বালু-পাথর উত্তোলন ও পুনর্ভরণের মধ্যে ভারসাম্য বজায় থাকুক

শনিবার জেলার বারকি শ্রমিকরা জাদুকাটাসহ অন্যান্য বালুমহাল থেকে হাতে বালু-পাথর উত্তোলনের অনুমতি দানের জন্য বিবৃতি দিয়েছেন যা পত্রিকায় প্রকাশিত হয়েছে। ঠিক এই দিনই তাহিরপুরের এক সমাবেশে স্থানীয় সংসদ সদস্য মোয়াজ্জেম হোসেন রতন জাদুকাটা নদীতে বালু পাথর উত্তোলন করা যাবে মর্মে ঘোষণা দিয়েছেন। গণমাধ্যমে প্রকাশিত সংবাদ থেকে জানা যায় কর্মহীন হাজার হাজার বালু-পাথর শ্রমিকদের জীবন ও জীবিকার বিষয়টি অনুধাবন করে সংসদ সদস্য এই ঘোষণা দিয়েছেন। তিনি স্পষ্ট করে বলেছেন, জাদুকাটার পাড় কোন অবস্থাতেই কাটা যাবে না। এখানে কোন ধরনের চাঁদাবাজি হবে না মর্মেও তিনি দ্ব্যর্থহীনভাবে জানিয়ে দিয়েছেন। আমরা সংসদ সদস্যের আপাতদৃষ্টিতে এই শ্রমিকবান্ধব ঘোষণার জন্য তাঁকে অভিনন্দন জ্ঞাপন করি।
জাদুকাটা নদীর বালুকে কেন্দ্র করে একটি শক্তিশালী চাঁদাবাজচক্রের সক্রিয় থাকার কথা আমাদের জানা। এরা বেপারোয়াভাবে নদীর পাড় কেটে বালু উত্তোলনের মহোৎসব শুরু করেছিল। বলাবাহুল্য ওই চক্রের বালু আহরণের সাথে সাধারণ শ্রমিকদের বিন্দুমাত্র সম্পর্ক ছিল না। এরা বড় বড় বাল্কহেড নদীর ভিতর ঢুকিয়ে বালু তোলার সুযোগ করে দিত। বিনিময়ে বড় অংকের চাঁদা পকেটস্ত করত প্রতিদিন। নদীর তীর কাটার ফলে পার্শ্ববর্তী বহু গ্রাম চরম ঝুঁকির মধ্যে পতিত হয় এবং অনেক বসতি ও স্থাপনা নদীগর্ভে বিলীন হয়ে যায়। এখন যখন সংসদ সদস্য নদীর পাড় কাটার ব্যাপারে নিষেধ আরোপ করেছেন এবং একই সাথে চাঁদাবাজির বিরুদ্ধে নিজের অবস্থান স্পষ্ট করেছেন তখন আমরা আশা করতে পারি এখন থেকে এখানে আগের চাঁদাবাজ চক্রের দৌরাত্ম্য পুনরার্বিভূত হবে না। রাজনৈতিক আশ্রয় প্রশ্রয় ও প্রশাসনিক সহযোগিতা ছাড়া কোথাও কোনো চাঁদাবাজ চক্র স্থায়ী হতে পারে না। যেখানে যত ধরনের চাঁদাবাজি হয় তার সবগুলোতেই ওই পক্ষগুলোর সক্রিয় সমর্থন থাকে, প্রত্যক্ষ অথবা পরোক্ষভাবে।
সুনামগঞ্জে কয়েক হাজার বারকি শ্রমিক বালু-পাথর আহরণ করে জীবন ও জীবিকা পরিচালনা করছে বংশানুক্রমে। এখন এদের বালু-পাথর আহরণ করতে দেয়া হয় না। এতে কর্মহীন হয়ে পড়েছেন বিশাল এই গোষ্ঠীটি। জেলার বিভিন্ন উৎসে বালু ও পাথরের প্রাচুর্য এখন আর নেই। যন্ত্র দ্বারা আহরণের ফলে এই প্রাকৃতিক সম্পদটি দ্রুত নিঃশেষিত হওয়ার পথে। বালু-পাথর আহরণে কোন ধরনের যন্ত্রের ব্যবহার আইন দ্বারা নিষিদ্ধ। কিন্তু প্রশাসন ও রাজনৈতিক নেতৃবৃন্দের নাকের ডগায় বছরের পর বছর ধরে এই অবৈধ অপকর্মটি ঘটে চলেছে। এ নিয়ে বিস্তর অভিযোগ, লেখালেখি, সভা-সমাবেশ-প্রতিবাদ হলেও কোন মহলের টনক নড়েনি। আখ ছিবড়ে যেমন শেষ বিন্দু রস পর্যন্ত বের করে ফেলা হয় তেমনি এই বালু-পাথর মহালগুলোকে ছিবড়ে ছিবড়ে কঙ্কাল বানিয়ে ফেলেছে কতিপয় অর্থলোভী ব্যবসায়ী। অথচ সনাতনী পদ্ধতিতে হাতের দ্বারা বালু-পাথর উত্তোলিত হলে এই প্রাচুর্য কোনো দিনই শেষ হত না। এই মহালের মাধ্যমে জীবিকা নির্বাহে নিয়োজিত কয়েক হাজার শ্রমিক অনায়াসে জীবন চালাতে পারতেন। তবে আশার কথা হলো এই, যদি যন্ত্রের ব্যবহার বন্ধ করে দেয়া হয় তাহলে হাতে তোলার যোগ্য বালু ও পাথর এখনও যথেষ্ট পরিমাণে মজুদ আছে বলে বারকি শ্রমিকরা জানিয়েছেন। প্রাকৃতিক নিয়মে প্রতিবছরই বালু-পাথর পুনর্ভরিত হয়ে থাকে। হাতে তোলার প্রক্রিয়া বজায় থাকলে উত্তোলন ও পুনর্ভরণের মধ্যে একটি ভারসাম্য বজায় থাকে। এই ভারসাম্য বজায় রাখার বিষয়টিই সর্বাধিক গুরুত্বপূর্ণ। নতুবা হাঁসের পেট কেটে সব ডিম একসাথে বের করে আনার চরম লোভাতুর ইচ্ছা বাস্তবায়ন করতে যেয়ে তলে-মূলে সব হারানোর বাস্তবতাই হবে একমাত্র ভবিতব্য।
সংসদ সদস্যের প্রকাশ্যে প্রদত্ত অঙ্গীকারের শতভাগ কার্যকারিতা দেখতে চাই আমরা। এর অন্তরালে যেন আর কোনো অভীপ্সা কারও কাজ না করে।