বারকি শ্রমিকদের প্রতি মানবিক আচরণ কাম্য

যেসব শ্রমিক বংশানুক্রমিকভাবে প্রাকৃতিক উৎস থেকে বালি পাথর আহরণ করে জীবন চালিয়ে আসছিলেন তাদের একটি বড় অংশ এখন কর্মহীন হয়ে পড়েছেন। মঙ্গলবারের দৈনিক সুনামগঞ্জের খবরে প্রকাশিত একটি সংবাদ থেকে জানা যায়, সীমান্ত নদী চলতি থেকে বালু পাথর আহরণকারী প্রায় ২০ হাজার শ্রমিক এখন বালু পাথর আহরণ করতে পারছেন না। অন্তত ৫০টি গ্রামের বারকি শ্রমিকরা এখন কর্মহীন হয়ে মানবেতর জীবন যাপন করছেন। এই বারকি শ্রমিকদের সীমান্ত শৃঙ্খলার দোহাই দিয়ে বিজিবি বালু পাথর আহরণ করতে দিচ্ছে না বলে সংবাদসূত্র থেকে জানা যায়। মুসলমান ধর্মাবলম্বীদের প্রধান ধর্মীয় উৎসব ঈদুল ফিতর আসন্ন প্রায়। কর্মহীন এইসব বারকি শ্রমিকের ঘরে এখন ঈদের আনন্দের পরিবর্তে অভাব অনটনের তা-ব। শ্রমিকরা কাতর কণ্ঠে আবেদন জানিয়েছেন তাদের কাজের সুযোগ ফিরিয়ে দেওয়ার। এই বিশাল সংখ্যক শ্রমজীবিকে এককথায় কর্মহীন করে ফেলা এক ধরনের অমানবিকতাই বটে। সীমান্ত শৃঙ্খলার কথা বলে একটি বিশাল জনগোষ্ঠীর পেশা বন্ধ করে দেয়ার বিষয়টি নিয়ে আরও ভাবনা চিন্তা করার অবকাশ রয়েছে বলেই আমরা মনে করি। সীমান্তের শৃঙ্খলা বজায় রেখে কীভাবে বিপুল সংখ্যক বারকি শ্রমিকের পেশাগত জীবনের নিশ্চয়তা দেয়া যায় সেটি খুঁজে বের করা তাই জরুরি।
বারকি শ্রমিক যারা ছোট নৌকা, একটি শাবল আর নিজের শ্রমশক্তিকে ব্যবহার করে সারাদিন হাড়ভাঙা পরিশ্রম করে ৫ শ’ বা ৮ শ’ টাকা রোজগার করতে পারেন, তাদের কাজ বন্ধ করে দেয়া যায় বটে। কিন্তু এখনও বিভিন্ন পাহাড়ি নদীতে অবাধে চলতে থাকা ড্রেজার বা বোমা মেশিন কিছুতেই বন্ধ করা যাচ্ছে না। তাহিরপুরের লাউড়েরগড় এলাকায় ড্রেজার দিয়ে নদীর পাড় কেটে বালু আহরণের বিষয়টি এখনও চলমান। চলতি নদীর তীরে ড্রেজার ও বোমা মেশিন চালিয়ে বালু ও পাথর আহরণ করার ঘটনা তো দিনের আলোর মত প্রকাশ্য একটি বিষয়। এ নিয়ে সংবাদপত্রে একাধিক সংবাদ প্রকাশিত হলেও প্রভাবশালী ড্রেজার মালিকদের এই বেআইনি পরিবেশবিরোধী কার্যকলাপ বন্ধ করে সীমান্ত শৃঙ্খলা বজায় রাখা যায় নি। তাহলে কি ধরে নিতে হবে বারকি শ্রমিকরা প্রভাবশালী নয় বলেই আজ তাদের জীবন ও জীবিকার উপর এমন সংকট নেমে আসল?
সুনামগঞ্জের বালু পাথরের প্রাকৃতিক উৎসগুলো প্রকৃতির এক অপার দান। মানুষ শুধুমাত্র নিজের শ্রমশক্তি ব্যবহার করে এই সম্পদ আহরণ করলে কোনদিন বালু পাথরের অভাব হত না। কিন্তু কিছু প্রভাবশালী অনৈতিক সংশ্রবযুক্ত ব্যক্তির যান্ত্রিক আগ্রাসনের শিকার হয়ে আজ জেলার বালু পাথর মহালগুলো শূন্য হয়ে পড়েছে। প্রাকৃতিক সম্পদের এই ভা-ারগুলো যে ক্রমাগত আগ্রসনের শিকার হয়ে লুণ্ঠিত হয়ে পড়ছিল তখন কারও কোন ধরনের শক্ত তৎপরতা আমাদের নজরে পড়েনি। তদারককারীদের প্রশ্রয় পেয়েই লুণ্ঠনকারীরা এসব সম্পদ লুটে নিতে পেরেছে। অথচ বংশ পরাম্পরায় যারা এসব মহালে শ্রমশক্তি ব্যবহার করে জীবন জীবিকা চালাতেন তাদের উপর আজ উচ্ছেদের খড়গ নেমে আসল।
সীমান্ত অঞ্চলে কর্মহীন শ্রমিকদের পেশা ফিরে পাওয়ার বিষয়ে আমরা সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষের সহৃদয় মানবিক পদক্ষেপ কামনা করি। এই বিশাল জনগোষ্ঠী বেকার হয়ে গেলে বরং দেশের অভ্যন্তরীণ শৃঙ্খলা বিনষ্ট হওয়ার আশংকা তৈরি হয়। ২০ হাজার শ্রমিক বেকার হয়ে পড়লে এরা অপরাধবৃত্তিতে জড়িয়ে পড়বে না, এমন কোন গ্যারান্টি নেই। সমাজের শান্তি শৃঙ্খলা বজায় রাখার জন্য কোন গোষ্ঠীর বেকার হয়ে পড়ার প্রবণতাকে অবশ্যই রোধ করতে হবে।