়ন কমিটিও। সোমবার রাতে সংশোধিত কাবিটা নীতিমালা বাস্তবায়ন কমিটির পক্ষে স্থানীয় সরকার বিভাগের উপ-পরিচালক, অতিরিক্ত জেলা প্রশাসক এমরান হোসেন সংশ্লিষ্ট সকলকে পাঠানো চিঠিতে উল্লেখ করেছেন, বিভিন্ন উপজেলায় অপ্রয়োজনীয় প্রকল্প গ্রহণের কারণে অনাকাঙ্খিত পরিস্থিতির সৃষ্টি হচ্ছে। মামলা মোকদ্দমারও উদ্ভব হচ্ছে। বাঁধের কাজের অগ্রগতি বাধাগ্রস্ত হচ্ছে।
জেলার জামালগঞ্জ উপজেলার পাগনার হাওরের ফসল রক্ষার জন্য উজ্জলপুর গ্রামের পাশের ৩৯ ও ৪০ নম্বর পিআইসি যে বাঁধের কাজ করছে তা হাওর রক্ষায় কোনো কাজে আসবে না। এটি একটি ভুয়া প্রকল্প দাবি করে লিখিত আবেদনে হাওরপাড়ের ছেলাইয়া, মাহমুদপুর ও মানিগাঁও গ্রামের কৃষকরা লিখেছেন, বাঁধের নিকটে জামালগঞ্জ-সুনামগঞ্জ পাকা সড়ক রয়েছে। সড়কের ভেতরে আরেকটি মাটির সড়ক হচ্ছে কেন এলাকাবাসী বুঝে উঠতে পারছেন না। এই দুটি প্রকল্পে বরাদ্দ হয়েছে ২৫ লাখ টাকা। সরকারী এই টাকার অপচয় ঠেকাতে এলাকাবাসী সোমবার জেলা প্রশাসকের নিকট লিখিত আবেদন করেছেন।
জেলার শাল্লা উপজেলার ডুমরা গ্রাম হতে মুক্তারপুর পর্যন্ত বাঁধের কাজ করা হচ্ছে, আগের বছরের বাঁধের উপরে দেওয়া ব্লকের উপরই। এলাকাবাসী বাঁধা দিলেও পিআইসি’র দায়িত্বপ্রাপ্তরা তা শুনছেন না।
এই উপজেলার কুশিয়ারা নদীর ডান তীরে বাঁধের কাজে প্রয়োজনের চেয়ে বরাদ্দ অনেক বেশি হয়েছে বলে দাবি করেছেন স্থানীয়রা।
শাল্লা উপজেলা পরিষদের চেয়ারম্যান উপজেলা আওয়ামী লীগের সাধারণ সম্পাদক আল আমিন চৌধুরী ডুমরা-মুক্তারপুর পর্যন্ত বাঁধের ব্লক সরিয়ে মাটি ফেলার পর আবার ব্লক বিছানো হলে এই বাঁধ স্থায়ী হয়ে যেতো বলে মন্তব্য করেছেন। তিনি জানান, পিআইসি’র লোকজন ব্লক না সরিয়েই কাজ করছে। শুনছে না কারো কথাই।
সুনামগঞ্জ সদর উপজেলার চলতি নদীর বাম তীরে বাঁধ নির্মাণের জন্য বরাদ্দ হয়েছে ৩ কোটি ২২ লাখ টাকা। ১৪ টি পিআইসি এই বাঁধের কাজ করছে। অথচ চলতি নদীর বাম পাড়ে বড় কোনো হাওরও নেই।
বামপাড়ের অক্ষয়নগর গ্রামবাসী বৃহস্পতিবার স্থানীয় সংসদ সদস্য, পানি উন্নয়ন বোর্ডের নির্বাহী প্রকৌশলী ও উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তার নিকট লিখিত আবেদন করে জানিয়েছেন, চলতি নদীর বামতীরের অক্ষয়নগর গ্রামের আশপাশে কোনো বোরো জমি নেই। গ্রামের আশপাশের জমিতে সবজী চাষাবাদ হয় এবং আমন ধান রোপন হয়। এই গ্রামের পাশে চলতি নদীর তীরে বাঁধ হলে এলাকায় জলাবদ্ধতা দেখা দেবে, আমন ও সবজী ক্ষেতে বিপর্যয় দেখা দেবে।
মঙ্গলবার এই বাঁধ সরেজমিনে দেখার জন্য গিয়েছিলেন, সদর উপজেলা হাওর রক্ষা বাঁধের প্রকল্প যাচাই-বাছাই কমিটির দায়িত্বপ্রাপ্তরা।
বাঁধের পাশের গ্রাম অক্ষয়নগরের কৃষক মো. চান মিয়া যাচাই-বাছাই কমিটির সদস্যদের বলেছেন, আমার আধা একর ( দেড় কেয়ার) আমন জমি রয়েছে। এই জমিই আমার সম্পদ। আর কিছু নেই। এই জমির উপর দিয়ে অপ্রয়োজনীয় বাঁধ নেবার জন্য চেষ্টা করা হচ্ছে। আমি জানিয়েছি আমার জমির উপর দিয়ে বাঁধ নেওয়া হলে আমি আত্মহত্যা করবো। যেহেতু এই বাঁধ কোনো কাজে আসবে না সেহেতু আমি কেন আমার জমি নষ্ট করতে দেব।
একই গ্রামের আজিজুর রহমান বলেন, অকাল বন্যার কবল থেকে বোরো জমি রক্ষা করতে হাওর রক্ষা বাঁধের কাজ হয়। কাইয়ারগাঁও থেকে অক্ষয় নগর পর্যন্ত বোরো জমি রক্ষার জন্য বাঁধ হচ্ছে না। সরকারি টাকা লুটপাটের উদ্দেশ্যে এই বাঁধ হচ্ছে।
গ্রামের লিয়াকত মিয়া বলেছেন, আমার জমির উপর দিয়ে অপ্রয়াজনীয় বাঁধ নেবার চেষ্টা হলে, আমি আইনের আশ্রয় নেব।
হাওর বাঁচাও আন্দোলনের সুনামগঞ্জ জেলা কমিটির সভাপতি বজলুল মজিদ চৌধুরী খসরু বলেন, হাওর রক্ষা বাঁধের প্রকল্প তৈরি’র সময়ই আমরা বলেছি, বাঁধের টাকা আত্মসাতের জন্য এক শ্রেণির লুটেরা অপ্রয়োজনীয় প্রকল্প গ্রহণ করবে। এজন্য গণশুনানী করে বাঁধের প্রকল্প গ্রহণ এবং পিআইসি গঠনের কথা বলেছিলাম। অনেক স্থানে সেটি হয় নি। এজন্যই এখন কোথাও কোথাও বাঁধ নির্মাণ নিয়ে বিতর্ক তৈরি হয়েছে।
সুনামগঞ্জ পানি উন্নয়ন বোর্ডের নির্বাহী প্রকৌশলী সাবিবুর রহমান জানান, জামালগঞ্জের ৩৯ ও ৪০ নম্বর পিআইসির কাজ করার বিষয়ে স্থানীয় দায়িত্বপ্রাপ্তরা বলেছেন জামালগঞ্জ-সুনামগঞ্জ সড়কের কিছু কিছু অংশ নীচু এবং সড়কে ভাঙনও আছে। পানি ঢুকার আশঙ্কায় এখানে বাঁধ করা হচ্ছে।
সুনামগঞ্জ সদর উপজেলার চলতি নদীর বাম তীরের বাঁধ কেন হচ্ছে, তা যাচাই করছেন উপজেলা প্রকল্প যাচাই-বাছাই কমিটির সদস্যরা। তারা রিপোর্ট দিলে এটি জেলা কমিটির সভায় উত্থাপন হবে।
জেলা স্থানীয় সরকার বিভাগের উপ-পরিচালক, অতিরিক্ত জেলা প্রশাসক মোহাম্মদ এমরান হোসেন সোমবার সারাদিনই হাওর এলাকায় বাঁধ পরিদর্শন করেছেন। রাতে অফিসে ফিরে তিনি সকল উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তাগণকে পাঠানো চিঠিতে উল্লেখ করেছেন, বাঁধ মেরামত, নির্মাণ এবং নদী-খাল পুন: খননের জন্য অপ্রয়োজনীয় প্রকল্প গ্রহণের বিষয়টি পরিলক্ষিত হচ্ছে। এ কারণে প্রকল্প বাস্তবায়নে অনাকাঙ্খিত পরিস্থিতির সৃষ্টি হচ্ছে। অপ্রয়োজনীয় প্রকল্প বাস্তবায়ন এবং প্রস্তাব প্রেরণের কারণে ভব্যিষ্যতে কোনো বিরূপ পরিস্থিতির সৃষ্টি হলে এর দায় দায়িত্ব সংশ্লিষ্ট প্রকল্প প্রস্তাব সমর্থন ও প্রস্তাবকারীর উপর বর্তাবে। এই চিঠির অনুলিপি পানি সম্পদ সচিব, সিলেটের বিভাগীয় কমিশনার, বাংলাদেশ পানি উন্নয়ন বোর্ডের মহাপরিচালক, জেলা প্রশাসকসহ সংশ্লিষ্টদের পাঠিয়েছেন স্থানীয় সরকার বিভাগের উপ-পরিচালক মোহাম্মদ এমরান হোসেন।
স্থানীয় সরকার বিভাগের উপপরিচালক মোহাম্মদ এমরান হোসেন বলেন, আমি অপ্রয়াজনীয় প্রকল্পের দায় নেব না। বাঁধ নির্মাণে কোন অনিয়মও বরদাস্ত করবো না। এজন্য সংশ্লিষ্ট সকলকে এই বিষয়ে চিঠি পাঠিয়েছি।