বাংলাদেশে করোনা পরিস্থিতি ও হার্ড ইমিউনিটি তত্ত্ব

কামরুল জাহাঙ্গীর

৮ মার্চের পর ইতোমধ্যে ৫৪ দিন অতিক্রান্ত হতে চলেছে। প্রতিদিনই গড়ে ৫ হাজারের মত নমুনা পরীক্ষা করে ৫ শ’র কিছু নীচে করোনা পজিটিভ রোগী পাওয়া যাচ্ছে। বৃহস্পতিবার (৩০ এপ্রিল) পর্যন্ত ৬৪ হাজার ৬৬৬ টি নমুনা পরীক্ষা করে ৭ হাজার ৬৬৭ রোগী চিহ্নিত হয়েছে করোনা পজিটিভ হিসাবে। আক্রান্তের হার ১১.৮৫ শতাংশ। আক্রান্ত রোগীর শতকরা হার ১২ এর ঘরে আটকে আছে বহু দিন ধরে। সর্বশেষ ১৯ এপ্রিল আক্রান্তের হার ছিল ১১ এর ঘরে অর্থাৎ ১০.৩০%। এর পরের ১১ দিনের আক্রান্তের পরিসংখ্যানটি এরকম–১১.০৮%, ১১.৪৩%, ১১.৫৪%, ১১.৫৯%, ১১.৭৮%, ১১.৫৯%, ১১.৬২%, ১১.৭৩%, ১১.৮০%, ১১.৮৯% ও ১১.৮৫%।
এটি যদি গ্রাফ আকারে প্রকাশ করা যায় দেখা যাবে, এক/দুই দিন ছাড়া বাকি সবগুলো দিনেই আক্রান্ত-রেখাটি দীর্ঘ হয়েছে। এই প্রবণতা অব্যাহত থাকলে অচিরেই আক্রান্তের হার ১২ এর ঘর ছাড়িয়ে ১৩ তে কিংবা এরও উপরে পৌঁছে যাবে। তাই করোনা দুর্যোগের ঝুঁকি আমাদের দেশে এখনও ক্রমবর্ধমান অবস্থায় রয়েছে। উদ্বেগের জায়গাটুকো এখানেই।

পৃথিবীর উন্নত দেশ তো বটেই, দক্ষিণ এশিয়ার দেশগুলোর তুলনায়ও বাংলাদেশে করোনা পরীক্ষার পরিমাণ অনেক কম। পরীক্ষা বাড়লে আক্রান্তও বাড়বে তাতে সন্দেহ নাই। এখন কম হলেও প্রতিদিনই টেস্ট বাড়ছে। টেস্ট বাড়ার পাশাপাশি সমান তালে আক্রান্তও বেড়ে যাচ্ছে। এ কারণেই টেস্ট বাড়ানোর উপর সকলেই গুরুত্ব দিচ্ছেন। বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থাও অনবরত টেস্ট বাড়ানোর উপর গুরুত্ব দিচ্ছে। বর্তমানে টেস্ট করার ক্ষেত্রে কেবল আরটি-পিসিআর পদ্ধতির উপরই নির্ভর করা হচ্ছে। এই পরীক্ষা পদ্ধতি একদিকে যেমন ব্যয়বহুল (প্রতি টেস্টে প্রায় ৪ হাজার টাকা খরচ হয়, যদিও এই খরচটি এখন পর্যন্ত সরকারই বহন করছে, তবে শেষ অর্থে ওই টাকাও জনগণেরই বটে) তেমনি এটি উন্নত ল্যাব ও ট্যাকনলজিস্ট নির্ভর। এই টেস্ট করে রেজাল্ট পেতে ন্যূনতম ২ দিন লেগে যায়। অন্যদিকে সংগৃহীত নমুনা (মুখ ও নাকের লালা) পরীক্ষাকালীন পর্যন্ত যথাযথ মান বজায় রাখতে পারছে কিনা তাও আরেক প্রশ্ন। নমুনা সংগ্রহ থেকে টেস্ট সম্পন্ন হওয়া পর্যন্ত মাঝখানে ঠিক কতটা সময় ক্ষেপণ করা হচ্ছে অনেক ক্ষেত্রে সেটি বুঝা যায় না। অনেককেই ৭ বা তার বেশি দিন আগে নমুনা দিয়েও রিপোর্টের জন্য আইইডিসিআর’র অফিসে ধর্ণা দিতে দেখা যায়। আর এ কারণেই দ্রুত সময়ে টেস্ট করার বিকল্প পদ্ধতির আগ্রহ বিশ্বজুড়ে।

অনেক দেশ এন্টিবডি টেস্টের নামে রেপিড টেস্টের দিকে ঝুঁকেছিল। আবার ওই পদ্ধতির নানা সীমাবদ্ধতার কারণে এন্টিবডি টেস্ট থেকে ফিরেও এসেছে। এমন এক সময়ে বাংলাদেশের গণস্বাস্থ্য কেন্দ্র দাবি করল, তারা এমন একটি রেপিড টেস্ট ব্যবস্থা আবিষ্কার করেছে যা পৃথিবীর অন্যান্য রেপিড টেস্ট থেকে আলাদা। তারা একে একইসাথে এন্টিবডি ও এন্টিজেন টেস্ট হিসাবে আখ্যায়িত করল। এর নাম দিল কোভিড ডট ব্লট। এই প্রকল্পের প্রধান বিজ্ঞানী ড. বিজন কুমার শীলের অতীত সুনাম ও সফলতার কারণে গণস্বাস্থ্য উদ্ভাবিত রেপিড টেস্ট কিটের বিষয়ে বিশেষজ্ঞ ও সাধারণ মানুষের এক ধরনের উচ্চাশা তৈরি হল। এই উচ্চাশা আরও বেড়ে গেল যখন সংবাদ সম্মেলন করে গণস্বাস্থ্য দাবি করল, তাদের উদ্ভাবিত কিটের সফলতা আরটি-পিসিআর এর সমতুল্য এবং খরচ একেবারেই সকলের হাতের নাগালে। কিন্তু এখানে এসে বাধ সেধেছে আমলাতান্ত্রিক নাক উঁচু ভাব, ব্যক্তিগত রেষারেষি ও জটিলতা। জরুরি সময়ে যেখানে পদ্ধতিগত প্রক্রিয়া সহজ করার কথা সেখানে ঔষধ প্রশাসন অধিদপ্তর তথা স্বাস্থ্য মন্ত্রণালয় নিয়ম ও প্রক্রিয়ার দোহাই দিয়ে গণস্বাস্থ্য উদ্ভাবিত কিটের ক্লিনিক্যাল ট্রায়াল আটকে রেখেছে। গণস্বাস্থ্যের উদ্ভাবনটি সত্যিই তাদের দাবি মত হয় তাহলে এটি নিশ্চিতভাবেই এই দুর্যোগকালে হতে পারে শুধু বাংলাদেশ নয় পুরো বিশ্বের জন্য অনেক আশির্বাদ স্বরূপ। আরটি-পিসিআরের তুলনায় এই কিট দিয়ে টেস্ট করার খরচ অতিশয় নগন্য। ড. জাফরুল্লার মতে সর্বাধিক ৩ শ’ টাকা। পিসিআর ও গণস্বাস্থ্য কিটের খরচের অনুপাতটা এরকম ৪০০০:৩০০। খরচের এই স্বল্পতার পাশাপাশি এর ব্যবহার প্রক্রিয়াও সাদামাটা। গণস্বাস্থ্য বলছে এটি রক্তের গ্রুপ নির্ণয়ের মতই সহজ। বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থা যেখানে টেস্টের পরিমাণ বাড়ানোর উপর ক্রমাগত তাগাদা দিচ্ছে সেখানে এই কিটের কার্যকারিতা পরীক্ষার প্রক্রিয়া আটকে রাখা নিঃসন্দেহে দুর্ভাগ্যজনক। ড. জাফরুল্লাহ এর পিছনে স্বাস্থ্য খাতের বিশাল বিস্তৃত দুর্নীতি ও রাজনীতির প্রসঙ্গ সামনে এনেছেন। কতিপয় স্বাস্থ্য বিশেষজ্ঞ যেভাবে পরীক্ষার আগেই এই কিটের বিরোধিতায় নেমেছেন তাতে মনে হতেই পারে তারা গণস্বাস্থ্যের কিটকে যেকোনো প্রকারে আটকে দিতে বদ্ধপরিকর। বাংলাদেশের অর্থনৈতিক সক্ষমতা বিবেচনায় গণস্বাস্থ্যের কিটটি কার্যকর হলে সেটি করোনা ব্যবস্থাপনায় যুগান্তকারী পরিবর্তন আনতে পারত। সাশ্রয় হত পিসিআর মেশিন ও কিট আমদানির জন্য ব্যয়িত বিপুল পরিমাণ বৈদেশিক মুদ্রা। অন্যদিকে এই কিটের আন্তর্জাতিক বাজার তৈরির উজ্জ্বল সম্ভাবনাও ছিল। বৈজ্ঞানিক উদ্ভাবনে বিশ্বসভায় বাংলাদেশের নাম উজ্জ্বল হওয়ার বিষয়টি না হয় বাদই দিলাম। তবে সর্বশেষ খবর হলো কিটটি বঙ্গবন্ধু মেডিক্যালে ক্লিনিক্যাল ট্রায়ালের অনুমোদন পাওয়া গেছে। আমরা চাইব, দ্রুত এই প্রক্রিয়া শেষ হোক এবং কার্যকর হলে ব্যবহারে আসুক।

করোনা পরিস্থিতিতে এখন পর্যন্ত বাংলাদেশের স্বস্তির জায়গা দুইটি। একটি এই ভাইরাস বাংলাদেশে এখনও মহামারীর মতো পরিস্থিতি সৃষ্টি করতে পারেনি। অন্যটি মৃত্যুর স্বল্প হার ধরে রাখা। মূলত আমেরিকা বা ইউরোপে করোনা যে প্রলয়ংকরী ও বিধ্বংসী চরিত্র নিয়ে হাজির হয়েছে, দক্ষিণ এশিয়ার দেশগুলোতে এখনও তেমন করে ভয়াবহ হয়ে উঠেনি। এটি যদি মহামারীর ভয়াবহতা নিয়ে হাজির হত, তাহলে টেস্ট হোক কি না হোক, সনাক্ত হোক কিংবা না হোক; চার পাশে মৃত্যুর ভয়াল বিস্তার লক্ষ করা যেত। কিন্তু দক্ষিণ এশিয়ায় সেরকমটি এখনও দেখা যায়নি। কেন ভাইরাসটি দক্ষিণ এশিয়া অঞ্চলে তার পূর্ণ মাত্রার সংহারী চরিত্র নিয়ে হাজির হতে পারেনি তার কোনো বৈজ্ঞানিক ব্যাখ্যাও কেউ হাজির করতে পারেননি। এই ভাইরাসের চরিত্র নিয়ে গবেষণাও এই অঞ্চলে কম। ভারত ব্যতীত আর কোনো দেশ গবেষণার ক্ষেত্রে উল্লেখ করার মতো কোনো কিছু দেখাতে পারেনি। ফলে এই অঞ্চলে আগত ভাইরাসের চরিত্রটি এখনও অব্যাখ্যাতই থেকে গেলো।

আরেকটি বিষয় লক্ষণীয়, বাংলাদেশ সহ দক্ষিণ এশীয় দেশগুলোতে কোনো লক্ষণ উপসর্গ ছাড়াই করোনা পজিটিভ পাওয়া যাচ্ছে প্রচুর পরিমাণে। এটি স্বস্তির নাকি উদ্বেগের বুঝা মুশকিল। একটি ব্যাখ্যা এরকম হতে পারে- ভাইরাসটি শরীরে অনুপ্রবেশ করলেও আক্রান্তকে সহজে কাবু করতে পারছে না। এই অনুপ্রবীষ্ট ভাইরাস দুর্বল চরিত্রের নাকি আক্রান্তের ইমিউনিটি লেভেল সহনীয় মাত্রার তা বুঝতে প্রচুর গবেষণা দরকার। যা কার্যত অনুপস্থিত। অন্য ব্যাখ্যাটি এরকম দাঁড়ায়- বহু মানুষের মধ্যে করোনার জীবানু রয়েছে কিন্তু লক্ষণ উপসর্গ না থাকায় তারা পরীক্ষার আওতায় আসার তাগিদ অনুভব করছেন না। এরা অবাধে ঘুরে বেড়াচ্ছেন। এই অবস্থা অতিশয় বিপদজনক। এই নিরব বাহকদের মাধ্যমে ব্যাপক জনগোষ্ঠীর আক্রান্ত হওয়ার ঝুঁকি প্রবল। ঝুঁকির এই জায়গায়ই রেপিড টেস্টের গুরুত্ব অপরিসীম। ব্যাপক আকারে সহজভাবে টেস্ট করতে পারলে ঝুঁকি কমানো সম্ভব হত।

বাংলাদেশে যে করোনার সংহারী ক্ষমতা কম তা আরেকটি প্রবণতা থেকে বুঝা যায়। সরকার ২৬ মার্চ থেকে সাধারণ ছুটি ঘোষণা করে সকলকে ঘরে থাকার পরামর্শ দিয়েছেন। ওই তারিখ থেকে গণপরিবহনসহ অফিস আদালত, মিল ফ্যাক্টরি, ব্যবসা বাণিজ্য বন্ধ করে দেয়া হয়। কিন্তু শুরু থেকেই মানুষের মাঝে ঘরের বাইরে বেরিয়ে আসার প্রবণতা লক্ষ করা যায়। হাট বাজার, পাড়া মহল্লা, গলিপথ সড়ক; সর্বত্রই লোক সমাগম লক্ষ করা গেছে শুরু থেকেই। প্রশাসন কোনোভাবেই অপ্রয়োজনে মানুষকে ঘরের বাইরে আসা ও সামাজিক বা শারীরিক দূরত্ব নিশ্চিত করতে পারেনি। এমনকি যেসব এলাকায় করোনাক্রান্ত লোক বেশি সেসব এলাকায়ও ঘরের বাইরে লোকারণ্য দেখা গেছে গণমাধ্যমের কল্যাণে। অর্থাৎ ঘরের বাইরে বের হওয়া ও বের হলে যে স্বাস্থ্যবিধি মানা আবশ্যক তা পরিপূর্ণভাবে পালন করা সম্ভব হচ্ছে না। বাংলাদেশের এই প্রেক্ষাপটে করোনার বিস্তার আরও প্রবল হওয়ার কথা ছিলো। কিন্তু আমাদের পর্যবেক্ষণ এই প্রাবাল্য আবিষ্কার করতে ব্যর্থ হচ্ছে। ভবিষ্যতে হয়তো এর বিস্তার বাড়তে পারে বা ভাইরাসের সংহারী চরিত্রও ফিরে আসতে পারে, আমার মতো সাধারণ মানুষ সেই ভবিষ্যৎবাণী করতে পারবে না।

উপরে বলেছিলাম আরেকটি স্বস্তির জায়গা হল, স্বল্প মাত্রার মৃত্যু হার। ৩০ এপ্রিল তারিখে শনাক্তকৃত রোগীর বিপরীতে মৃত্যু হার ২.১৯%। বৈশ্বিক বাস্তবতায় এই হার অনেক কম। এই তারিখে বাংলাদেশে মোট শনাক্ত ৭৬৬৭ ও মৃত্যু ১৬৮। একই সময়ে সারা বিশ্বে মোট শনাক্তের সংখ্যা প্রায় ৩২ লাখ। মৃত্যু ২.২৯ লাখ। মৃত্যু হার ৭.১৫%। স্পষ্টতই এই জায়গায় বাংলাদেশের অবস্থান অনেকটাই ভাল। এই কারণেই সম্ভবত সরকার বেশ স্বস্তিজনক অবস্থানে রয়েছে এবং চলমান লকডাউন অবস্থায় বেশ কিছু জায়গায় ছাড়ও দেওয়া শুরু করেছে। ইতোমধ্যে গার্মেন্টস খোলে দেয়ার মত সিদ্ধান্তটি এর বড় প্রমাণ। ঢাকা, গাজীপুর, নারায়নগঞ্জের মতো হটস্পটগুলোতে পোশাক শ্রমিকদের ভিড় বেড়েছে। অর্থনীতি সচল করার কথা বলে পোশাক কারখানা খোলার পরিণতি দেখতে আমাদের আরও কয়েক দিন অপেক্ষা করতে হবে। ইতোমধ্যে ইফতারি বিক্রির রেস্তুরাগুলোও খোলে দেয়া হয়েছে। রেলের পণ্যবাহী লাগেজ চালু ও ভারত থেকে আমদানিকৃত পণ্য খালাস ব্যবস্থাও চালু করা হয়েছে। আরও কিছু খাতে অচিরেই ছাড় দেয়ার আলামত দেখা যাচ্ছে। এখন পর্যন্ত সরকারের মনোভাব পর্যালোচনা করে বুঝা যায়, ৫ মে এর পর সাধারণ ছুটি প্রত্যাহৃত হয়ে যাবে। তবে সরকারের চূড়ান্ত অবস্থান আগামী সপ্তাহের শুরুতেই জানা যাবে।

কিন্তু আমার বিবেচনায় বাংলাদেশের সবচাইতে বেশি উদ্বেগের জায়গা হলো– অতিমাত্রায় নিম্ন সুস্থতার হার। সারা পৃথিবীর ঠিক উল্টো জায়গায় বাংলাদেশের অবস্থান। পুরো বিশ্ব জুড়ে আক্রান্ত ৩২ লাখের বিপরীতে সুস্থতার সংখ্যা ১০ লাখ, যেখানে মৃত্যু ২.২৯ লাখ। অর্থাৎ মৃত্যুর চাইতে সুস্থ হওয়া ব্যক্তির সংখ্যা প্রায় ৮ লাখ বেশি। মোট আক্রান্তের তুলনায় সুস্থতার শতকরা হার ৩১.২৫%। বিশ্বের এই সুস্থতার হারের বিপরীতে বাংলাদেশে সুস্থতার হার মোট আক্রান্তের বিপরীতে মাত্র ২.০৮%। বাংলাদেশে এখনও মোট সুস্থ হওয়া ব্যক্তির চাইতে মৃত্যু সংখ্যা বেশি। স্বাস্থ্য সংশ্লিষ্টরা বলতে চাইছেন, সুস্থ্য হতে কিছুটা সময় লাগে তাই এখন সুস্থতার পরিমাণ কম, যত দিন যাবে তত বাড়বে সুস্থ্য হওয়া ব্যক্তির সংখ্যা। এই কথার মধ্যে সত্যতা আছে। বাংলাদেশে সর্বাধিক আক্রান্ত হওয়ার প্রবণতার মেয়াদ এখনও ১৫ দিন অতিক্রম করেনি। আক্রান্তের সংখ্যা ১ হাজার অতিক্রম করেছে গত ১৪ এপ্রিল। সুতরাং সুস্থতার হার বাড়ার জন্য আমাদের আরও কিছুদিন অপেক্ষা করতে হবে।

এই নিবন্ধের শুরুতে হার্ড ইমিউনিটি সিস্টেম এর কথা বলা হয়েছিলো। হার্ড ইমিউনিটি কী? সুইডেন এই তত্ত্বটি বেশি প্রয়োগ করেছে। আমেরিকা, ব্রিটেনও প্রাথমিক অবস্থায় এই পথে হাঁটতে চেয়েছে কিন্তু পরে আবার সরে এসেছে। হার্ড ইমিউনিটি তত্ত্বের মূল কথা হলো রোগটিকে খুব বেশি পাত্তা না দেয়া। লকডাউন জোরদার না করে মানুষের চলাচল ও উৎপাদন ব্যবসা বাণিজ্যের সুযোগ অবারিত রাখা। এতে ভাইরাসটি গণহারে সংক্রমিত হবে। হয়তো ৬০ বা ৭০ শতাংশ মানুষ সংক্রমিত হয়ে পড়বে। এই সংক্রমিতদের অল্প একটি অংশ মারা যাবে। বৃহদাংশের শরীরে ভাইরাসের বিরুদ্ধে লড়াই করার মতো পর্যাপ্ত এন্টিবডি তৈরি হবে। এন্টিবডি তৈরির ফলে এরা নিজেরা যেমন সুস্থ হয়ে উঠবে তেমনি এদের দ্বারা সংক্রমনের বাইরে থাকা লোকজনের সংক্রমিত হওয়ার আশংকা থাকবে না। হার্ড ইমিউনিটি সিস্টেমটি একেবারে অল্প কথায় বলতে গেলে এরকমই।

এই তত্ত্বটির পিছনে অর্থনৈতিক ক্ষতি আটকানোর বিষয়টিই মুখ্য হয়ে উঠে। ধনবাদী বিশ্ব ব্যবস্থার এ হলো অমানবিক চেহারা। মানবিক দৃষ্টিভঙ্গিতে একজন নাগরিকের জীবনের দামও অনেক বেশি। কিন্তু হার্ড ইমিউনিটি তত্ত্ব মুনাফার স্রোত অবিরল রাখার কারণে উল্লেখযোগ্য সংখ্যক একটি জনগোষ্ঠীকে মৃত্যু ঝুঁকির মধ্যে ঠেলে দেয়। এমন অমানবিক অথচ চরম ঝুঁকিপূর্ণ পথ কোনো মানবিক রাষ্ট্রই সমর্থন করতে পারে না। আবার উল্টো করে চিন্তা করলে দেখা যায়, মাসের পর মাস ধরে অর্থনৈতিক কর্মকাণ্ড বন্ধ থাকলে ধনি ব্যবসায়ী, শিল্পপতিদের সাথে গরিব মানুষও ব্যাপকভাবে আক্রান্ত হবে। কর্ম ও জীবিকা হারিয়ে গরিব জনগোষ্ঠী অভাব ও দুর্ভিক্ষের শিকার হবে। কোনো রাষ্ট্রই বিশেষ করে আমাদের মতো দেশ মাসের পর মাস কর্ম ও জীবিকাহীন মানুষকে টানতে পারবে না। এরকম এক দ্বান্দ্বিক অবস্থাই হার্ড ইমিউনিটি তত্ত্বের প্রয়োগের পথ তৈরি করে থাকে।

বাংলাদেশ একটি ঘনবসতিপূর্ণ দেশ। প্রতি বর্গ কিলোমিটারে জন ঘনত্ব পৃথিবীর মধ্যে বাংলাদেশে সর্বাধিক। এখানে যদি করোনার সংক্রমণ গণহারে ছড়ানোর সুযোগ তৈরি করে দেয়া হয় তাহলে মৃত্যুর পাহাড় তৈরি হবে। ইতিহাসে যা মানবিকতার ঘৃন্যতম কলংক রূপে চিহৃিত হয়ে থাকবে।

আমাদেরকে অবশ্যই আরও কিছুদিন অবস্থা পর্যবেক্ষণ করতে হবে। লকডাউন অবস্থা এখনই শিথিল করার মতো আত্মঘাতি সিদ্ধান্ত পরিহার করতে হবে। বাংলাদেশে করোনার সংক্রমণ অবস্থার যে তুলনামূলক কম সংহারী চরিত্র আপাতত দেখা যাচ্ছে তার সুযোগ গ্রহণ করে একে দুর্বল হওয়ার জন্য সময় দিতে হবে। টেস্ট বাড়িয়ে করোনার নানামুখী প্রবণতার গবেষণালব্ধ তত্ত্ব ও তথ্যের মাধ্যমে মানবিকতাকে প্রাধান্য দিয়ে সিদ্ধান্ত গ্রহণ করতে হবে। মুক্তিযুদ্ধের মাধ্যমে আমরা যে স্বাধীনতা অর্জন করেছি সেখানে ন্যায়পরায়ণ দেশ গঠন ও সকল নাগরিকের সমানাধিকার নিশ্চিতের আকুতি প্রবল ছিল। স্বাধীনতার এই মূলমন্ত্রগুলোই আমাদের রক্ষাকবচ হতে পারে।