বাংলার শরত

প্রমোদ রঞ্জন সরকার
কয়েক দিন আগে আমাদের সময়ে বর্ষাকাল নিয়ে লিখেছি। আজ তারই ধারাবাহিকতায় বাংলার শরত নিয়ে কিছু লিখার প্রয়াস। স্বপ্ন ও শুভ্রতার প্রতীক হয়ে শরত আসে। বর্ষার অঝোর ধারার পর শরতের সতেজ মাটিতে গাছপালা খোঁজে পায় ঝলমলে রোদ। শিশিরে শিশিরে দুর্বা ঘাসে আল্পনা জাগে। শরতের শান্ত প্রকৃতির গাঢ় নীল আকাশ, সাদা কাশফুল আমাদের দেহ মনে প্রশান্তি আনে। তখন হৃদয়ে বয়ে যায় এক আনন্দের দোলা ।
শরতে কখনো নীল আকাশ কখনো তুলোর মত ভেসে বেড়ানো সাদা মেঘ। এর সাথে ব্রহ্মপুত্র যমুনার দিগন্ত ছোঁয়া কাশ ফুলের মন মাতানো দৃশ্য আমাদেরকে নিয়ে যায় দিগদিগন্তের পানে। ফোটে দোলনচাঁপা, বেলি, শিউলি, শাপলা, ঝিনুক, পদ্ম ফুলের অবারিত সৌন্দর্য। যা আমাদের মনে করিয়ে দেয় শরতের আগমন ।
শরতে আকাশে সাদা মেঘের ভেলার ফাঁকে ফাঁকে নীল আকাশ দেখা যায়। তখন মনে হয় সারা আকাশ যেন নীলিমায় নীল। বাংলার নদীর চরসহ নদী তীরে ফোটে অগণিত সাদা কাশফুল। যা দেখে শিশু জয়নাল আবেদীন পরিণত বয়সে শিল্পাচার্য্য জয়নুল আবেদীন হয়েছিলেন। কাশ বনের শুভ্র বাংলার রূপ আমাদের হৃদয় মন ছুঁয়ে যায়। বাতাসে ঢেঊ খেলে সেই কাশের সারি। যা দেখে আমাদের মাঝে মায়াবী স্বর্গীয় অনুভূতি ছড়িয়ে পড়ে। বাংলা সাহিত্যে কাশ ফুলের রয়েছে এক সুদৃঢ় অবস্থান। বিভূতি ভূষণ বন্দোপধ্যায়ের পথের পাচালির শিশু অপু ও দূর্গার কাশ বনের ভিতর দিয়ে দৌঁড়ে যাওয়ার দৃশ্য প্রখ্যাত চলচিত্রকার সত্যজিৎ রায় তারঁ ক্যামেরায় ধারণ করেছিলেন। যা দুর্লভ ও নৈসর্গিক। যাঁরা পথের পাচালি একবার দেখেছেন তাঁদের মানসপটে সেই চিত্রটি আজো ভেসে উঠে।
ভাদর আশ্বিন মাসের প্রকৃতিতে শরত আকাশ জুড়ে সাদা পাল তোলা নৌকার মত সাদা মেঘের ভেলা হয়ে ঘুরে বেড়ায়। শরতের ভাদ্র মাসে প্রচন্ড গরম পড়ে। বাতাস চলাচল প্রায় থাকে না বললেই চলে। বাংলার হাওরাঞ্চলে একে বলে তাল নিরাগ। তাল নিরাগ হচ্ছে প্রকৃতি এত শান্ত থাকে যে গাছের পাতাটিও নড়ে না। হাওরের জল একেবারে স্থির থাকে। আগেকার দিনে এই সময় টিতে মাছ শিকারীদের আমন ক্ষেতে কোচ দিয়ে মাছ শিকারে ব্যস্ত সময় পার করতে দেখেছি।
এই গরমে তাল পাকে বলে তাল নিরাগ শব্দটির উৎপত্তি। বাংলার ঘরে ঘরে তখন তালের রসের পিঠার ধুম পড়ে।
বাংলার জলাশয় তখন এক অপরূপ রাজ কন্যার সাজে সজ্জিত হয়। নানারকম ও নানা রংয়ের শাপলা, ঝিনুক, পদ্মসহ শতাধিক প্রকারের জলজ ফুল বাংলার প্রকৃতিকে এক অনাবিল সৌন্দর্য প্রদান করে। যা দেখে মানব মন বিমোহিত হয়। মনের অজান্তে এক অপরূপ শিহরণ শরীর মনকে আচ্ছন্ন করে রাখে। বিমল আনন্দে চিত্ত ভরে উঠে। আমার শৈশবে নৌকায় মামার বাড়ি যেতে যেতে পথে কিশোরগঞ্জের তাড়াইলের দামিহারপর হাওরে (বিলে) কয়েক মাইল জুড়ে শুধু নানা রঙের জলজ ফুলের যে সৌন্দর্য আমি সে দিন প্রত্যক্ষ করেছিলাম তা আজো চোখে জ্বলজ্বল করে ভাসে। সেই দৃশ্য ভোলার নয়। মনে হয় এই তো সেদিন। আর এখন জীবনের পড়ন্ত বেলার দিকে ধাবিত হচ্ছি। এতো রাশি রাশি থরে থরে সৌন্দর্য অমরাবতীতেও আছে কিনা সন্দেহ আছে।
শরতের মেঘ নীল আকাশে ঘুরে বেড়ায় যখন তখনই আশ্বিনে আসে হিন্দু সম্প্রদায়ের সবচেয়ে বড় ধর্মীয় উৎসব দুর্গাপূজা। তখন বাংলার পূজামন্ডপগুলো অপরূপ সাজে সেজে উঠে। দেবী পক্ষে কৈলাস শিখর থেকে দেবী দুর্গার আগমনী বার্তায় হিন্দুদের ঘরে ঘরে থাকে উৎসবের আমেজ। শহর গ্রাম সবখানে পূজার আনন্দের ঢেউ লাগে। ধর্ম যার যার কিন্তু উৎসব সবার। এই উৎসবকে ঘিরে বাংলার হিন্দু মুসলমান, বৌদ্ধ খ্রিষ্টান, পাহাড়ি বাঙ্গালি সবাই আনন্দে মেতে উঠে। হাজার বছরের আবহমান বাংলার স্বতস্ফূর্ত রূপ এটিই। সে এক অন্য অনুভূতি। সবাই মিলে বাংলার উৎসব ভোগ করার। ঋতুর রাজা বসন্ত হলেও শরতের রূপ মাধুর্য কোন অংশে কম নয়। হঠাৎ হঠাৎ কোন এক অশুভ শক্তি এখানে খামছে ধরতে চেষ্টা করে। তারা বাংলার চিরায়ত রূপ তথা পনের শত বছর আগে কবি চন্ডী দাসের লেখা কবিতা “শোন হে মানুষ ও সবাই/ সবার উপরে মানুষ সত্য / তারঁ উপরে নাই”। এই বাণী মিথ্যা প্রমাণ করতে মরিয়া হয়ে উঠে। এরা মৌলবাদ প্রচার করে মানুষে মানুষে বিভেদ সৃষ্টি করতে চেষ্টা করে।
আশ্বিন হচ্ছে শরতের সমাপ্তি কাল। প্রকৃতি থাকে তখন সবুজে ঢাকা। ধানের সবুজ চারা বাতাসে তখন দোল খায়। ধান ক্ষেতে বাতাস ঢেউ খেলে যায়। তখন নীল সবুজ, সোনালী শরতের রং। আমরা দেখি নীল আকাশ, সোনালী সূর্য আর সবুজ মাঠ। তখন দিবা রাতের দৃশ্য প্রায় একই রকম থাকে। আশ্বিনে হাওরের পানিতে সূর্যাস্তের দৃশ্য খুবই নয়নাভিরাম। তখন কি এক অজানা আর্কষণে আকাশের চাঁদ নেমে আসতে চায় এই মাটির পৃথিবীতে। চাঁদনী রাতে হাওরের স্বচ্ছ পানিতে মাটি পর্যন্ত দেখা যায়। চাঁদের আলো এতই ঝলমলে হয় যা আর কখনো দেখা যায় না। সেই ঝলমলে আলো দেখার বাসনা নিয়ে আমার প্রাক্তন সহকর্মী বন্ধু লেখক কবি কুমার সৌরভ লিখেছেন হৃদয় নিংড়ানো সেই কবিতা- যেতে দাও ভরা পূর্ণিমায়:-
“আকাশে আজ আলো ফুটবে নাচবে হাওর
রাতের বন্দীত্ব ছেড়ে আসবে পাখির দল
এখানে ডানা মেলা আলোর ধুলো
বিলুপ্ত প্রায় মাছেদের পৌঁছে দিবে অভয় বাণী
আমি সেই আলোর সা¤্রাজ্যে যাব
দোহাই আমার পথ আটকে রেখো না
পূর্ণিমার মায়া ভরা প্লাবন থেকে আমাকে কেড়ে নিওনা”।
কবি গুরু রবীন্দ্রনাথ ঠাকুর তাঁর ঋতু ভাবনায় শরত নিয়ে রচনা করেছেন অসংখ্য কবিতা ও গান। শরতের প্রকৃতিতে থাকে রোদ ছায়ার খেলা। তাইতো কবি গেয়েছেন “আজি ধানের ক্ষেতে রৌদ্র ছায়ায়/
লুকোচুরির খেলারে ভাই লুকোচুরির খেলা/
নীল আকাশে কে ভাসালো সাদা মেঘের ভেলারে ভাই সাদা মেঘের ভেলা/ আজি ধানের ক্ষেতে——–”।
শরতের এই রোদ ছায়ার খেলা আমাদের মনে প্রভাব ফেলে। ঘন নীল আকাশ গুচ্ছ গুচ্ছ সাদা মেঘ, কাশবন, শিউলির হালকা মৃদু মন্দ সৌরভে শরতের রূপে বাঙ্গালি মাত্রই মুগ্ধ হয়।
হিন্দু শাস্ত্র অনুযায়ী আলতা সিঁদুর পবিত্রতার প্রতীক। ধারণা করা হয় যে সিঁদুর আলতার লাল রং আর বাংলার কাশ বনের সাদা এ থেকেই দুর্গাপূজায় এসেছে এই লাল সাদার আধিক্য।
জননী জন্মভূমি ছেড়ে পনের হাজার মাইল দূরে এই মহা অতলান্তিক তীরে (বিদেশ বিভুঁইয়ে) বসে কল্পনায় শরতের রূপ উপভোগ করি। আমার মত প্রবাসে প্রতিটি বাঙালির মন কাঁদে দেশের জন্য। হৃদয়ে শুরু হয় রক্তক্ষরণ। সবাই শরত আনন্দ উপভোগ করুক এই হোক কামনা।
নিউইয়র্ক/সেপ্টেঃ/২৭/২০১৯।
লেখক: আমেরিকা প্রবাসী।