বাম ধারার বিচ্যুতি বনাম একটি ক্যাসিনোর চেয়ারম্যান

সাবেক মন্ত্রী ও ডাকসাইটে বামপন্থী নেতা রাশেদ খান মেননের নাম সাম্প্রতিক র‌্যাবের অভিযানে ধরা পড়া একটি ক্যাসিনোর সাথে জড়িত হওয়া সত্যিকার অর্থেই দুর্ভাগ্যজনক। যুবলীগ নেতা খালেদ মাহমুদ ভূইয়ার নিয়ন্ত্রণাধীন ফকিরাপুল ইয়ংম্যান্স ক্লাবের গভর্নিং বডির চেয়ারম্যান রাশেদ খান মেনন। তিনি রাজধানীর ওই এলাকার সংসদ সদস্য। অনলাইন পত্রিকা বাংলাট্রিবিউন ১৮ সেপ্টেম্বর এক সংবাদে এই তথ্য জানিয়েছে। রাশেদ খান মেনন এই অঞ্চলের প্রবাদপ্রতিম এক বামপন্থী ছাত্রনেতা। মস্কো-পিকিং আন্তর্জাতিক তাত্ত্বিক মতবিরোধের জেরে এদেশে ছাত্র ইউনিয়ন বিভক্ত হলে একটি অংশ মেননের নেতৃত্বে পিকিংপন্থী ধারার পতাকা তুলে ধরে। এরপর থেকেই ছাত্র ইউনিয়নের এক অংশ মতিয়া গ্রুপ অন্য অংশ মেনন গ্রুপ নামে পরিচিতি পেতে থাকে। বলাবাহুল্য এদেশের রাজনীতিতে মেননের নেতৃত্বাধীন ছাত্র ইউনিয়নের এক গৌরবজনক ভূমিকা রয়েছে। মতিয়া-মেননের নেতৃত্বে ছাত্র ইউনিয়নের বিভক্তিকে এখনও রাজনীতি-বিশ্লেষকরা নানা দৃষ্টিভঙ্গিতে ব্যাখ্যা করে চলেছেন। এমন এক গৌরবজনক ও ঐতিহাসিক রাজনৈতিক ঐতিহ্যের অধিকারী ব্যক্তির নাম তাঁর পরিণত বয়সে এসে একটি ক্যাসিনোর নামে জড়িত হয়ে যাওয়াকে রাজনৈতিক অধঃপতনের চূড়ান্ত নজির হিসাবে উল্লেখ করা যায়। সংবাদ মাধ্যমকে অবশ্য মেনন বলেছেন, তিনি এই ক্লাবটিকে ফুটবল ও ক্রিকেট ক্লাব রূপেই জানতেন এবং সে কারণেই তাদের অনুরোধে তিনি চেয়ারম্যান হয়েছেন। এই বক্তব্য খন্ডিতভাবে সত্য হতে পারে কিন্তু এমন ব্যাখ্যা দিয়ে তিনি দায় এড়াতে পারেন না। কারণ কোন সংগঠনের বিস্তারিত তথ্য না জেনে এর সাথে সম্পৃক্ত হওয়া কোন দায়িত্বশীল ব্যক্তিরই উচিত নয়। ইয়ংম্যান্স ফকিরাপুল ক্লাবটি একসময়ে ফুটবল দল হিসাবে বেশ নামকরা ছিল। এই ক্লাবটি অপরাপর ক্লাবের মতই যে এক সময়ে জুয়া খেলার ব্যবসাদার হিসাবে পরিবর্তিত হয়ে গেছে, সরকারের একজন সাবেক মন্ত্রী, সংসদ সদস্য, একটি রাজনৈতিক দলের প্রধান হিসাবে সেই তথ্য অবশ্যই তাঁর জানা দরকার ছিল। এই অজ্ঞতা তাঁকে কখনও দায়মোচনের ছাড়পত্র দিবে না। সুতরাং ইয়ংম্যান্সের চেয়ারম্যান হিসাবে এর যাবতীয় কুকর্মের দায় তাঁকে বহন করতে হবে।
বাংলাদেশে বাম ধারার বহু তারকা রাজনীতিকদের সমাজতন্ত্র ও বিপ্লবী রাজনীতির লাইন ছেড়ে প্রচলিত ধারার রাজনীতিতে প্রবেশ করার উদাহরণ কম নয়। মূলত বিএনপি ও জাতীয় পার্টি ওই ধারাগুলোর তারকা রাজনীতিকদের দলে ভিড়িয়ে দল হিসাবে প্রতিষ্ঠা পেয়েছিল। আওয়ামী লীগের সেই প্রয়োজন ছিল না। তারপরেও আশির দশকে সিপিবি’র ভাঙনের পর ন্যাপ ও কমিউনিস্ট পার্টির বহু কেন্দ্রীয় ও স্থানীয় নেতা আওয়ামী লীগে যোগদান করেছিলেন। পরবর্তীতে নির্বাচনী জোট গঠনের খাতিরে আওয়ামী লীগ পিকিংপন্থী ধারার কয়েকটি রাজনৈতিক দলের সাথে জোটও গঠন করে। জোট গঠনের ফলে কিছু বামপন্থী নেতা ক্ষমতার স্বাদ গ্রহণ করতে সক্ষম হন, তাঁদের কয়েকজন এমপি-মন্ত্রী নির্বাচিত হয়ে জীবনের অপূর্ণ সাধও পূরণ করেন। মেনন সেই ধারার প্রতিনিধি হিসাবে আওয়ামী জোটের সখ্যতা পেয়ে মোটামোটি জাতীয়তাবাদী রাজনীতিতে একটি জায়গা করে নিতে সক্ষম হন। বাম নেতা থেকে এই যে ক্ষমতাভোগী রাজনীতিবিদ হিসাবে তাঁর উত্তরণ ঘটেছে সেটিকে তাত্ত্বিকরা বিচ্যুতি হিসাবে বিবেচনা করবেন। তবে বিচ্যুতিরও একটি সীমা থাকে। ক্যাসিনো পরিচালনাকারী ইয়ংম্যান্স ক্লাবের চেয়ারম্যান পদ গ্রহণ সেই সীমানার লংঘন নিশ্চয়ই। একজন আইনপ্রণেতা হিসাবে যেখানে তাঁর বেআইনি কর্মকা-কে প্রতিহত করার দায়িত্ব সেখানে তিনি নিজে এমন অবৈধ কার্যকলাপের অংশীজন হয়ে পড়লেন। এই দায় তো তাঁকে নিতেই হবে। মুখে আদর্শের বুলি আর কাজে ঠিক বিপরীত, রাজনীতিকে এই ধরনের দ্বিচারিতা থেকে মুক্ত করতে আজ যে জাগরণ তৈরি হয়েছে সেখানে মেননকে অবশ্যই জনতার আদালতে জবাবদিহি করতে হবে।