বাঁধের কাজে লেজেগোবরে অবস্থা

বিশেষ প্রতিনিধি
সুনামগঞ্জের ৩৬ টি বৃহৎ হাওরসহ জেলার ১৫৪ টি হাওররক্ষা বাঁধের কাজ নিয়ে এবারও লেজেগোবরে অবস্থা। নীতিমালা অনুযায়ী এবার হাওররক্ষা বাঁধ প্রকল্প বাস্তবায়ন কমিটির (পিআইসি’র) মাধ্যমে করার কথা। ৩০ নভেম্বরের মধ্যে পিআইসি গঠন এবং ১৫ ডিসেম্বরের মধ্যে কাজ শুরু হবার কথা ছিল। কিন্তু রোববার পর্যন্ত (৩১ ডিসেম্বর পর্যন্ত) কোথাও বাঁধের কাজ শুরু হয়নি। হাওররক্ষা বাঁধ নির্মাণের স্কীম প্রস্তুত ও বাস্তবায়নের লক্ষ্যে গঠিত জেলা কমিটির আহ্বায়ক, জেলা প্রশাসক মো. সাবিরুল ইসলাম ও সদস্য সচিব পাউবো’র নির্বাহী প্রকৌশলী আবু বকর সিদ্দিক ভুইয়া জানালেন,‘হাওররক্ষা বাঁধের ১০৩৮ টি প্রকল্প অনুমোদনের জন্য গত ২৮  নভেম্বর পানি উন্নয়ন বোর্ড ও পানি সম্পদ মন্ত্রণালয়ে প্রেরণ করা হলেও রোববার পর্যন্ত এগুলো অনুমোদন হয়নি।’ অনুমোদন না হলে তাঁরা কীভাবে কাজ শুরু করবেন বলেও মন্তব্য করেন এই দুই কর্মকর্তা। এছাড়া অতিরিক্ত বরাদ্দ চেয়েও তাঁরা চিঠি দিয়েছিলেন, সেই চিঠিরও কোন জবাব পাওয়া যায়নি। এই অবস্থায় বেকায়দায় পড়েছেন তাঁরা।
হাওর রক্ষা বাঁধ নির্মাণের স্কীম প্রস্তুত ও বাস্তবায়নের লক্ষ্যে গঠিত জেলা কমিটির সভা অনুষ্ঠিত হয় গত ২৬ নভেম্বর। সভায় জানানো হয় সুনামগঞ্জ পওর বিভাগ-১’এর আওতায় থাকা সুনামগঞ্জ সদর, বিশ্বম্ভরপুর, ধর্মপাশা, জামালগঞ্জ ও তাহিরপুর উপজেলার হাওররক্ষা বাঁধের জন্য বরাদ্দ পাওয়া গেছে ১২ কোটি ৩৯ লাখ টাকা। অথচ. এই উপজেলাগুলোর পাঠানো প্রকল্প বাস্তবায়ন করতে হলে টাকা প্রয়োজন ৪০ কোটি ৩ লাখ ২১ হাজার টাকা। সেই হিসাবে অতিরিক্ত আরও ২৭ কোটি ৬৩ লাখ ৬৯ হাজার টাকা প্রয়োজন। সুনামগঞ্জ পওর বিভাগ-২’এর আওতায় থাকা দিরাই, শাল্লা, দক্ষিণ সুনামগঞ্জ, জগন্নাথপুর, ছাতক ও দোয়ারাবাজার হতে পাঠানো প্রকল্প বাস্তবায়ন করতে হলে ৩২ কোটি ৩০ লাখ ৮৫ হাজার টাকা প্রয়োজন। অথচ. এখানে বরাদ্দ পাওয়া গেছে ১৬ কোটি ৪৯ লাখ টাকা। এই অংশে ১৯ কোটি ৬ লাখ ৮৫ হাজার টাকা অতিরিক্ত প্রয়োজন।
সভার সিদ্ধান্ত অনুযায়ী গত ২৮ নভেম্বর এই অতিরিক্ত বরাদ্দ চেয়ে চিঠি পাঠানো হলেও এখনো এর উত্তর পাওয়া যায়নি। একইভাবে জেলার ১১ উপজেলার পাঠানো ১০৮৮ টি প্রকল্প অনুমোদনের জন্য পাউবো মহাপরিচালককে ব্যবস্থা গ্রহণের জন্য চিঠি দেওয়া হলেও এখনো প্রকল্প অনুমোদনের কোন চিঠি আসেনি।
নীতিমালা-২০১৭’এর আওতায় কাজ বাস্তবায়নের জন্য ৭ আগস্ট’২০১৭ তারিখে জেলার ১১ উপজেলাকে দুই ভাগে ভাগ করে দুই জন নির্বাহী প্রকৌশলী পদায়ন করা হয়। আলাদা আলাদা অফিসও করা হয়। কিন্তু বাঁধের প্রকল্প তৈরি ও পিআইসি গঠনের সময়ই গত ২৩ ডিসেম্বর পওর বিভাগের-২এর নির্বাহী প্রকৌশলীকে এখান থেকে বদলি করা হয়। রোববার পর্যন্ত ঐ পদে কোন কর্মকর্তা আসেন নি। পওর বিভাগ-১’এর নির্বাহী প্রকৌশলী দুই কর্মকর্তার দায়িত্ব পালন করছেন। তাতেও প্রকল্প বাস্তবায়নে বিঘœতা সৃষ্টি হয়েছে।
জেলা প্রশাসক মো. সাবিরুল ইসলাম বলেন, ‘জেলার ১০৮৮ প্রকল্পের পিআইসি গঠন এবং প্রকল্প তৈরি করে গত ২৬ নভেম্বরের জেলা কমিটির সিদ্ধান্ত অনুযায়ী পানি উন্নয়ন বোর্ডের মহাপরিচালকের কাছে ব্যবস্থা নেবার জন্য চিঠি পাঠানো হলেও এখনো এই চিঠির জবাব পাওয়া যায়নি। আমরা এই প্রকল্পগুলো দ্রুত অনুমোদন করিয়ে কাজ শুরু করার চেষ্টা করছি।’ তিনি জানান, প্রথমে যে নীতিমালা করা হয়েছিল তাতে প্রথমে উপজেলা কমিটি, পরে জেলা কমিটি এবং সর্বশেষ মন্ত্রণালয়ের অনুমোদনের পর কাজ প্রকল্প বাস্তবায়নের কাজ শুরু হবে। কয়েকদিন হলো নীতিমালায় পরিবর্তন এনে বলা হয়েছে উপজেলা ও জেলা কমিটি অনুমোদন দেবার পর আর কারো অনুমোদন লাগবে না। পরিবর্তিত নীতিমালার আগেই ১০৮৮ টি প্রকল্প অনুমোদনের জন্য মন্ত্রণালয়ে পাঠানো হয় এবং সেগুলো ফেরৎ না আসায় বা এই বিষয়ে কোন নির্দেশনা না দেওয়ায় তাঁরা জটিলতায় পড়েছেন।
পাউবো’র সুনামগঞ্জের নির্বাহী প্রকৌশলী আবু বকর সিদ্দিক ভুইয়া বলেন,‘পিআইসি গঠন এবং প্রকল্প তৈরির কাজ আমরা শেষ করেছি, কিন্তু এখন প্রকল্প অনুমোদনের জটিলতায় পড়েছি। উপজেলা কমিটি মনে করছে অনুমোদন ছাড়া কাজ শুরু করলে পরে টাকা পেতে সমস্যা হতে পারে। আমরা এই বিষয়ে উর্ধ্বতন কর্তৃপক্ষের সঙ্গে কথা বলেছি এবং আগামী ২-৩ দিনের মধ্যেই এই অনুমোদন জটিলতার অবসান হবে। কাজও শুরু হবে। আগামী ৭ জানুয়ারি মাননীয় পানি সম্পদ মন্ত্রীও সুনামগঞ্জে আসবেন । উপজেলা কমিটিগুলোর সঙ্গে মতবিনিময় করবেন তিনি।’