বাহাড়া’য় তিনশ বছরের মেলা শুরু

সুব্রত দাশ খোকন, শাল্লা
যাদের হাতে অঢেল টাকা কিংবা যারা চাইলেই হাতের কাছে পেয়ে যান সবকিছু, তারা এই মেলায় আসার আনন্দ বুঝতে পারবে না। এই মেলায় আসতে হয় বুক ভরা ভালোবাসা নিয়ে। বছরের পর বছর চৈত্র মাসের প্রথম রবিবার অর্থাৎ আজ বিকাল বেলা ও আগামীকাল সোমবার (বারুনী) দুই দিন বসছে বেল-কুইশ্যাইলের (আখ) এই মেলা শাল্লার বাহাড়া গ্রামে। দল বেঁধে মানুষ আসে এই মেলায়। বহুদিন যাদের দেখা হয়নি, তারা এসে কবির সুমনের ভাষায়-ই বলছেন, “বন্ধু, কি খবর বল ?”
প্রায় তিনশত বছরের বাহাড়ার এই সোমেশ্বরীর মেলা সম্পর্কে বাহাড়া গ্রামের প্রাক্তন ইউপি সদস্য ও মেলা উদ্যাপন কমিটির সাবেক সভাপতি ফিরতিলাল দাস বলেন- ৭৫ বছর পার করেছি, ছোটবেলা থেকেই দেখে আসছি, ভাটি এলাকার একমাত্র বোরো ফসল অকাল বন্যা, খরা ও শিলা বৃষ্টি হতে রক্ষার্থে পাঁচ গ্রামের আয়োজনে সোমেশ্বরী দেবীর উদ্দেশ্যে ভোগ-নৈবেদ্য নিবেদনের এই নির্দিষ্ট দিনটি প্রতি বছর পালিত হয়ে আসছে।
ভাটি এলাকার অন্যতম এই বৃহৎ মেলায় হিন্দু-মুসলিম নির্বিশেষে প্রায় লক্ষাধিক মানুষের সমাগম হয়। কত কিছুই না বিক্রি হয় এখানে, প্রথম দিন অর্থাৎ আজ রবিবার ‘বেল-কুইশ্যাইলের’ মেলা। এই মেলায় কেবল বেল-ইক্ষু বিক্রি হয়। সেই মেলার স্থানটি হচ্ছে সুমেশ্বরী মন্দির প্রাঙ্গণে যাওয়ার সামান্য আগে দাঁড়াইন নদীর পাড়ে। দ্বিতীয়টি পরের দিন অর্থাৎ সোমবার বারুনী মেলা বসে সুমেশ্বরী মন্দির প্রাঙ্গণে। এই মেলায় বাঁশের ছাতা, বশাই লাঠি, বেতের ঝুঁড়ি, মাটি দিয়ে তৈরী নানা জিনিসপত্র সহ অনেক কিছু পাওয়া যায়। বড় মাছও উঠে।
দিনের বেলা মেলা শেষে রাত বাড়ার সঙ্গে সঙ্গে মেলা কমিটিকে ম্যানেজ করে বসত নানা রকমের জুয়া খেলা। দীর্ঘদিন ধরে চলে আসা এই জুয়া খেলাটিও একটি রীতিতে পরিণত হয়ে আসছিল। কিন্তু গত বছর প্রশাসনের শক্ত ভূমিকার কারণে জুয়া খেলা না হওয়াতে সোমেশ্বরী দেবীতে আকৃষ্ট ভক্তবৃন্দ খুবই খুশি হয়েছিল। তারা এ বছরও প্রশাসনের রাতের জুয়া খেলা বন্ধের ব্যাপারে শক্ত ভূমিকায় অবর্তীণ হবেন বলে আশাবাদী।
মেলা প্রাঙ্গণই শুধু এ মেলার বিস্তার নয়। মেলা উপলক্ষে জামাই আর আত্মীয় স্বজনকে আমন্ত্রণ জানানো হয়। মেলা সংশ্লিষ্ট পাঁচগ্রাম সহ সোমেশ্বরী মন্দিরের আশেপাশের অন্তত দশ গ্রামের মানুষ এই রীতি রেওয়াজ ধরে রেখেছে যুগ যুগ ধরে। মেলা উপলক্ষে আশা আত্মীয় স্বজন একে-অন্যের বাড়িতে বেড়াতে গেলে মেলা থেকে কিনে আনা বেল-ইক্ষু দিয়ে আপ্যায়ন করে। প্রত্যেক পরিবারের মহিলা ও মেয়েদের সাবান, সিঁদুর ও ছোট ছোট বাচ্চাদের খেলনা উপহারের মাধ্যমে আত্মীয়তার বন্ধন আরো সুদৃঢ় করার রেওয়াজও এলাকায় আবহমান কাল ধরে চলে আসছে।
বাহাড়া ইউনিয়ন পরিষদের চেয়ারম্যান বিধান চন্দ্র চৌধুরী বলেন- পাঁচগ্রামের বাসিন্দারা প্রতি বছর স্বেচ্ছাশ্রমের মাধ্যমে বছরের পর বছর অব্যাহত রেখেছেন এই মেলা।