বিজয়ের এক অমর গাথা

স্টাফ রিপোর্টার
পশ্চিম পাকিস্তানি শোষকগোষ্ঠী ও তাদের বলদর্পী হানাদার বাহিনীর বিরুদ্ধে রক্তস্নাত সংগ্রাম শুরুর মধ্য দিয়ে শত শত বছরের আকাঙ্ক্ষা পূরণে অগ্রসর হয়েছিল এই ভূখণ্ডে বঞ্চিত ও শোষিত গণমানুষ। কেবল পাকিস্তানি হানাদার বাহিনী নয়, এ দেশেরই কিছু কুলাঙ্গার সন্তান তাদের পাশে দাঁড়িয়ে আমাদের স্বাধীনতা সংগ্রামের পিঠে ছুরিকাঘাত করেছিল। এক সাগর রক্তের বিনিময়ে অর্জিত স্বাধীন দেশেও তারা বুক ফুলিয়ে চলেছে, গাড়িতে উড়িয়েছে লাখো শহীদের রক্তভেজা লাল-সবুজ পতাকা। স্বস্তির বিষয় হচ্ছে, বিলম্বে হলেও শীর্ষস্থানীয় যুদ্ধাপরাধীদের বিচার সম্পন্ন হয়েছে। আমরা এই দিনে বিনম্র শ্রদ্ধা ও ভালোবাসায় স্মরণ করি বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমান এবং তার সুযোগ্য সহকর্মী জাতীয় নেতাদের। শ্রদ্ধার সঙ্গে স্মরণ করি সব শহীদ ও মুক্তিযোদ্ধাকে। আমরা আশা করি, যে চেতনা নিয়ে একদিন কৃষকের সন্তান অস্ত্র ধারণ করেছিলেন, শ্রমিক কারখানার হাতুড়ি ছেড়ে পাকিস্তান সেনাবাহিনীর বাঙ্কারে অমিত বিক্রমে ঝাঁপিয়ে পড়েছিলেন, ছাত্রছাত্রীরা ছেড়েছিলেন ক্যাম্পাস, নারী সমাজ সামলেছিল ঘর ও বাইরের চ্যালেঞ্জ।
১৯৭০-এর সাধারণ নির্বাচনে আওয়ামী লীগ সংখ্যাগরিষ্ঠ ভোটে জয়লাভ করা সত্ত্বেও বাঙালি জাতির অবিসংবাদিত নেতা বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমানের কাছে পাকিস্তনি সামরিক জান্তা ক্ষমতা হস্তান্তর না করে পাকিস্তানি সেনারা বাঙালি বেসামরিক লোকজনের ওপর গণহত্যা শুরু করে। তাদের এ অভিযানের মূল লক্ষ্য ছিল আওয়ামী লীগসহ তৎকালীন পূর্ব পাকিস্তানের প্রগতিশীল সকল রাজনৈতিক নেতা-কর্মী এবং সকল সচেতন নাগরিককে নির্বিচারে হত্যা করা। মুক্তির জন্য তিরিশ লক্ষ প্রাণ দিতে হয়েছে বাংলাদেশের। রক্তক্ষয়ী এক মহিমাময় মুক্তিযুদ্ধের মধ্য দিয়ে বাঙালি জাতি ও বাংলাদেশ অর্জন করেছে স্বাধীনতা। হাজার বছরের পরাধীনতার অবসান ঘটিয়ে ইতিহাসে এক গৌরবময় অধ্যায় রচনা করেছি আমরা। এ আমাদের চেতনার উজ্জ্বলতম শিখা।
ধর্মভিত্তিক রাজনীতির বিষবাষ্পে আক্রান্ত হয়ে ১৯৪৭ সালে বাঙালি জাতি পা দেয় এক ভয়াবহ চক্রান্তে। দেশভাগের মধ্য দিয়ে শেকড় বিচ্ছিন্ন হয়ে পড়ে লক্ষ বাঙালি; ধর্মবিভেদের হাত ধরে অতি হাস্যকরভাবে পূর্ববাংলা এসে পড়ে পাকিস্তানি সাম্রাজ্যবাদী অপশক্তির হাতে। দীর্ঘ শোষণের হাত থেকে আমরা আরেক হিংস্র শাসকগোষ্ঠীর কুক্ষিগত হই। সেই শৃঙ্খল ভাঙার দৃপ্ত উচ্চারণ বায়ান্নর ২১ ফেব্রুয়ারি। এরপর আর থেমে থাকেনি বাঙালির মুক্তির আন্দোলন। জাতির পিতা বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমানের নেতৃত্বে পাকিস্তানিদের বিরুদ্ধে ধারাবাহিকভাবে বাঙালির প্রতিরোধ ও লড়াই-সংগ্রাম চলতে থাকে। কিন্তু আন্দোলন-সংগ্রামের অগ্রতিরোধ্য জোয়ারকে পাকিস্তানিরা অমানবিকভাবে স্তব্ধ করে দেওয়ার সিদ্ধান্ত নেয়।
১৯৭১ সালের পঁচিশে মার্চ রাতের অন্ধকারে পাকিস্তানি বাহিনী অতর্কিত আক্রমণে দিশেহারা করে দেয় নিরস্ত্র বাঙালিকে। ঢাকা শহর রক্তে প্লাবিত হয়। নির্বিচার নারকীয়তা থেকে রক্ষা পায়নি নারী-পুরুষ-শিশু-যুবক-বৃদ্ধ কেউ। হানাদার পাকিস্তানিরা ভেবেছিল, হত্যা করেই চিরদিনের জন্য স্তব্ধ করে দেওয়া যাবে এ জাতিকে। কিন্তু বাঙালি দেশমাতৃকাকে চিরতরে মুক্ত করতে নরপশুদের সব চক্রান্ত নস্যাৎ করে দেয়; ঘুরিয়ে দেয় ইতিহাসের চাকা। রক্তে লেখা একটি দেশের আত্মপ্রকাশের মুক্তিযুদ্ধ শুরু হয়ে যায় তার পরপরই।
যার যা কিছু আছে তাই নিয়ে বীর বাঙালি হানাদার প্রতিরোধে নেমে যায়। পরিকল্পিত যুদ্ধের ভেতরে দেশের নানা প্রান্তে নানাভাবে প্রতিরোধ গড়ে উঠতে থাকে একাত্তরের মার্চ মাস থেকেই। তারপর নয় মাসে গ্রামে-গঞ্জে-শহরে-বন্দরে রচিত হয় দুঃখ-দুর্দশা-প্রতিরোধ ও বিজয়ের এক অমর গাথা।