বাল্য বিবাহ

সালেহ আহমদ
বাল্য বিবাহ বাংলা দেশের জন্য সামাজিক সমস্যার মধ্য একটি বড় সমস্যা। ১৮ বছরের কম বয়সী মেয়ে এবং ২১ বছরের কম বয়সী ছেলের বিবাহ কে বাল্য বিবাহ বলে। বাল্য বিবাহ আইন অনুযায়ী একটি শাস্তিযোগ্য অপরাধ। বাল্য বিবাহ বাংলাদেশের অগ্রযাত্রায় বড় বাধা হয়ে দাঁড়িয়েছ। ইউনিসেফের ২০১৬ ইং সালের তথ্য অনুযায়ী বাংলাদেশে ১৮ বছর হওয়ার আগে ৫২ শতাংশ মেয়ের বিয়ে হয়ে যায়। শহরাঞ্চলের তুলনায় গ্রামাঞ্চলে বাল্য বিবাহের প্রবণতা বেশি। গ্রামাঞ্চলে ৭১% এবং শহরাঞ্চলে ৫৪ % বলে জানা যায়। বাল্যবিবাহ আমাদের দেশ ও জাতির অগ্রগতি ও উন্নয়নে একটি বড় বাধা। বাল্যবিবাহের ফলে মানব সম্পদ বিনষ্ট, মা ও শিশুর মৃত্যু ঝুঁকি, পুষ্টিহীনতা, দাম্পত্য সংসারে নানাবিধ সমস্যা সৃষ্টির কারণ হয়ে দাঁড়িয়েছে। এ অভিশাপ থেকে বের হতে চাইলে দেশের সকল নাগরিককে ঐক্যবদ্ধ ভাবে কাজ করতে হবে। প্রশাসনের আইন প্রয়োগকারী কর্তৃপক্ষকে আরো সক্রিয় হতে হবে। বাল্যবিবাহের কারণ ঃ
(ক) দারিদ্রতা, দারিদ্রতার কারণে অনেক অভিভাবক বাল্যবিবাহ দিয়ে থাকেন। (খ) অভিভাবক অশিক্ষিত হওয়ার কারণ মেয়েদের বোঝা মনে করে।
(গ) মান-সম্মান ও নিরাপত্তার ভয়।
(ঘ) ফেসবুক, ইন্টারনেট ব্যবহারের মাধ্যমে কিশোর/কিশোরীরা বাল্যবিবাহের প্রতি উৎসাহিত হওয়া ।
বাল্য বিবাহের কুফল ও সমস্যা ঃ (ক) বাল্যবিবাহের ফলে সন্তান জন্ম নিলে, অপরিপক্ক অবস্থায় সন্তান জন্মায়। যা দেশ ও সমাজের দুর্ভাগ্য। (খ) বাল্য বিবাহের ফলে অপ্রাপ্ত বয়সে সন্তান প্রসবকালীন সময়ে মা ও সন্তানের মৃত্যু ঝুঁকি বেশি থাকে।
(গ) অপ্রাপ্ত বয়সে সন্তান হলে মা ও সন্তানের পুষ্টিহীনতা দেখা দেয়, বিভিন্ন জটিল রোগে আক্রান্ত হওয়ার সম্ভাবনা বেশি থাকে।
(ঘ) অপ্রাপ্ত বয়সে বিয়ে হলে মেয়েরা শ্বশুর-শাশুড়ি ও সাংসারিক দায়-দায়িত্ব, দেখাশুনা, সাংসারিক কাজকর্ম করার মতো শারীরিক ও মানসিক যোগ্যতা না থাকায় মনোমালিন্য দেখা দেয়। ফলে ঝগড়া-বিবাদ সহ মামলা-মোকদ্দমায় জড়িয়ে অল্প বয়সে তালাকপ্রাপ্তা হতে হয়।
(ঙ) বাল্য বিবাহের ফলে মেয়েরা বেশি নির্যাতিত হয়। এমনকি আত্মহত্যা করতে বাধ্য হয়।
বাল্য বিবাহ বন্ধ করার উপায় ঃ
( ক) বাল্যবিবাহের কুফল ও সমস্যাগুলো জনসমক্ষে তুলে ধরতে হবে। প্রতিটা বিদ্যালয়ে কমপক্ষে বছরে দুইবার ছাত্র-ছাত্রীদের একত্রিত করে সমাবেশের মাধ্যমে বাল্য বিবাহের কুফল ও করণীয় বিষয়ে অবগত ও তাদের সহায়তা নিয়ে প্রতিকারের ব্যবস্থা নেওয়া।
(খ) ছাত্র-ছাত্রীদের নিয়ে বাল্যবিবাহ বন্ধের জন্য কমিটি গঠন করে গণজাগরণ সৃষ্টি করা।
(গ) ইউনিয়ন পরিষদের চেয়ারম্যান ও ইউপি সদস্যগন নিজ এলাকার প্রতিটা গ্রামে/মহল্লায় বাল্যবিবাহের কুফল ও প্রতিকার সম্পর্কে সমাবেশ করে সচেতনতা বৃদ্ধি করা।
(ঘ) ছেলে মেয়েদের স্কুলে ভর্তি করে দেওয়া এবং নিয়মিত লেখাপড়া চালিয়ে যাওয়া।
(ঙ) প্রতিটি গ্রামে, মহল্লায়, পাড়ার মসজিদের ইমাম, মুয়াজ্জিন, মাদ্রাসার হুজুর,ও ধর্মীয় পুরোহিতগণকে বাল্যবিবাহের প্রতিকার, কুফল ও তা বন্ধ করার বিষয়ে ওয়াজ, নসিহত করা ও বাল্যবিবাহের শাস্তি বিধান কী হতে পারে তা অবহিত করে সহায়তা করা।
(চ) এফিডেভিটের মাধ্যমে বয়স সংশোধন করে বাল্যবিবাহ বন্ধে উচ্চ পর্যায়ে আইনানুগ ব্যবস্থা নেওয়া।
(ছ) পিতা-মাতা ও অভিভাবকগণ কে সচেতন হওয়া।
বাল্যবিবাহের শাস্তি
(ক) কোন প্রাপ্তবয়স্ক ব্যক্তি অপ্রাপ্তবয়স্ক কাউকে বিবাহ করলে সর্বোচ্চ ২ বছরের কারাদ- বা সর্বোচ্চ ১ লক্ষ টাকা অর্থদ- বা উভয় দ-ে দ-ণীয় হবেন এবং অর্থদ- অনাদায়ে ৩ মাসের কারাদ-ে দন্ডনীয় হবেন।
(খ) দুইজন অপ্রাপ্ত বয়স্ক ছেলে-মেয়ে বাল্যবিবাহ করলে তাদের সর্বোচ্চ ১ মাস আটকাদেশ বা ৫০ হাজার টাকা জরিমানা বা উভয় দণ্ডে দণ্ডিত হবেন।
(গ) বাল্যবিবাহের সঙ্গে পিতা-মাতা বা অন্যরা জড়িত থাকলে ২ বছর ও ন্যূনতম ৬ মাস কারাদন্ড বা অনধিক ৫০ হাজার টাকা অর্থদণ্ড বা উভয় দ-ে দ-নীয় হবেন, অনাদায়ে আরও ৩ মাসের কারাদন্ডে দ-ণীয় হবেন। (ঘ) নিবন্ধক (কাজী) বাল্য বিয়ে নিবন্ধন করলে অনধিক ২ বছর ন্যূনতম ৬ মাসের কারাদন্ড বা অনধিক ৫০ হাজার টাকা অর্থদ- বা উভয় দণ্ডে দণ্ডিত হবেন এবং অনাদায়ে ৩ মাসের কারাদ-ে দন্ডিত হবেন, তার লাইসেন্স বা নিয়োগ বাতিল করার বিধান রয়েছে।
তাই আসুন আমরা বাল্যবিবাহের খারাপ দিক ও বাল্যবিবাহ বন্ধ করার উপায়, বাল্যবিবাহের শাস্তি সম্পর্কে সকলকে ভাল করে জানতে ও মানতে সম্মিলিত ভাবে কাজ করি। তাহলেই সমাজ থেকে বাল্যবিবাহ বিতাড়িত হবে।
লেখক: বিবাহ রেজিস্ট্রার ও সাংবাদিক।