বালিয়া ওয়ানের বাম্পার ফলনে খুশি ফররুখ

আলী আহমদ, জগন্নাথপুর
জগন্নাথপুরে প্রথমবারের মতো বালিয়া ওয়ান জাতের বোরো ফসলের বাম্পার ফলনে হাসছেন কৃষক ফররুখ আহমদ। তিনি মূলত শিক্ষকতা পেশায় জড়িত থাকলেও বাপ-দাদার বুনিয়াদি পেশা কৃষির সঙ্গে অত:প্রতভাবে সম্পৃক্ত রয়েছেন। প্রতি বছর বোরো মৌসুমে পূর্ব পুরুষের রেখে যাওয়া জমি চাষাবাদ করছেন অন্যান্য কৃষকদের মতো।
মঙ্গলবার জগন্নাথপুরের সর্ববৃহৎ নলুয়ার হাওরে সরেজমিনে গিয়ে দেখা যায়, শিক্ষক ফররুখ আহমদ কৃষি শ্রমিকদের দিয়ে নিজের জমির ধান তোলার কাজ করছেন। শ্রমিকদের পাশাপাশি তিনি নিজেও তদারকি করছেন। ফররুখ আহমদ জগন্নাথপুর উপজেলার কেশবপুর উচ্চ বিদ্যালয়ের প্রধান শিক্ষক হিসেবে দায়িত্বরত রয়েছেন। তিনি নলুয়া হাওর বেষ্টিত চিলাউড়া হলদিপুর ইউনিয়নের বেরী গ্রামের বাসিন্দা।
কাজের ফাঁকে ফররুখ আহমদ এ প্রতিবেদককে জানান, তিনি এবার ২৮ কেদার জমিতে (৩০ শতকে এক কেদার) বোরো আবাদ করেছেন। গত দুই বছর পূর্বপুরুষের রেখে যাওয়া তিন হাল (১২ কেদারে এক হাল) জমিতে আবাদ করে অকাল বণ্যার কারণে এক ছটাক ধান তুলতে পারেননি। লোকসানে পড়তে হয় অন্য কৃষকদের মতো তাকেও। কেউ কেউ তাকে কৃষি আবাদ বাদ দেয়ার পরামর্শ দেন। কিন্তু বাপদাদার বুনিয়াদি পেশা কৃষির প্রতি ভালোবাসা তাকে কৃষির নেশায় মুগ্ধ করে রাখে। তাই এবার ২৮ কেদার জমি আবাদ করেন।
তিনি বলেন, প্রতি বছর তিনি একটি নতুন জাতের ধান আবাদের চেষ্ঠা করেন। এবারও তিনি নতুন জাতের বালিয়া ওয়ান চাষাবাদ করেছন। ৫ কেদার জমিতে উচ্চ ফলনশীল ওই জাতের ধান চাষাবাদ করেন। নলুয়ার হাওরে তিনিই প্রথম এজাতের ধান আবাদ করেছেন। কেদার প্রতি তিনি ধান পেয়েছেন ৩০ মণ। প্রতি কেদারে ব্যয় হয়েছে দুই থেকে আড়াই হাজার টাকা।
এছাড়াও হাওরে অন্য কৃষকদের মতো ব্রি-২৮ ও ব্রি-২৯ জাতের ধান আবাদ করেন। তাঁর মতে ব্রি-২৮ জাতের মতো আগাম ও উচ্চফলনশীল ধান বালিয়া ওয়ান। এ জাতের ধান নলুয়ার হাওরে চাষাবাদ করলে কৃষকরা উপকৃত হবেন। তিনি এবার সাড়ে ৫শ থেকে ছয়শত মণ ধান তুলবেন বলে আশা প্রকাশ করে বলেন, সারা বছরের খাবার খেয়েও অনেক ধান এবার বিক্রি করতে পারব।
ফররুখ আহমদ আরও জানান, জগন্নাথপুর উপজেলা মুলত কৃষি নির্ভর উপজেলা। এছাড়াও উপজেলার সবচেয়ে বড় হাওর নলুয়ার হাওর পাড়ের বাসিন্দা হিসেবে আমরা প্রকৃতির সাথে যুদ্ধ করে আছি। তাঁর মতে, হাওরপাড়ের মানুষ ধান তুলতে পারলে সাবলম্বী আর না তুলতে পারলে নি:স্ব। তারপরও প্রতি বছর কৃষকদের কষ্টার্জিত ফসল নিয়ে ব্যবসা করেন একটি মহল। ফসল রক্ষা বাঁধের নামে প্রতি বছর চলতো লুটপাট। আবার ধানের নায্য দাম নিয়েও থাকে শঙ্কা। তিনি সরকারীভাবে ধায্যদামে যাতে কৃষকরা ধান বিক্রি করতে পারেন এব্যাপারে পদক্ষেপ নেয়ার পাশাপাশি ফসল রক্ষা বাঁধের কাজে এবারের মতো প্রকৃত কৃষকদেরকে সম্পৃক্ত রাখার দাবি জানান।
চিলাউড়া-হলদিপুর ইউনিয়ন পরিষদের চেয়ারম্যান আরশ মিয়া বলেন,শিক্ষক ফররুখ আহমদ এর মতো কৃষকরাই হাওরের প্রাণ। প্রতি বছর হাওর পাড়ের খেটে খাওয়া মানুষের পাশে কৃষক হিসেবে হাজির হয়ে হাওরের চাষাবাদকে উৎসাহিত করছেন। তিনি বলেন,শিক্ষক ফররুখ আহমদ একজন আর্দশ কৃষক হিসেবে সুপরিচিতি লাভ করেছেন।
জগন্নাথপুর উপজেলা কৃষি সম্প্রসারণ অধিদপ্তরের উদ্ভিদ সংরক্ষণ কর্মকর্তা তপন চন্দ্র শীল বলেন, ফররুখ আহমদ শুধু একজন শিক্ষকই নন আর্দশ কৃষক হিসেবে আমাদের নিকট পরিচিত। প্রতিবছর তিনি উচ্চ ফলনশীলসহ বিভিন্ন জাতের ধান আবাদ করে থাকেন। এবার তিনি এ উপজেলায় উচ্চফলনশীলও আগাম জাতের ধান বালিয়া ওয়ান রোপন করে সফল হয়েছেন।
জগন্নাথপুর উপজেলা কৃষি কর্মকর্তা শওকত ওসমান মজুমদার বলেন, প্রাকৃতিক বিপর্যয়সহ নানা কারণে জগন্নাথপুর উপজেলার হাওরগুলোতে আগাম ও উচ্চ ফলনশীল হিসেবে ব্রি-২৮ ও ব্রি-২৯ জাতের ধান বেশী আবাদ হয়। অন্যান্য জাতের ধান বিলম্বিত হওয়ায় কৃষকরা ঝুঁকি নিতে চান না। ফররুখ আহমদ নতুন নতুন জাতের ধান আবাদ করে অভিজ্ঞতা অর্জন করছেন। যা কৃষকদের জন্য ভাল লক্ষণ।
তিনি বলেন, সুনামগঞ্জের হাওরগুলোতে প্রকৃতির বিপর্যয়ের কথা বিবেচনা করে নতুন ধানের জাত আবিস্কারের চেষ্ঠা চলছে।