বিউটিফুল সুনামগঞ্জ- প্রকৃতি, জীবন ও সংগ্রামের কাব্য

সজীব দে
ঢেউ হীন শান্ত হাওর, নদী, মাছ, পাখী, উন্মুক্ত নীল আকাশ, পাহাড় শ্রেণীর অপরূপ সৌন্দর্য, পাদদেশে গড়ে ওঠা জনপদ; সর্বোপরি হাওরের মানুষের জীবন সংগ্রাম চিত্র মনের গহীনে ছড়িয়ে দেয় এক মুগ্ধতা। অনেকেই সেসব নিয়ে ভ্রমণ কাহিনী লেখেন। কেউ ছবি এঁকে সেই মুগ্ধতা প্রকাশের চেষ্টা করেন। আবার অনেক মানুষ সেই সৌন্দর্যকে ক্যামেরায় ধারণ করে রাখেন অন্যদের জন্য।
জেলা প্রশাসক ও আলোকচিত্রী মো. সাবিরুল ইসলাম তেমনই একজন। প্রশাসনিক কার্যক্রমে বা ভ্রমণে ঘুরে বেরিয়েছেন তিনি সারা জেলা। এসময় তিনি দাপ্তরিক কাজের পাশাপাশি প্রকৃতির অপার সৌন্দর্যকে উপভোগ করেছেন। সেই সাথে সৌন্দর্যের স্মারক হিসেবে ক্যামেরায় তুলে রেখেছেন সেই অপার সৌন্দর্যের সারাংশ। সৌন্দর্যের উল্লেখযোগ্য সেই অংশ নিয়ে ‘বিউটিফুল সুনামগঞ্জ’ শিরোনামে শুরু হয়েছে তিন দিনব্যাপী আলোকচিত্র প্রদর্শনী। শনিবার প্রদর্শনীর উদ্বোধন করেন বাংলাদেশ পাবলিক সার্ভিস কমিশনের চেয়ারম্যান, কবি ও গবেষক ড. মোহাম্মদ সাদিক। প্রদর্শনীতে মোট ৯৬ আলোকচিত্র স্থান পেয়েছে।
প্রবাদে আছে হাজারো শব্দের চেয়ে বেশি কথা বলে একটি ছবি। একেকটি ছবির পেছনে থাকে এক একটি সুখ-দু:খ, আনন্দ-বেদনা, বিস্ময়-মুগ্ধতার গল্প। ঋতুভেদে হাওরের ভিন্ন ভিন্ন রূপ ফুটে উঠেছে আলোকচিত্রে। কখনো প্রখর রোদে ধান রোপনের দৃশ্য, সবুজ হাওর। কখনো সোনালী ধানের ক্ষেত, কৃষক, কৃষাণী, শীর্ণ জলস্রোত, বালুচর, তীব্র সূর্যতাপ। আবার কখনো জ লের উপর হিজল করচ বনে পাখির কলতান, কূল নাই-কিনার হীন দিগন্ত বিস্তৃত থৈ থৈ হাওর, তলিয়ে যাওয়া হাওর থেকে নৌকায় ধান সংগ্রহ। আছে অতিথি পাখির ঝাঁক, উড়ন্ত মৎস্য শিকারী চিল। সূর্যোদয়, সূর্যাস্তে সূর্যের লাল আলোকচ্ছটা, গোধূলি, বর্ষায় কৃষকদের নৌকায় ধান সংগ্রহের সংগ্রামের আলোকচিত্র। হাওরের পাশ দিয়ে বয়ে চলা নৌকা, তীরবর্তী কোন গ্রামের নিত্যকার গৃহস্থালী খন্ড চিত্র, গায়ের বধূ, বারকি নৌকায় শ্রমজীবী মানুষ। রয়েছে গ্রীষ্মে শিশুদের পানিতে দাপাদাপি, বর্ষায় নৌকা নিয়ে শিশুদের দূরন্তপনা, হাওর-বিলে ভরা শাপলা ফুলের সমারোহ, শুকনো গাছের ডালে ডালে ফাল্গুনের রক্ত রাঙা শিমুল ফুল। টকটকে লাল রঙের এ ফুলটি শুধু মানুষকেই নয়, আকৃষ্ট করে পাখিদেরও। হাওরের মাঝে মাঝে দ্বীপের মতো ছোট ছোট গ্রাম, বাঁশের আড় দিয়ে ঢেউয়ের হাত থেকে ঘরবাড়ি রক্ষার প্রাণান্ত চেষ্টা, নদী হাওরের ভাঙা গড়ার খেলা, মৎস্যজীবীদের জীবন, নদীর দুই তীর, প্রবাহমান স্রোতধারা আর দুই তীরের জনপদ আর পাড়ের মানুষের জীবন সংগ্রামের চিত্র।
তাই তো আলোকচিত্রগুলো দেখে বাংলাদেশ পাবলিক সার্ভিস কমিশনের চেয়ারম্যান, কবি ও গবেষক ড. মোহাম্মদ সাদিক অনুভূতি ব্যক্ত করে পরিদর্শন বইয়ে লিখেন, একজন বিজ্ঞ জেলা প্রশাসক যখন তাঁর সৃজনশীল কর্ম দিয়ে তাঁর চারপাশ আলোকিত করেন, তখন আমরা সেই আলো দেখে মুগ্ধ হই। সুনামগঞ্জের সুযোগ্য জেলা প্রশাসক তাঁর ক্যামেরার চোখে শখের বসে যেসব ছবি তুলেছিলেন, তাঁর এই নিতান্ত শখে বিষয়বস্তুই আলোকিত সুনামগঞ্জের হাওর এলাকার মানুষের জীবন, প্রকৃতি এবং সংগ্রামের মহাকাব্য হয়ে উঠেছে। এই জেলা প্রশাসককে আমি আমার অন্তরের অন্ত:স্থল থেকে উষ্ণ অভিনন্দন জানাই। প্রিয় সাবিরুল ইসলাম একজন সিভিল সার্ভেন্ট, একজন কবি, একজন অসাধারণ আলোকচিত্র শিল্পী। সুনামগঞ্জবাসী আপনাকে তাদের হৃদয়ের ক্যামেরায় চিরকাল সংরক্ষণ করবে।
এ বিষয়ে জেলা প্রশাসক মো. সাবিরুল ইসলাম বলেন, ‘যেখানেই যাই ছবি তুলি। ছোটবেলা থেকেই বই পড়া ও ছবি তোলা ছিল পছন্দের শীর্ষে। শখের বসেই মূলত: ছবি তোলা। প্রাকৃতিক সৌন্দর্যের লীলা ভূমি সুনামগঞ্জ কিছুকিছু ক্ষেত্রে কাশ্মীরকেও হার মানাবে। আমি আলোকচিত্রে সুনামগঞ্জের অপরূপ প্রাকৃতিক সৌন্দর্য্যকেই ফুটিয়ে তোলার চেষ্টা করেছি।’
জেলা শিল্পকলা একাডেমির লোকশিল্প সংগ্রহশালায় আজ সোমবার পর্যন্ত প্রদর্শনী চলবে সকাল ১০টা থেকে সন্ধ্যা ৭টা পর্যন্ত। প্রদর্শনীটি সবার জন্য উন্মুক্ত।