বিটিসিএল’র সীমাহীন অকর্মন্যতা

টেলিযোগাযোগের সরকারি প্রতিষ্ঠান বিটিসিএল। আগের বিটিটিবিকে ব্যবস্থাপনাগত উৎকর্ষতা দানের জন্যই বিটিসিএলে রূপান্তর করা হয়। কিন্তু এই রূপান্তরের ফল কী মিলল? ক্রমাগত এই সরকারি প্রতিষ্ঠানের বিভিন্ন সেবার সংকোচন, সেবা মানের অবনমন, গ্রাহক অসন্তুষ্টি তথা ক্রমহ্রাসমান হারে গ্রাহক হারানো। অথচ মানুষের আকাক্সক্ষা ছিল জাতীয় এই প্রতিষ্ঠানটির মাধ্যমে উন্নত মানের ভয়েস-কল ও ইন্টারনেট নির্ভর সেবাসমূহের সুলভ প্রাপ্তি ঘটবে। কিন্তু বাংলাদেশে সরকারি প্রতিষ্ঠান মানেই মাথা-ভারী প্রশাসন, অপ্রয়োজনীয় ব্যয়ের আধিক্য এবং মূল কাজের জায়গায় সীমাহীন স্থবিরতা। আর যেখানে ওই সরকারি প্রতিষ্ঠানটির সাথে বেসরকারি প্রতিষ্ঠানের সেবার প্রতিযোগিতা থাকে তখন সরকারি সেবা-ব্যবস্থাপনার এমন দশা ঘটানো যাতে মানুষ এই প্রতিষ্ঠান ছেড়ে বাঁচে। বাংলাদেশে টেলিযোগাযোগ সেবা প্রাপ্তির ক্ষেত্রে বিটিসিএল ঠিক এই কাজটিই করেছে। সাড়ম্বরে চালু হয়েছিলো টেলিটক নামের সরকারি মোবাইল ফোন প্রোভাইডার। মানুষ দেশপ্রেমে উজ্জীবিত হয়ে রাত জেগে লাইনে দাঁড়িয়ে টেলিটকের সিমকার্ড কিনেছিল। সেই টেলিটক এখন মুমূর্ষু অবস্থায় কোনরকম শ্বাস টিকিয়ে রেখেছে। সরকারি টেলিফোন সেবাটির আধুনিকায়ন, কলরেট হ্রাস ইত্যাদি ব্যবস্থা গ্রহণের পরও প্রতিদিনই মানুষ টেলিফোন সংযোগ বন্ধ করে দিচ্ছে। বিটিসিএল এরপর চালু করেছিল ব্রডব্যান্ড ইন্টারনেট সেবা। সেই সেবার হাল ভুক্তভোগীরা হাড়ে হাড়ে টের পাচ্ছেন। সরকারি এই ইন্টারনেটের গতি কচ্ছপের গতিকেও হার মানায় আর প্রায়সময়ই থাকে বন্ধ। একদা দূর্দন্ড প্রতাপশালী এই সরকারি প্রতিষ্ঠানটির বর্তমান অধঃপতন দেখে সত্যিই খারাপ লাগে। মানুষ বাধ্য হয়ে জাতীয় প্রতিষ্ঠানের বদলে কর্পোরেট প্রতিষ্ঠানের সেবা কিনে নিজের টাকা বাইরে যাওয়ার সুযোগ করে দিচ্ছে। সেই পাচারপর্ব আটকানোর বিন্দুমাত্র আগ্রহ নেই বিটিসিএল’র।
উপরের এত কথা বলার কারণ হলো, সুনামগঞ্জে বিটিসিএল’র টেলিফোন সার্ভিস ২৬ আগস্ট থেকে বন্ধ হয়ে পড়ে। একই সাথে ওই তারিখে থেকে বন্ধ হয় ইন্টারনেট সেবাও। এ নিয়ে গতকাল দৈনিক সুনামগঞ্জের খবরে একটি সংবাদ প্রতিবেদন প্রকাশ হয়। এতে যদিও বিটিসিএল ইন্টারনেট সেবা একদিন পর থেকে চালু হওয়ার দাবি করেছে কিন্তু গ্রাহক পর্যায় থেকে জানা গেছে এই চালু হওয়া না হওয়ারই নামান্তর। অন্যদিকে বিটিসিএল স্পষ্ট করতে পারেনি আকস্মিকভাবে কেন টেলিফোন সেবা বন্ধ হয়ে গেল কিংবা কবে এই সেবা পুনরায় চালু সম্ভব সেই নিশ্চয়তাও দিতে পারেননি স্থানীয় কর্মকর্তারা। মানুষের দৈনন্দিন জীবনে অপরিহার্য একটি সেবা নিয়ে সরকারি প্রতিষ্ঠানটির কেমন রসিকতা। এমন রসিকতা বোধ করি বাংলাদেশেই সম্ভব। ওই সংবাদ থেকে জানা যায় সুনামগঞ্জে টেলিফোন গ্রাহকের সংখ্যা মাত্র ১৬০০ এবং ইন্টারনেট সেবাগ্রহণকারীর সংখ্যা ২৯১ জন। এই পরিমাণ গ্রাহক যেকোনো মোবাইল প্রোভাইডারের এখন একটি ছোট গলিতেও রয়েছে। অথচ বিশাল প্রাতিষ্ঠানিক সুবিধাসম্পন্ন বিটিসিএল’র গ্রাহক সারা জেলায়ই এই কয়জন মাত্র। এমন দৈন্য দশার জন্য তাদের লজ্জিত হওয়া উচিত। কিন্তু সম্ভবত লজ্জিত হওয়া তাদের অভিধানে নেই।
সংবাদে ভুক্তভোগী গ্রাহকদের পক্ষ থেকে যে সর্বজনজ্ঞাত বিষয়টি পুনরায় উঠে এসেছে তা হল, বিটিসিএল’র দুর্নীতিবাজ কর্মকর্তা/কর্মচারীরা ইচ্ছা করেই এই অবস্থা করে রেখেছেন। কর্পোরেট প্রতিষ্ঠানগুলোর সাথে তাদের রয়েছে অনৈতিক যোগাযোগ। এই যোগাযোগের ফলেই সরকারি প্রতিষ্ঠানটি আজ অথর্ব প্রতিষ্ঠানে পরিণত হয়েছে বলে মনে করেন ভুক্তভোগীরা।
একটি সরকারি প্রতিষ্ঠানের এমন অবস্থা কাক্সিক্ষত নয়। আমরা চাই সরকারি এই প্রতিষ্ঠানটি পুরোমাত্রায় কার্যকরী হয়ে উঠুক। এতে বেসরকারি কোম্পানিগুলোর একাধিপত্যকে রুখা সম্ভব। এজন্য বিটিসিএল’র ভিতরের ইঁদুরগুলোকে তাড়াতে হবে সর্বাগ্রে। এই আশাবাদ থেকে আমরা কামনা করি দ্রুত সুনামগঞ্জে বিটিসিএল’র টেলিফোন ও ইন্টারনেট সেবার সংকট দূরীভূত হোক।