বালু-পাথর কেন্দ্রীক পরিবেশ বিপর্যয় এখনই রোধ করুন

নদী তীরে বালু ডাম্পিংয়ের কারণে বুধবার ইব্রাহীমপুর এলাকার সুরমা নদীর তীর ধসে পড়ার সংবাদ প্রকাশিত হয়েছে গতকাল দৈনিক সুনামগঞ্জের খবরে। বালু-পাথর ব্যবসায়ীদের পণ্য সংরক্ষণের এমন বেপরোয়া পদ্ধতির কারণে এ বছরই সুরমা ও চলতি নদীর তীরে আরও বেশ কয়েকটি ধসের ঘটনা ঘটেছে। ডাম্পিং করা বালুর স্তুপ ধসে পড়ে নদী তীর বিলীন হওয়া বালু-পাথর ব্যবসায়কেন্দ্রীক পরিবেশ বিপর্যয়ের একটি নতুন উপাদান। পরিবেশকর্মী ও স্থানীয় লোকজন এমন অপরিকল্পিত ও অবৈধ ডাম্পিংয়ের বিরুদ্ধে ধারাবাহিকভাবে প্রতিবাদ জানিয়ে আসলেও সংশ্লিষ্ট ব্যবসায়ীরা এতে কর্ণপাত যেমন করছেন না তেমনি প্রশাসনও অনেকটা নির্বিকার। যদিও প্রশাসনিক তরফে ভ্রাম্যমান আদালত পরিচালনা করে জরিমানা করার মত মামুলি কিছু পদক্ষেপ গ্রহণ করা হয় মাঝে মধ্যে, কিন্তু এই ধরনের ব্যবস্থা গ্রহণ করাকে ব্যবসায়ীরা খুবই স্বাভাবিক বলে গ্রহণ করে ফেলেছেন। অর্থাৎ ভ্রাম্যমান আদালত পরিচালনা ও জরিমানা করার মধ্য দিয়ে বালু পাথর ব্যবসায় যেসব অবৈধ কর্মকা- চলমান রয়েছে সেগুলোকে রোধ করা সম্ভব হচ্ছে না। ব্যবসায়ীরা সবকিছু ম্যানেজ করে ব্যবসা করে চলে যাবেন, নদী তীর ধসে পড়লে তাদের কী? কিন্তু নদী তীরে যারা বসবাস করেন তাদের জন্য এই বিপর্যয় কতটা ক্ষতির কারণ হচ্ছে সেটি ভেবে দেখছেন না কেউ।
নদীর তীর সর্বাবস্থায় বিশেষ ধরনের এলাকা যেখানে যে কেউ যদিচ্ছা কিছু করতে পারেন না। সরকারি বিধি-বিধান দ্বারাই এই নদীতীরাঞ্চল সংরক্ষিত। কিন্তু যাবতীয় বিধি-বিধান থাকার পরও বাংলাদেশে নদী ও খাল দখলের প্রবণতা একটি অতি সাধারণ বিষয়। এমন কোন নদী নেই এই দেশে যে নদী দখলবাজদের খপ্পর থেকে মুক্ত থাকতে পেরেছে। খালের অবস্থাও তথৈবচ। এই শহরের পানি নিষ্কাষনের প্রাকৃতিক ব্যবস্থা কামারখালি নামক খালটি দখলবাজদের কারণে এখন অতীত স্মৃতি কেবল। অন্যসব খালের ক্ষেত্রেও এই কথা প্রযোজ্য। এমন অবস্থায় সুরমা নদীর তীরে বালু ডাম্পিং করা আটকানোর বিষয়টি বাস্তবিক অর্থে কিছুটা কঠিন হলেও এই দুর্বিনীত প্রকৃতি ও পরিবেশ সংহারক তৎপরতা বন্ধ করা আশু কর্তব্য। প্রশাসনিক কর্তৃপক্ষকে এই বিষয়ে গতানুগতিক পদ্ধতির পরিবর্তে কিছুটা কঠোর ব্যবস্থা গ্রহণের চিন্তা করতে হবে।
জানা যায়, বালু ডাম্পিং করতে এখন সনাতনী পদ্ধতি (শ্রমিক দিয়ে লোডিং-আনলোডিং) এর পরিবর্তে এখন মোটা পাইপে মোটর লাগিয়ে এ কাজ করা হয়। এতে বালুমিশ্রিত পানি নদী তীরে ফেলা হয়। পানি সরে গিয়ে একসময় বালু স্তুপ হয়ে জমা থাকে। এই পদ্ধতিটি আরও বেশি পরিবেশ বিপর্যয়কর বলে অভিজ্ঞরা মন্তব্য করেছেন। বালু ও পাথর আহরণে অবৈধ বোমা মেশিন ব্যবহারের পর লোড-আনলোডের ক্ষেত্রে ড্রেজার মেশিন ব্যবহারের এই সর্বনাশা পদ্ধতি আজ একটি বিশাল অঞ্চলকে সংকটাপন্ন করে তুলেছে। অন্যদিকে বালু-পাথর ব্যবসা যে বিশাল শ্রমিকগোষ্ঠীর কর্মসংস্থান ঘটাত তারাও কর্মচ্যুত হয়ে সামাজিক সমস্যার মাত্রা বাড়িয়ে তুলেছে। সুতরাং এই জায়গায় সরকারকে গুরুত্ব দিতে হবে।
সুরমা কিংবা চলতি নদীর তীর অথবা জেলার অপরাপর নদী তীর আর যাতে এরূপ অবৈধ কাজের ফলে ধ্বংসপ্রাপ্ত না হয় তাই আমাদের কাম্য। একটি সরু খালের মতো প্রবহমান একদার চলতি নদী বালু-পাথর আগ্রাসনকারীদের কারণে আজ যে বিশাল রূপ ধারণের মাধ্যমে প্রকৃতির নিজস্বতাকে নষ্ট করে দিয়েছে, তার প্রতিক্রিয়া আরও সুদূরপ্রসারী হওয়ার আগেই একে আটকানো আমাদের কর্তব্য।