বাংলাদেশ পরিসংখ্যান ব্যুরোর তথ্য- শ্রমবাজারে কমছে যুবশক্তি

বাংলাদেশ পরিসংখ্যান ব্যুরোর জরিপের সর্বশেষ তথ্য অনুযায়ী, দেশে শ্রমশক্তির আকার বেড়ে হয়েছে ৬ কোটি ২১ লাখ। তবে শ্রমবাজারের সবচেয়ে অগ্রণী অংশ হলেও যুবশক্তির অংশগ্রহণ ১১ শতাংশ কমেছে। যদিও দেশের মোট শ্রমশক্তির এক-তৃতীয়াংশই ১৫-২৯ বছর বয়সী। কেউ এজন্য দায়ী করছে নিম্ন জন্মহারকে। আবার কেউ কেউ চিহ্নিত করছে শিক্ষা ব্যবস্থার উন্নতিকে। বিশ্বব্যাংকের ঢাকা কার্যালয়ের প্রধান অর্থনীতিবিদ বলেছেন, কর্মে নিযুক্ত ও কর্মহীনদের বাইরেও বড় একটি অংশ শ্রমশক্তির বাইরে রয়েছে। চাকরি খোঁজার মধ্যে রয়েছে এমন ডিসকারেজড মানুষকে শ্রমশক্তিতে হিসাবভুক্ত করা হচ্ছে না। এর মূল কারণ শিক্ষা ব্যবস্থা চাকরি বাজারমুখী নয়। তবে বিশাল যুবশক্তিকে কোনো ধরনের শূন্যতায় রেখে দেশের উন্নয়নের গতি ত্বরান্বিত করা অসম্ভব। আলোচনায় রয়েছে যুবশক্তি কমে যাওয়ার প্রসঙ্গটিও।
দুঃখজনক বিষয় হলো, আমরা বিপুল যুবসম্পদ কাজে লাগিয়ে দেশের উন্নয়ন করার আগেই বিশেষ সুবিধা হারাচ্ছি। তার কারণ, আমাদের যুবসমাজের এক বড় অংশই যথাযথ শিক্ষার সুযোগ পায় না। কায়িক শ্রমের অর্থনীতিতে তাদের অবদান রাখার জায়গা খুব বেশি কিছু রাখা হয়নি। শিক্ষা ও প্রশিক্ষণ পেলে তারা দেশের অর্থনৈতিক উন্নতি ত্বরান্বিত করতে পারে, এ বিষয়ে কোনো সন্দেহই নেই। পাশাপাশি অপুষ্টি এবং অস্বাস্থ্যও যুবসমাজের কর্মশক্তিতে নেতিবাচক প্রভাব ফেলছে। আগামী দিনের জন্য প্রস্তুত হতে হলে তাই যুবসমাজের উৎপাদনক্ষমতা ও উৎপাদনশীলতা বাড়াতে হবে। যাতে স্বল্প মানুষ অধিক লোকের ব্যয়ভার বহন করতে পারে। তার জন্য প্রয়োজন মানসম্পন্ন ও বাজারমুখী উচ্চশিক্ষা এবং যথাযথ প্রশিক্ষণ। রাষ্ট্র ও সমাজ দূরদর্শী এবং তৎপর না হলে ভবিষ্যৎ প্রজন্মকে তার দাম দিতে হবে বৈকি। বিশেষজ্ঞদের মতে, শ্রমবাজারে যে ধরনের দক্ষতা ও শিক্ষাগত যোগ্যতাসম্পন্ন কর্মী প্রয়োজন, সে অনুযায়ী কর্মীর চাহিদা পূরণ করতে পারছে না আমাদের প্রচলিত শিক্ষা ব্যবস্থা। তাদের মতে, কর্মমুখী শিক্ষা তথা সুশিক্ষায় শিক্ষিত করে তরুণসমাজকে যেকোনো ধরনের কাজে নিয়োজিত করার উপযোগী করে তুলতে হবে।
অর্থনৈতিক প্রবৃদ্ধি অর্জন বলি আর দেশকে উন্নয়নের মহাসড়কে নিয়ে যাওয়ার কথাই বলি, তা এ বিশাল কর্মক্ষম জনগোষ্ঠীকে কর্মহীন রেখে বাস্তবায়ন করা আদৌ সম্ভব নয়। তাছাড়া দেশকে মধ্যম আয়ে উন্নীত করতে কেবল আশাবাদ ও উচ্চাভিলাষী পরিকল্পনা থাকলে হবে না। একে বাস্তবসম্মত ও কর্মসৃজনযোগ্যও করতে হবে। এজন্য বিদ্যমান শিক্ষা ব্যবস্থাকে কর্মমুখী করাও জরুরি। কেননা মোটাদাগে প্রচলিত শিক্ষা ব্যবস্থা যুবশক্তির অন্তর্নিহিত মেধা বা শক্তির বিকাশ ঘটিয়ে তাদের বর্তমান বাজার অনুযায়ী দক্ষ করে তুলতে সক্ষম নয়। উপরন্তু, সরকারি-আধা সরকারি ও স্বায়ত্তশাসিত প্রতিষ্ঠানে মোট অনুমোদিত পদের বিপরীতে যে কয়েক লাখ পদ শূন্য আছে তা সর্বাগ্রে পূরণ করতে হবে। দেশ উন্নতি লাভ করছে বিধায় প্রয়োজনে সেসব পদের সংখ্যা বাড়ানোও অযৌক্তিক হবে না। অন্যদিকে বেসরকারি খাতে আনুষ্ঠানিক কর্মসংস্থান বাড়াতে জ্বালানি ও অবকাঠামোগত প্রতিবন্ধকতা দূরীকরণের পাশাপাশি শিল্পোন্নয়নসহ সার্বিকভাবে বিনিয়োগবান্ধব পরিবেশের উন্নতি সাধনও প্রয়োজন।
সরকারি দপ্তরে সামান্য সংখ্যক পদের বিপরীতে কয়েক হাজার আবেদন পড়তে দেখা যায়। আর প্রায় প্রতি ক্ষেত্রেই দক্ষ শক্তিকে উপেক্ষা করে তদবিরবাজদের নিয়োগ চোখে পড়ে। এতে আমাদের যুবশক্তিকে ঠিকমতো কাজে লাগানো যাচ্ছে না। যুবশক্তিকে ঠিকমতো কাজে লাগানো সরকারের একটি অন্যতম চ্যালেঞ্জ হওয়া উচিত। সরকারের উচিত এদের জন্য বহুমুখী কর্মখাত সৃষ্টি এবং তাদের অর্জিত শিক্ষা, কায়িক ও মানসিক উদ্ভাবনী শক্তিকে পুরো সদ্ব্যবহার করা। সরকারের গবেষণাভিত্তিক প্রতিষ্ঠানগুলোকে নতুন নতুন কর্মক্ষেত্র সৃষ্টি করতে হবে; তাহলে দেশে শিক্ষিত যুবশক্তির বেকারত্বের হার কমে আসবে এবং এদের পূর্ণ ব্যবহারে দেশ অর্থনৈতিকভাবে উপকৃত হবে। আর তা করতে ব্যর্থ হলে এ শক্তিই একদিন জাতির ঘাড়ে বোঝা হয়ে দাঁড়াবে।