বাঁধ নির্মাণে ঠিকাদারি প্রথা বাতিল

বিশেষ প্রতিনিধি
হাওরে এবার ঠিকাদারদের মাধ্যমে কোন হাওর রক্ষা বাঁধের কাজ করানো হবে না। এমনকি গতবছর ঠিকাদাররা যেসব বাঁধের কাজ করেনি, সেগুলোও ঠিদাদারদের দিয়ে করা হবে না। সবই করা হবে প্রকল্প বাস্তবায়ন কমিটির মাধ্যমে। গত বুধবার পানি উন্নয়ন বোর্ডের সদর দপ্তরে উর্ধ্বতন কর্মকর্তাদের সভায় এই সিদ্ধান্ত হয়েছে।
পাউবোর একজন কর্মকর্তা জানান, সুনামগঞ্জের বোরো ফসল রক্ষায় জেলার বৃহৎ ৩৬ টি হাওরসহ ছোট বড় সকল হাওরের বাঁধ নির্মাণের জন্য কাবিটা (কাজের বিনিময়ে টাকা) প্রকল্পে এবার ৮৮ কোটি ৮৯ লাখ টাকার বরাদ্দ দিয়েছে পানি সম্পদ মন্ত্রণালয়।
জানা যায়, হাওর এলাকায় ফসল রক্ষায় ক্ষতিগ্রস্ত বাঁধ মেরামত, নদী /খাল পুনঃখননের জন্য পানি সম্পদ মন্ত্রণালয়ের বাংলাদেশ পানি উন্নয়ন বোর্ড নতুন কাবিটা (কাজের বিনিময়ে খাদ্য কর্মসূচি) নীতিমালা প্রণয়ন করেছে। নীতিমালায় প্রকল্প বাস্তবায়ন কমিটি (পিআইসি) গঠন এবং প্রকল্প কার্যক্রম তদারকিতে জেলা ও উপজেলা প্রশাসনকে ক্ষমতা প্রদান করা হয়েছে।
গত ১৪ সেপ্টেম্বর পানি সম্পদ মন্ত্রণালয়ের যুগ্ম সচিব নুজহাত স্বাক্ষরিত কাবিটা’র এই নীতিমালা মন্ত্রণালয়ের ওয়েবসাইটে প্রকাশ করা হয়েছে। এর আগের দিন ১৩ সেপ্টেম্বর এই নীতিমালা অনুমোদন করে মন্ত্রণালয়।
পাউবোর নতুন কাবিটার নীতিমালায় উল্লেখ করা হয়েছে, এই বছর হাওরের বোরো ফসল তলিয়ে ব্যাপক ক্ষতি হয়েছে। এই প্রেক্ষাপটে হাওরের ডুবন্ত বাঁধ নির্মাণ, সংস্কার ও মেরামত কাজের নানা গুরুতর অভিযোগ উঠে। অভিযোগ তদন্তে সরকার উচ্চ ক্ষমতা সম্পন্ন তদন্ত কমিটি গঠন করে এবং বিভিন্ন সংস্থা কর্তৃক একা তদন্ত কমিটি গঠিত হয়। কমিটির সুপারিশের আলোকে কাবিটা ও কাবিখা নীতিমালায় আমূল সংস্কারের প্রয়োজনীয়তা দেখা দেয় এবং সে আলোকে এই নতুন নীতিমালা প্রণয়ন করা হয়।
নীতিমালায় উল্লেখ করা হয়, এই নীতিমালা অনুযায়ী কাবিটা স্কিম প্রণয়ন ও বাস্তবায়নে জেলা ও উপজেলা পর্যায়ে বাস্তবায়ন ও মনিটরিং কমিটি গঠন হবে। ১২ সদস্য বিশিষ্ট জেলা কমিটিতে জেলা প্রশাসক সভাপতি, পানি উন্নয়ন বোর্ডের নির্বাহী          
 প্রকৌশলী সদস্য সচিব, কমিটিতে সদস্য হিসেবে পুলিশ সুপার,  জেলা কৃষি সম্প্রসারণ অধিদপ্তরের উপপরিচালক, জেলা মৎস্য কর্মকর্তা, এলজিইডির নির্বাহী প্রকৌশলী, সংশ্লিষ্ট সকল উপজেলা নির্বাহী অফিসার, জেলা ত্রাণ ও পুনর্বাসন কর্মকর্তা, হাওর এলাকার হাওর ও জলাভূমি উন্নয়ন অধিদপ্তরের একজন প্রতিনিধি, সভাপতি (জেলা প্রশাসক) কর্তৃক স্থানীয় একজন গণ্যমান্য ব্যক্তি, গণমাধ্যমের একজন প্রতিনিধি এবং একজন এনজিও প্রতিনিধি থাকবেন।
একইভাবে ১২ সদস্য বিশিষ্ট উপজেলা কমিটিতে উপজেলা নির্বাহী অফিসার সভাপতি, পাউবোর শাখা কর্মকর্তা সদস্য সচিব, সদস্য হিসেবে উপজেলা কৃষি কর্মকর্তা, উপজেলা মৎস্য কর্মকর্তা, এলজিইডির উপজেলা প্রকৌশলী,  সংশ্লিষ্ট থানার ওসি, উপজেলা প্রকল্প বাস্তবায়ন কর্মকর্তা (পিআইও), সভাপতি (উপজেলা নির্বাহী অফিসার) কর্তৃক স্থানীয় একজন গণ্যমান্য ব্যক্তি, গণমাধ্যমের একজন প্রতিনিধি, একজন এনজিও প্রতিনিধি, একজন কৃষক প্রতিনিধি ও একজন মৎস্যজীবী প্রতিনিধি থাকবেন।
উভয় কমিটি প্রয়োজনে কো-অপ্ট করে সদস্য সংখ্যা বৃদ্ধি করতে পারবে। প্রয়োজনে জেলা প্রশাসক জেলা ও উপজেলা পর্যায়ে কাবিটা কাজ পর্যবেক্ষণের জন্য বিশেষ কমিটি গঠন করতে পারবেন। নীতিমালায় সংসদ সদস্য ও উপজেলা পরিষদ চেয়ারম্যানকে দিয়ে উপদেষ্টা কমিটি করা হয়েছে। উপদেষ্টা কমিটি প্রয়োজনমতে জেলা-উপজেলা কমিটিকে পরামর্শ প্রদান করবেন। কমিটির এক তৃতীয়াংশ  সদস্যের উপস্থিতিতে কোরাম পূর্ণ হবে এবং সংখ্যাগরিষ্টের মতামতের ভিত্তিতে সিদ্ধান্ত গৃহীত হইবে। উপজেলা কমিটি কাজের সার্বিক বাস্তবায়ন কার্যক্রম তত্ত্বাবধান করিবে এবং জেলা কমিটি সার্বিক সমন্বয়ের দায়িত্ব পালন করবে। উপজেলা কমিটি ১৫ দিন পর পর জেলা কমিটির নিকট কাজের অগ্রগতি প্রতিবেদন দাখিল করবে এবং জেলা কমিটির নিকট দায়বদ্ধ থাকবে।
উপজেলা নির্বাহী অফিসার ও উপজেলা কমিটির সদস্য সচিব সংশ্লিষ্ট ইউনিয়ন পরিষদ চেয়ারম্যানের সাথে পরামর্শক্রমে স্কিম প্রস্তুত করবেন। ইউনিয়ন পরিষদ প্রকাশ্য সাধারণ সভা বা মতবিনিময় সভার মাধ্যমে সম্ভাব্য স্কিমের বিষয়ে মতামত চাইবেন। পাশাপাশি ইউনিয়ন ওয়েব পোর্টালে মতামত আহবান করিবেন। ইউনিয়নের মাসিক বা বিশেষ সভায় সিদ্ধান্তের মাধ্যমে স্কিম নির্বাচিত হইবে।
প্রকল্পের বরাদ্দের আদেশ ও অর্থ প্রাপ্তির পর জেলা কমিটির অনুমোদনের পর উপজেলা কমিটির পক্ষে উপজেলা নির্বাহী অফিসার ও শাখা কর্মকর্তা প্রকল্প বাস্তবায়ন কমিটির চেয়ারম্যান ও সদস্য সচিবের নামে যৌথ একাউন্টের অনুকূলে টাকা ছাড় করবেন। ৩০ নভেম্বরের মধ্যে পিআইসি গঠন ও ১৬ ডিসেম্বররে মধ্যে কাজ শুরু এবং ২৮ ফেব্রুয়ারির মধ্যে কাজ সমাপ্ত করতে হবে। হাওর এলাকায় ৩১ অক্টোবরের মধ্যে জেলা ও উপজেলা কমিটি গঠন করতে হবে।
বরাদ্দ আদেশ প্রাপ্তির পর নীতিমালার আলোকে সংশ্লিষ্ট উপজেলা নির্বাহী অফিসার পিআইসি গঠনের ব্যবস্থা নিবেন। প্রতিটি পিআইসি ৫ থেকে ৭ সদস্য বিশিষ্ট হবে। পিআইসিতে ১ জন সভাপতি, ১ জন সদস্য সচিব ও অন্যরা সদস্য হিসেবে থাকবেন। পিআইসি গঠনে বাঁধের সন্নিকটবর্তী জমির প্রকৃত মালিকদের সমন্বয়ে কেবল উপজেলা নির্বাহী অফিসার পিআইসি গঠন করবেন। প্রয়োজনে ভূমি অফিস, কৃষি অফিস এবং সংশ্লিষ্ট ইউনিয়ন পরিষদের চেয়ারম্যানের সাথে উপজেলা নির্বাহী অফিসার পরামর্শ করবেন। কোন ব্যক্তি একাধিক পিআইসির সভাপতি ও সদস্যসচিব হতে পারবেন না। পিআইসির সভাপতি ও সদস্যসচিবসহ সবাইকে সংশ্লিষ্ট ইউনিয়নের স্থায়ী বাসিন্দা হতে হবে। প্রতিটি পিআইসি ২৫ লাখ টাকার কাজ করতে পারবেন। উপজেলা নির্বাহী অফিসার পিআইসি বাতিল ও নতুন করে গঠন করতে পারবেন। প্রত্যেক কাজের পাশে বরাদ্দ ও কাজের বিবরণসহ সাইনবোর্ড টানাতে হবে। পানি সম্পদ মন্ত্রণালয় কাবিটা প্রকল্পের বরাদ্দ পাউবোর মহাপরিচালকের অনুকূলে ছাড় করবে। মহাপরিচালকের বরাদ্দকৃত টাকা পাউবোর পওর (পরিচালনা ও রক্ষণাবেক্ষণ) পরিদপ্তরের মাধ্যমে র‌্যাক হয়ে সরাসরি সংশ্লিষ্ট উপজেলা নির্বাহী অফিসারের অনুকূলে অবমুক্ত করা হবে।
পাউবোর নির্বাহী প্রকৌশলী আবু বকর সিদ্দিক বলেন,‘এবার সকল বাঁধই পিআইসির মাধ্যমে হবে। এ বছর ঠিকাদারী প্রথা থাকছে না। ৩০ নভেম্বরের মধ্যেই সকল পিআইসি গঠন হবে। যেখানে পানি নেমে যাবে, সেখানে ১৬ ডিসেম্বরের মধ্যে অবশ্যই কাজ ধরতে হবে। যে কাজগুলো গত মৌসুমে ঠিকাদাররা  করেনি সেগুলো পিআইসির মাধ্যমে করা হবে। দ্রুততার সঙ্গে কাবিটা’র স্কীম সিলেকশন চলছে’।
প্রসঙ্গত. গত বোরো মৌসুমে সুনামগঞ্জের বোরো ফসল রক্ষা বাঁধ নির্মাণে প্রায় ৬৭ কোটি টাকা বরাদ্দ ছিল। ২৩৯ টি পিআইসি (প্রকল্প বাস্তবায়ন কমিটি)  ২০ কোটি ৭০ লাখ টাকা এবং ঠিকাদারদের কাজে বরাদ্দ ছিল ৪৬ কোটি টাকা।
হাওর রক্ষা বাঁধ নির্মাণ না হওয়ায় জেলার ৪৬ টি বড় হাওরের ফসল ডুবে প্রায় সোয়া তিন লাখ কৃষক ক্ষতিগ্রস্ত হন।
বাঁধ না হওয়ায় বোরো ফসলহানির ঘটনায় গত ২ জুলাই দুদকের সহকারি পরিচালক ফারুক আহমেদ বাদী হয়ে ১৫ জন পাউবো কর্মকর্তা, ৪৬ জন ঠিকাদারসহ ৬১ জনের বিরুদ্ধে প্রথমে সুনামগঞ্জ সদর থানায় একটি মামলা দায়ের করে। এরপর গত ৩ আগস্ট পাউবোর ১৫ কর্মকর্তা, ৪৬ জন ঠিকাদার ও ৩৯টি পিআইসির সভাপতি-সাধারণ সম্পাদক ৭৮ জনসহ ১৪০ জনকে আসামি করে জেলা আইনজীবী সমিতি মামলা দায়ের করে।
দুদকের মামলায় সুনামগঞ্জ পাউবো’র বরখাস্তকৃত নির্বাহী প্রকৌশলী ও ২ ঠিকাদারকে গ্রেপ্তার করা হয়। এরা এখন জেল হাজতে আছেন।