বাংলা নববর্ষের সাংস্কৃতিক তাৎপর্য

ইকবাল কাগজী
লেখা আরম্ভের আগেই সাড়ম্বরে শিরোনামটা উৎকীর্ণ করে দিলাম। কিন্তু কানার মনে মনে জানা, ‘বাংলা নববর্ষের সাংস্কৃতিক তাৎপর্য’ বিষয়ে যাকে বলে একেবারে নতুন কোনও তত্ত্বতথ্য পাঠকের কাছে পেশ করার অবকাশ আপাত নেই। যা-কীছুই লিখি না কেন তা চর্বিতচর্বণের বেশি কীছু হবে না। কারণ বাংলা নববর্ষের বিষয়ে ইতোমধ্যে বাংলাসাহিত্যের লেখালেখির দিগন্ত এতোটাই বিস্তৃতি লাভ করেছে যে, তার বাইরে এমন কোনও অচর্চিত বিষয় এখন এই একবিংশ শতাব্দীর দ্বিতীয় দশকের শেষ দিকে এসে বোধ করি পাওয়া যাবে না, বরং বিপরীতে কারও পক্ষে ব্যতিক্রমী কীছুর সন্ধান পাওয়া যাবে এমন আশা করা বাতুলতা মাত্র। যা-কীছুই বলি না কেন, যে-ভাবেই বলি না কেন, সর্বশেষ বিবেচনায় দেখা যাবে আমার পরিবেশিত বক্তব্য কেউ না কেউ ইতোমধ্যে কোথাও না কোথাও উদগীরণ করে দিয়েছেন। যদিও আমি হয় তো পড়িনি, কিংবা কারও কাছে শুনিনি। তারপরেও যে-কেউ এই অপবাদে দিয়ে বসতে পারেন যে, আমি জেনেবুঝে বেমালুম অন্য কারও লেখা বা লেখার ভাবার্থ চুরি করে নিয়েছি এবং আমার পক্ষ থেকে তা অস্বীকারেরও কোনও যৌক্তিকতার অবকাশ থাকবে না। অর্থাৎ সর্বসাকুল্যে অবস্থা এমন দাঁড়িয়েছে যে, বাংলা নববর্ষ সম্পর্কে লেখার মানেই অনিবার্য কুম্ভিলকবৃত্তির অপবাদ স্বেচ্ছায় ঘাড়ে নেওয়ার নামান্তর। কারণ আমি যা-ই লিখব কারও না কারও লেখার সঙ্গে, লেখায় পরিবেশিত বক্তব্যের সঙ্গে মিলে যাবার শতভাগ সমূহ সম্ভাবনা থেকেই যাবে। প্রতিবছর নববর্ষকে উপলক্ষ্য করে, নববর্ষ সম্পর্কে সুচিন্তিত ও গবেষণামূলক অজ¯্র লেখা বিভিন্ন পত্রপত্রিকায় প্রকাশিত হয়। আগেই বলেছি, নববর্ষ সম্পর্কে লিখতে গিয়ে কোনও অকর্ষিত এলাকা পেয়ে যাওয়ার সম্ভাবনা বলতে গেলে একেবারেই অসম্ভব। তবুও লিখছি। কুম্ভিলকবৃত্তির অভিযোগে অভিযুক্ত হয়ার সম্ভাবনাকে মনে মনে স্বাগত জানিয়েই। সম্পাদকের নির্দেশ, কী আর করা।
বৈশাখের প্রথম তারিখে উভয়বঙ্গে বাংলা নববর্ষ উদযাপিত হয় সাড়ম্বরে। কিন্তু বাংলাদেশে বাংলা নববর্ষ উদযাপনের একটা আলাদা সাংস্কৃতিক তাৎপর্য আছে, সেটা যেমন ঐতিহাসিক তেমনি রাজনীতিকও বটে। পহেলা বৈশাখ মূলত ঋতুবৈচিত্র্যের নিরীখে কৃষিভিত্তিক জনগোষ্ঠীর মানুষের জীবনে বছর শুরুর একটি দিন। বৃহত্তর বাঙালি সমাজে সাধারণত এভাবেই এটি উদযাপিত হতো। কিন্তু পাকিস্তানি ঔপনিবেশিক কালপর্বে তৎকালের পূর্বপাকিস্তানের রাজনীতিক বাস্তবতায় পহেলা বৈশাখের প্রাকৃতিক নিয়ন্ত্রণনির্ভর ঋতুভিত্তিক সহজ উৎসবটি রাজনীতিক চারিত্র্য অর্জন করে এবং অচিরেই একটি রাজনীতিক-সাংস্কৃতিক প্রপঞ্চ হিসেবে বিশেষ করে বাংলাদেশের বাঙালি মুসলমানের জীবনচর্চায় আবির্ভূত হয় এবং সমাজ বিকাশের ঐতিহাসিক দ্বান্দ্বিকতার নিয়মানুসারেই বাঙালি জাতিসত্ত্বার ইতিহাসের অবিচ্ছেদ্য অঙ্গ হয়ে উঠে। এখন বিষয়টা এমন দাঁড়িয়েছে যে, কেউ যদি বাংলাদেশের বাঙালির জীবন থেকে পহেলা বৈশাখের সাংস্কৃতিক প্রপঞ্চকে উচ্ছেদ করার বাসনা পোষণ করেন, তা হবে বাঙালি জাতিসত্ত্বাকে উচ্ছেদ করার দুরভিসন্ধির নামান্তর, কিংবা পাকিস্তানিরা পূর্ববাংলার বাঙালির জীবন থেকে বাংলাভাষা উচ্ছেদের যে ষড়যন্ত্র করেছিল সেই ঐতিহাসিক অবিমৃষ্যকারিতার মতো আর একটি ভয়ঙ্কর ঘটনা। মনে রাখতে হবে, বাঙালির দুইট চোখ, একটি ধর্ম আর একটি ধর্মনিরপেক্ষতা। পহেলা বৈখাখের উৎসব ধর্মনিরপেক্ষতার প্রতীক, এটিকে বাদ দিলে বাঙালি অবশ্যম্ভাবীভাবে একটি একচোখা দৈত্যে পরিণত হবে, এই অঙ্গহানি কারও কাম্য হতে পারে না, এবং বাঙালির এইরূপ বিকলাঙ্গতা কারও কাম্য হলে তা কোনও যুক্তিতেই বিবেচনা প্রসূত বলে গণ্য হবার নয়। মনে রাখতে হবে বাংলাভাষা উচ্ছেদের ষড়যন্ত্রীদের ইতিহাস ক্ষমা করেনি, তাদের পরিণতি ভাল হয়নি।
বাঙলাদেশের বাঙালির জীবনসংস্কৃতিতে ইসলামধর্মের অবিচ্ছেদ্যতার একটি ঐতিহাসিক বিকাশ আছে, সে-বিকাশ এমনি এমনি সংঘটিত হয়ে যায়নি। মনে রাখতে হবে, এখানকার মানবসমাজের মধ্যে কার্ল মার্কস কথিত ‘হীন, অনড় ও উদ্ভিদ-সুলভ জীবন’, যাকে বলে বিকাশবিরহিত এক ‘নিষ্ক্রিয় ধরনের অস্তিত্ব’ময় জীবন অতীতে বিদ্যমান ছিল। যে-সমাজকে তিনি (কার্ল মার্কস) বলেছেন, ‘কুসংস্কারের অবাধ ক্রিড়নক’, ‘চিরাচরিত নিয়মের কৃতদাস’, এবং যাদের ‘সমস্ত কিছু মহিমা ও ঐতিহাসিক কর্মদ্যোতনা’ ইতোমধ্যে হরণ করা হয়েছে, ‘তারা ডুবছে দুর্দশার এক সমুদ্রে’। ইতিহাস নির্ধারিত এই অধঃপতিত সমাজে এক অভূতপূর্ব ঐতিহাসিক জাগরণ ঘটলো, গৌড়রাজের সঙ্গে রক্তক্ষয়ী সংঘর্ষে হযরত শাহজালালের বিজয় অর্জনের পর এবং বাংলাদেশের বাঙালির জীবনে ইসলামধর্মের কল্যাণস্পর্শ অবিচ্ছেদ্য হয়ে উঠলো ঐতিহাসক বিকাশের অনিবার্য নিয়মে। এই নিরীখে বলা যায়, বাঙালি মুসলমানকে ধর্ম থেকে বিচ্ছিন্ন করা আর তাকে হত্যা করা একই কথা। কিন্তু পাকিস্তানি ঔপনিবেশিকরা বাঙালি মুসলমানের মানবিক জাগৃতির মহৎ জীবন দর্শন ইসলাম ধর্মকে হাতিয়াররূপে ব্যবহার করেই তাদেরকে (বাঙালি মুসলমানকে) নিক্ষেপ করতে চেয়ে ছিল হযরত শাহজালাল তাদেরকে যে ডুবন্ত অবস্থা থেকে একদা উদ্ধার করেছিলেন সেই পঙ্কিল অধঃপতনের সমুদ্রে। বাঙালিরা, বিশেষ করে বাঙালি মুসলমানরা, পাকিস্তানি ঔপনিবেশিকদের সর্বনাশা আক্রমণকে সেদিন প্রতিরোধ করেছিল বাঙালি জাতিসত্ত্বার ভিতরে নিহিত পহেলা বৈশাখের উৎসবের ধর্মনিরপেক্ষ সাংস্কৃতিক শক্তির উদ্বোধন ঘটিয়ে এবং সেটাকে অব্যর্থ অস্ত্র হিসেবে ব্যবহার করে। তখন বাঙালির পক্ষে নিজেকে রক্ষা করার আর কোনও সাংস্কৃতিক অস্ত্র ছিল না, হাতের কাছে, বলা বাহুল্য ধর্মের অস্ত্রটি ছিল পাকিস্তানিদের দখলে। তখন রাজনীতিটা হয়ে গিয়েছিল এমনই, যাকে বলে, ধর্মকে ব্যবহার করে অন্য জাতিসত্ত্বাকে বিনাশের অশুভ রাজনীতি। পূর্ববাংলার উপর পাকিস্তানিদের এই আক্রমণ সাধারণ কোনও আক্রমণ ছিল না, এই আক্রমণ ছিল হযরত শাহজালালের প্রচারিত ইসলাম ধর্মের স্পর্শে জারিত হয়ে গড়ে উঠা নতুন এক জাতিসত্ত্বা, যে-জাতিসত্ত্বা বিশ্বইতিহাসে বাঙালি জাতিসত্ত্বা পরিচয়ে বিখ্যাত, সে জাতিসত্ত্বাকে সমূলে বিনাশ করার ন্যক্কারজনক ও খতরনাক এক পরিকল্পনা। পাকিস্তানিদের সে-আক্রমণটা যেমন ছিল যুগপৎ পূর্ববাংলার বাঙালি মুসলমানের ধর্ম ও জাতিসত্ত্বার বিরুদ্ধে। ভুলে গেলে চলবে না, বাঙালি মুসলমানের জাতিসত্ত্বা নিজের অভ্যন্তরে যে-ধর্ম লালন করে তার নাম ইসলাম, যে-ধর্মটিকে বাঙালি মুসলমানের জাতিসত্ত্বা থেকে আলাদা করে নেওয়ার কোনও অবকাশ নেই, একটিকে ছাড়া অন্যটির অস্তিত্ব কল্পনাও করা যায় না। কিন্তু পাকিস্তানি ঔপনিবেশিকরা সেই অসম্ভব বিষয়টিকে সম্ভব করে তোলতে চেয়েছিল। কিন্তু তারা কস্মিনকালেও ভাবতে পারেনি যে, বাঙালি মুসলমানের জন্য সেটা হবে নিজের মৃত্যুকে আলিঙ্গন করা এবং সেটা বাঙালি মুসলমানের দ্বারা কীছুতেই সম্ভব নয়, ধর্ম ও ধর্মনিরপেক্ষতা একসঙ্গে দুইটিই তার চাই, এই দুইটিতেই তার প্রাণের তার বাঁধা।
১৯৪৭ সালে পাকিস্তানি স্বাধীনতার পর পরই পাকিস্তানি উপনিবেশিকরা বাংলাভাষার বিরুদ্ধে সুদূর প্রসারী ষড়যন্ত্র শুরু করে। রাষ্ট্রভাষার দাবিতে পূর্ববাংলায় আন্দোলন শুরু হয়। প্রতিরোধের পরিপ্রেক্ষিতে একুশে ফেব্রুয়ারির বিয়োগান্তক ঘটনা সংঘটিত হয়। ষাটের দশকে রেডিও-টিভিতে রবীন্দ্রসঙ্গীত প্রচার বন্ধ করে দেয়া হয়। এইসব ভাষাসাংস্কৃতিক ষড়যন্ত্রের অন্তরালে সম্পদপাচারসহ উন্নয়নবঞ্চনা ও চাকরির নিয়োগাদিতে আকাশপাতাল বৈষম্য তীব্র থেকে তীব্র হতে থাকে। এককথায় পূর্বপাকিস্তান পশ্চিম পাকিস্তানের একটি প্রদেশ নয় বরং বাস্তবে পরিপূর্ণরূপে একটি উপনিবেশে পরিণত হয়। এইরূপ একটি সঙ্কটাপন্ন সময়ে বাঙালির, বিশেষ করে বাঙালি মুসলমানের ব্যাপক অংশগ্রহণের ভিত্তিতে রমনার বটমূলে পহেলা বৈশাখ পালনই তৎকালের পূর্ববাংলার মানুষের প্রতিবাদের ও পাকিস্তানের অন্যায়কে ঘৃণা জানাতে সাংস্কৃতিক শক্তি অর্জনের সার্বজনীন হাতিয়ার হয়ে উঠে। বাঙালি মুসলমান দলে দলে পহেলা বৈশাখের উৎসবে সমবেত হতে থাকে, পরিবার পরম্পরায়। তাদের (বাঙালি মুসলমানের) দ্রোহী ধর্মসত্তা একাধারে মানবিক, রাজনৈতিক ও সাংস্কৃতিক দার্ঢ্য অজন করে। ধর্ম ও বাঙালিয়ানার এই দুই বিশেষ বৈশিষ্ট্যে সমোজ্জ্বল জাতীয়তাবাদী চেতনার আধারে পরিণত হয় পূর্ববাঙলার বাঙালি। আইয়ুব-ইয়াহিয়া-ভুট্টো পাকিস্তানি উপনিবেশিকরা দ্রোহী বাঙালির চেতনাজগতের এই সাংস্কৃতিক জাগরণকে অনুধাবণ করতে পারেনি। ধর্মনির্ভর রাজনীতিকরা এই চেতনার বিরুদ্ধে অবস্থান নিয়ে পহেলা বৈশাখে বাঙালির উৎসবের নিন্দাবাদে ব্যস্ত থাকেন। এই বিরোধিতা হিতে বিপরীত হয়ে দেখা দেয় এবং অচিরেই বাঙালি মুসলমানের পহেলা বৈশাখের উৎসব ঢাকাসহ সারা দেশে ঘরে ঘরে ব্যাপকাকারে বিস্তৃত হয়। একাত্তরোত্তর সময়ে মুক্তবাজার অর্থনীতির মুক্তবাজারে পহেলা বৈশাখের উৎসব এখন রীতিমতো মহোৎসব হয়ে উঠেছে এবং উত্তরোত্তর তার রাজনৈতিক, সামাজিক, সাংস্কৃতিক বিস্তৃতি ব্যাপক থেকে আরও ব্যাপকতর হচ্ছে, এর অন্তর্নিহিত দেশেপ্রেমের বিক্রম আরও বাড়ছে, ক্রমে হয়ে উঠছে অপরাজেয়।
বাংলাদেশে বাঙালি মুসলমানরা নববর্ষ উদযাপনের এই নবতাৎপর্যের উদগাতা কিংবা নির্মাতা, যেমন তারা নির্মাতা একুশে ফেব্রুয়ারিরও। এই দু’টি উৎসবই ক্রমে ক্রমে বাংলাদেশের বাঙালি মুসলমানের, বাংলাদেশের অন্যান্য জাতিগোষ্ঠী ও ধর্মের লোকজনের জীবনসংস্কৃতির সঙ্গে ওতপ্রোত হয়ে উঠেছে। এই দুই উৎসবের লগ্নতা ছাড়া তাদের সাংস্কৃতিক অস্তিত্ব আর পূর্ণতা পায় না, সেটাকে কল্পনাও করা যায় না। বলা যায়, বাংলা নববর্ষ ও একুশে ফেব্রুয়ারি এখানকার জনগোষ্ঠীর জাতিগত আত্মপরিচয়ের দুইটি পৃথক স্মারক, দুইটি পৃথক সার্বজনীন ধর্মনিরপেক্ষ উৎসব। একুশে ফেব্রুয়ারিকে বাদ দিয়ে যেমন বাংলাভাষা ও বাঙালিকে কল্পনা করা যায় না তেমনি পয়লা বৈশাখের নববর্ষের উৎসবকে বাদ দিয়েও আর বাঙালিকে কল্পনা করা যায় না।
বাংলাদেশের এই সাংস্কৃতিক প্রপঞ্চের কার্যকারিতা এতোটাই প্রগাঢ় ও বাংলাদেশ নামক রাষ্ট্রের প্রতি ইঞ্চিতে সেটার বিস্তৃতি এমনই যে, বাংলাদেশের অন্যান্য নৃজাতিগোষ্ঠীর মধ্যে কখন জানি কী করে যেনো এই দুই উৎসবের সংস্কৃতি আত্তীকৃত হয়ে, সমগ্র বাংলাদেশে তা সার্বজনীনতার মর্যাদা অর্জন করেছে। বাংলা নববর্ষের সাংস্কৃতিক তাৎপর্য এখানেই, ধর্মবর্ণজাতিনির্বিশেষে সার্বজনীন।



আরো খবর