বাম্পার ফলন কেন কৃষকের হাহাকার হবে?

চালের বদলে সরকারের ধানই কেনা উচিত। হাওরাঞ্চলের সকল শ্রেণি-পেশার মানুষ যে কথাটি বলছেন, অর্থাৎ মিলারদের নিকট থেকে চাল না কিনে সরকার সরাসরি প্রকৃত কৃষকদের নিকট থেকে ধান কিনুক; সেটি সর্বাংশে যুক্তযুক্ত এ কারণে যে সরকারের খাদ্যশস্য সংগ্রহ অভিযানের অন্যতম মূল উদ্দেশ্য হলো উৎপাদক কৃষক সমাজকে প্রণোদনা দেয়া যাতে তারা খাদ্য শস্য উৎপাদন করে লোকসানে না পড়েন। অথচ সরকারের এই মৌল নীতির ব্যত্যয় ঘটিয়ে খাদ্যশস্য সংগ্রহের নামে কখন কীভাবে এখানে মিলারদের নিকট থেকে চাল কেনার লক্ষ্যমাত্রা ঢুকে গেল। সরকার কি মিলারদের সহায়তা দিতে চাইছে? পৃথিবীর বহু দেশে কৃষকদের নানাভাবে প্রণোদনা দেয়া হয়। পুঁজিবাদী দেশ তথা মুক্তবাজার অর্থনীতির প্রবক্তা বলে পরিচিত আমেরিকা, কানাডা, ইংল্যান্ড প্রভৃতি দেশ তাদের কৃষকদের নানাভাবে প্রণোদনা জুগিয়ে থাকে। সেখানে আইএমএফ বা অর্থনীতির বিশ্ব মোড়ল অপরাপর প্রতিষ্ঠানগুলো বাধ সাধে না। তাদের যত হম্বিতম্বি কেবল আমাদের মতো দেশগুলোতে। আর আমাদের আমলাতন্ত্র-বিশেষজ্ঞরাও হয়েছেন সেরকমই। তারা কেবল প্রেসক্রিপশন অনুসরণ করতে ওস্তাদ। আরেকটি ওস্তাদি আছে, যা বাঁশের চাইতে কঞ্চি দরের মতো অবস্থা। ওস্তাদ যা বলে শাগরেদ বলে তার তিন গুণের মতো ব্যাপার আর কি। বৈশ্বিক চাপের মধ্যে থেকেও জাতীয় স্বার্থে যতটুকু সৃজনশীলতা দেখানোর সুযোগ আছে তারা সেটুকুও দেখাতে ভীষণ কার্পণ্য করেন। ওই কার্পণ্য না থাকলে খাদ্যশস্য সংগ্রহের জায়গায় কোন অবস্থাতেই মিল মালিকদের নিকট থেকে চাল কিনার বিষয়টি অন্তর্ভূক্ত হতে পারত না।
কৃষকরা এবার বোরো মৌসুমে প্রায় ২ কোটি টন ধান ফলিয়েছেন। ধান ও চাল মিলিয়ে সরকার কিনবেন মাত্র ১৩ লাখ টন। অর্থাৎ উৎপাদিত ধানের মাত্র ৬% সরকারি উদ্যোগে কেনা হচ্ছে। এই ৬% ক্রয় লক্ষ্যমাত্রা চাল সহকারে, চাল সংগ্রহের লক্ষ্যমাত্রা ধানের অন্তত ৩ গুণ বেশি। তার মানে শুধু ধান ক্রয় করা হবে ২% বা তার চাইতে কম। শুভংকরের ফাঁকি হলো, প্রকৃত কৃষকরা কখনও গুদামে ধান বিক্রি করতে পারেন না। নানা অজুহাতে তাদের ধানকে ক্রয় অযোগ্য ঘোষণা করার প্রবণতা রয়েছে গুদাম কর্মকর্তাদের। এই ধান কেনা হয় স্থানীয় রাজনৈতিক প্রভাবশালীদের নিকট থেকে। অর্থাৎ প্রকৃত অর্থে কোন কৃষকই সরকারি গুদামে ধান বিক্রি করতে পারেন না। এরকম বাস্তবতায় খাদ্যশস্য সংগ্রহের এই অভিযান দেশের কৃষক সমাজের কোন উপকারেই আসছে না। এই প্রক্রিয়ার বিরূপ প্রভাব হলো অভ্যন্তরীণ বাজারে ধানের ব্যাপক দর পতন। সরকারি মূল্যের (প্রতি মণ ১০৪০ টাকা) অর্ধেক দামে কৃষকরা ধান বিক্রি করতে বাধ্য হচ্ছেন। কৃষকদের প্রতি মণে লোকসান হচ্ছে ২ থেকে ৩ শ’ টাকা। ক্রমাগত লোকসান দিতে দিতে কৃষকদের মেরুদ- ভেঙে যাওয়ার উপক্রম হয়েছে। উৎপাদক কৃষক সমাজ যদি আমাদের কৃষি ব্যবস্থা থেকে বিলীন হয়ে যায় তাহলে আমাদের অর্থনীতির কেমন সর্বনাশ ঘটে যাবে সেটি এখনও যদি নীতিনির্ধারকরা না ভাবেন তাহলে এই ধানের দেশে বাম্পার ফলনের আত্মতুষ্টি পতনের কারণ হতে দেরি লাগবে না।
সরকারের উচিত অতি দ্রুত ধানের মূল্য পতনের এই জায়গায় হস্তক্ষেপ করা। মুক্তবাজর অর্থনীতির মুক্ত চিন্তা থেকে বেরিয়ে এসে কৃষক ও কৃষি বাঁচাতে অবশ্যই কৃষকবান্ধব নীতিমালার প্রয়োগ ঘটাতে হবে। সারা বাংলাদেশে আজ ধানের দাম নিয়ে হাহাকার উঠেছে। এই হাহাকার আরও ভারী হয়ে উঠার আগেই একে নিয়ন্ত্রণ না করা গেলে শেষে আঙুল কামড়িয়েও রেহাই পাওয়া যাবে না।