বাঁধ হতে পারে রাস্তা

বিন্দু তালুকদার
মঙ্গলবার দুপুরে পুলিশ সুপারের সাথে বিশ্বম্ভরপুর উপজেলার ফতেপুর ইউনিয়নের অন্তর্গত হালীর হাওরের খলাচাঁনপুর গ্রামের পাশের ঝুঁকিপূর্ণ কুপানদী-গোজাখালী ক্লোজারের কাজ দেখতে যান এই প্রতিবেদক।
বাঁধ দেখতে পায়ে হেঁটে যাওয়ার কথা থাকলেও সুনামগঞ্জ শহর থেকে চার চাকার গাড়ি সোজা চলে যায় কলাচানপুর গ্রামের কাছের ওই ক্লোজারের উপর দিয়ে।
মূল সড়ক থেকে ওই ক্লোজারটিতে যাওয়ার মাটির পথটি প্রথমে মনে হয়েছিল আগের স্থায়ী কোনো সড়ক। কিন্তু স্থানীয় ইউপি চেয়ারম্যান রনজিৎ চৌধুরী রাজনের সাথে কথা বলে জানা গেল, যে জায়গাটির উপর দিয়ে গাড়িগুলো আসা-যাওয়া করছে সেটাও একটি বাঁধ। চলতি বোরো ফসলরক্ষার জন্য এই বাঁধটি নির্মাণ করা হয়েছে। বাঁধটি নির্মাণ করেছেন, হালীর হাওরের উপ প্রকল্প নং ২৪ এর পিআইসি (প্রকল্প বাস্তবায়ন কমিটি)। কাজ বাস্তবায়ন করেছেন পিআইসির সভাপতি ও সদস্য হিসেবে নয়াগাঁও গ্রামের রতিশ তালুকদার ও কাটাখালীর নুর উদ্দিন। সাড়ে ২৪ লাখ টাকা ব্যয়ে ফতেপুর সওজের রাস্তা থেকে কলাচাঁনপুর গ্রাম পর্যন্ত সাড়ে ৮০০ মিটার বাঁধ নির্মাণ করা হয়েছে।
বাঁধটির বিষয়ে কলাচাঁনপুর গ্রামের প্রবীণ কৃষক শুকলাল বর্মন বলেন,‘এরকম বাঁধ আমরা কোনো সময় দেখি নি। এইবার অনেক শক্ত বাঁধ দেয়া হয়েছে। বাঁধের উপর দিয়ে সব ধরনের গাড়ি-ঘোড়া আসা-যাওয়া করতে পারে। এখন এই বাঁধগুলো যদি পাকা করা যেত তাহলে আমাদের কোনো সমস্যা থাকত না। বাঁধ ও রাস্তা দুইটিই হয়ে যেত।’
স্থানীয়রা জানিয়েছেন, হাওরের বোরো ফসলরক্ষা বাঁধগুলো প্রশস্ত ও উঁচু করে নির্মাণের ফলে ফতেপুর ইউনিয়নের ফতেপুর, পূর্ব ফতেপুর, কলাচাঁনপুর, কউয়া, ফুলবড়ি, কাটাখালী, পিরিজপুর, নয়া বারংকা, বারকুড়ি, গোপালগঞ্জ, শান্তিপুর, আলীপুর, আমলাগহর, রঙ্গিয়ারচর গ্রামের লোকজন গ্রামীণ নতুন রাস্তা পেয়েছেন। এসব গ্রামের পাশের বাঁধগুলো সংরক্ষণ ও পাকাকরণ সম্ভব হলে ভবিষ্যতে আর বাঁধ দিতে হবে না।
ফতেপুর গ্রামের স্বাবলম্বী কৃষক জগদীশ চৌধুরী বলেন,‘ এই বছর যেভাবে বাঁধ নির্মাণ করা হয়েছে, দুইপাশে ঘাস লাগানো হয়েছে। তা যদি সঠিকভাবে সংরক্ষণ করা যায়, তাহলে এলাকার লোকজন রাস্তা হিসেবে ব্যবহার করতে পারবে।’
সরেজমিনে দেখা যায়, মূল সড়ক থেকে কলাচানপুর গ্রাম হয়ে হালীর হাওরের ফসলক্ষা বাঁধগুলোই নয়, এভাবে আশপাশের সকল বাঁধই সড়কের মত করা হয়েছে। প্রায় অধিকাংশ বাঁধের উপর দিয়েই যে কোনো ধরনের যানবাহন অনায়াসে চলাচল করতে পারবে।
বাঁধ পাশ্ববর্তী স্থানীয় কৃষকসহ এলাকাবাসীর দাবি এসব বাঁধকে গ্রামীণ সড়কে রূপান্তরিত করার । নির্মাণধীন বাঁধগুলোকে আরো টেকসই ও মজবুত করে এর উপর পাকা করলেই সড়ক স্থায়ী হয়ে যাবে। বাঁধের দুই পাশের মাটি রক্ষা করা সম্ভব হলে ভব্যিষতে এসব বাঁধে আর কাজ করতে হবে না। এলাকার লোকজন রাস্তা হিসেবে ব্যবহার করতে পারবেন।
ফতেপুর ইউনিয়নের মাঝ দিয়ে প্রবাহিত আবুয়া নদীর দক্ষিণ উত্তর-দক্ষিণ দুই তীরেই বেশ কয়েকটি প্রকল্পের মাধ্যমে বাঁধ নির্মাণ করা হয়েছে। যেসব বাঁধকে এখন পরিকল্পনার মাধ্যমে স্থায়ী সড়কে রূপান্তর করা সম্ভব বলে দাবি জানিয়েছেন এলাকার লোকজন।
এলাকার বাসিন্দা স্থানীয় ফতেপুর ইউপি চেয়ারম্যান রনজিৎ চৌধুরী রাজন বলেন, ‘আমার ইউনিয়নের সকল ফসলরক্ষা বাঁধের কাজ বেশ ভাল হয়েছে। বাঁধগুলো প্রশস্ত ও উঁচু হয়েছে। এখন এসব বাঁধের উপর ইট দেয়া বা পাকা করা গেলে গ্রামীণ বাস্তা হয়ে যাবে। হাওরের ধান-সবজি আনা-নেওয়াসহ রাস্তা হিসেবে ব্যবহার সম্ভব হবে। আমি ইউনিয়ন পরিষদের পক্ষ থেকে এলজিইডির হিলিপ কর্তৃপক্ষের কাছে দাবি জানাব বাঁধগুলোকে রাস্তা হিসেবে সংরক্ষরণ ও পাকাকরণের জন্য। যাতে এলাকাবাসী দীর্ঘ মেয়াদী সুফল পেতে পারেন। ’
ফতেপুর ইউপির বাঁধ পরিদর্শনকালে পুলিশ সুপার মো. বরকতুল্লাহ খান বলেন,‘অন্যান্য বছরের চেয়ে এই বছর হাওরের বোরো ফসলরক্ষা বাঁধগুলো বেশ ভাল ও বেশ উচু হয়েছে। যদি এই বাঁধগুলোর মাটি সুরক্ষা করা সম্ভব হয় তাহলে গ্রামীণ সড়ক হিসেবে ব্যবহার করা যাবে এবং বাঁধ স্থায়ী হয়ে যাবে।’
সুনামগঞ্জ পাউবোর নির্বাহী প্রকৌশলী আবু বকর সিদ্দিক ভূঁইয়া বলেন,‘ হাওরের ফসলরক্ষা বাঁধগুলো অন্য বছরের চাইতে অনেকগুণ টেকসই ও মজবুত করে নির্মাণ করা হয়েছে। স্থানীয় লোকজন যদি এসব বাঁধ রক্ষায় এগিয়ে আসেন তাহলে আগামীতে অনেক জায়গায় বাঁধ দিতে হবে না, এবারের বাঁধগুলো তারা রাস্তা হিসেবে সব সময় ব্যবহার করতে পারবেন। এসব বাঁধ রক্ষায় সমন্বিত পরিকল্পনা ও উদ্যোগ গ্রহণ করতে হবে। ’



আরো খবর