বাংলা সনের ইতিকথা

আবু আলী সাজ্জাদ হোসাইন
আমরা ব্যবহারিক নগর জীবনে ইংরেজি দিনপঞ্জি ব্যবহারে অভ্যস্ত। যদিও প্রতিটি বাঙালির জীবনে বাংলা দিনপঞ্জি নিতান্ত বাংলা পঞ্জিকার ব্যবহার এখনো সম্পূর্ণ অপাঙক্তেয় হয়ে যায়নি। পাশাপাশি গ্রাম্য জীবনে বাংলা দিনপঞ্জি অতি অবশ্য উপাদান হিসাবে এখনো সগৌরবে বিদ্যমান রয়েছে। তাদের বিয়ে-শাদি, বিভিন্ন উৎসব, পালা পার্বন, কৃষিকর্ম তথা প্রতিটি ক্ষেত্রে বাঙালির গ্রামীণ জীবন বাংলা দিনপঞ্জির উপর নির্ভরশীল। অর্থাৎ বাঙালি জীবনের প্রতিটি হাসি কান্না আনন্দ বেদনা উৎসব উদযাপনে বাংলা দিনপঞ্জি অতি গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করে আসছে। যুগ যুগ ধরে তা অব্যাহত থাকবে। এতে কোন সন্দেহের অবকাশ নেই।
এ বাংলা সনের প্রবর্তন নিয়ে রয়েছে সুন্দর ইতিহাস। বাংলা সনের প্রবর্তক হচ্ছেন ভারতের তৃতীয় মোগল স¤্রাট জালালুদ্দিন মুহাম্মদ আকবর। ইতিপূর্বে সমগ্র ভারতবর্ষে যেসব ‘অব্দ’ প্রচলিত ছিল তন্মধ্যে ‘শকাব্দ’, ‘হর্ষাব্দ’, ‘লক্ষ্মনাব্দ প্রভৃতি উল্লেখযোগ্য। এ সবগুলিই ছিল সৌর বছর। আর এর মাস গুলো ছিল চান্দ্র মাস। উল্লেখ্য সৌর বছরগুলো ৩৬৫ দিনের। আর চান্দ্র বর্ষ হলো ৩৫৪ দিনের। এ দুয়ের সফল সমন্বয়ের মাধ্যমে বাংলা সন প্রবর্তন করা হয়েছে। স¤্রাট আকবর এ কর্মভার অর্পন করেছিলেন একদল জ্যোতির্বিদের উপর। যার নেতৃত্বে ছিলেন আমীর ফতেহ উল্লাহ সিরাজী। আকবরের নির্দেশে ও ঐ জ্যোতির্বিদগণের প্রচেষ্টায় বাংলা সন প্রবর্তিত হয়। যার উত্তরাধিকার আজো আমরা সগৌরবে বহন করে চলেছি।
বাংলা সনের আরেকটি মজার দিক হলো এটিকে স¤্রাট আকবরের সিংহাসন আরোহনকাল ও হিজরী সনকে একটি বুদ্ধিদীপ্ত সুন্দর ছাঁচে বন্দি করা হয়েছে। উল্লেখ্য স¤্রাট আকবর সিংহাসনে আরোহন করেন ১৫৫৬ খস্টাব্দে। যেটি হলো হিজরী ৯৬৩ সাল। জ্যোতির্বিদগণের এ সমন্বয়ের ফলে যে কোন ইংরেজী সনকে বাংলা সনে রূপান্তরিত করতে হলে এ দুটি সংখ্য মনে রাখতে হবে। যেমন বর্তমান ২০১৯ সাল থেকে আমরা আকবরের সিংহাসন আরোহন সাল ১৫৫৬ বিয়োগ করলে পাই ৪৬৩ সংখ্যা। এ সংখ্যার সাথে হিজরী ৯৬৩ যোগ করলে আমরা পাই ১৪২৬। যেটি বর্তমান বাংলা সন।
এবার আসি বাংলা দিনপঞ্জির বাংলা মাসের দিকে। প্রাচীন ভারতে প্রচলিত প্রাচীন অব্দগুলোর সাথে ঐ সময়কার জ্যোতিষীগণের সম্পর্ক ছিল বলেই যে নক্ষত্রে পূর্ণিমার অস্ত হয় সে নক্ষত্রের নামানুসারে তারা ঐ মাসের নামকরণ করেছিলেন। বাংলা সনের মাসগুলোতে এজন্য এর প্রভাব লক্ষণীয়। যেমন বিশাখা থেকে বৈশাখ। জ্যেষ্ঠ থেকে জ্যৈষ্ঠ। শ্রবনা থেকে শ্রাবন, ভদ্রা থেকে ভাদ্র। অনিবনী থেকে আশ্বিন। কৃত্তিকা থেকে কার্তিক। পৌষ্যা থেকে পৌষ। মঘা থেকে মাঘ। ফাল্গুনী থেকে ফাল্গুন। এবং চিত্রা থেকে চৈত্র। তবে অগ্রহায়নের সাথে কোন নক্ষত্রের সম্পর্ক নেই। ফসলী মাস হিসাবে এটির নামকরণ করা হয়েছিল। অগ্র+হায়ন=অগ্রহায়ন। অর্থাৎ হায়নের অগ্র। হায়ন মানে বছর। অর্থাৎ বছরের প্রথম মাস। উল্লেখ্য প্রাচীন বাংলা সাল ফসলের মাস দিয়ে শুরু হত। অগ্রহায়ন ছিল বছরের প্রথম মাস।
বাংলা সনের এই মাসগুলোর নামকরণ আকবর পরিবর্তন করেন নাই। করার কোন চেষ্টাও করেন নাই। এ কারণে এ মাসগুলো প্রাচীন জ্যোতিষীদের দেয়া নামকরণেই আজো পরিচিত হয়ে আসছে। এ ভাবে বাংলা সনে জ্যোতিষীদের অবদানও অম্লান ও অক্ষয় রয়েছে এবং থাকবে। এটিও একটি সমন্বয়। সে কারণে বর্তমান বাংলা সনকে উল্লেখিত উভয় ধারার গৌরবময় ফসল বল্লেও অত্যুক্তি হবে না। এটাই আমাদের হাজার বছরের ঐতিহ্য।
পয়লা বৈশাখ শুধু একটি দিন নয়। এটি আমাদের আত্মপরিচয়ের দিন। ৩০ শে চৈত্র বাংলা সনটির সালতামামি হয়। পরদিন শুভ হালখাতার মাধ্যমে ব্যবসায়ীরা নববর্ষের শুভ মহরত করে থাকেন। বাংলা মাসগুলো তিথি নির্ভর হওয়ায় এর দিন সংখ্যা ছিল বিভিন্ন ধরনের। কোন মাস ৩১ দিনের। কোন মাস ৩০ দিনের। এর চাইতে কম-বেশি দিনেরও মাস ছিল। এ কারণে বাংলা একাডেমী এটিকে সহজিকরণের মাধ্যমে বাংলা দিনপঞ্জি সংশোধন করে দিয়েছে। এখন বাংলা সনের প্রথম পাঁচ মাস ৩১ দিনের এবং পরবর্তী সাত মাস ৩০ দিনের হয়। ফলে ১৪ই এপ্রিল প্রতি বছর ১লা বৈশাখ হতেই থাকবে। এটি একটি সংস্কার কাজ। যেটি মন্দ নয়। তবে সমাজে প্রাচীন ও নতুন উভয় পদ্ধতি এখনো প্রচলিত থাকার কারণে কিছুটা অসুবিধা তো রয়েই গেল। আশা করা যায় একদিন আসবে যখন এরও একটি সুরাহা আমাদের ভবিষ্যত প্রজন্ম করতে সক্ষম হবে।
লেখক: প্রবীণ আইনজীবী ও গবেষক।