বিদেশে সলিল সমাধি ঠেকাতে দেশে কর্মসংস্থান তৈরি করতে হবে

লিবিয়া থেকে ইতালি যাওয়ার পথে তিউনেসিয়ার উপকূলবর্তী ভূমধ্যসাগরে নৌকাডুবিতে মারা গেছেন ৬০ জন ভাগ্যবিড়ম্বিত মানুষ। এই ৬০ জনের মধ্যে এ পর্যন্ত প্রাপ্ত তথ্য মতে বাংলাদেশি নাগরিক সংখ্যা ৩৯ জন, যার ৭ জন সিলেট বিভাগের আর ২ জন সুনামগঞ্জের। সুনামগঞ্জের ২ জনের একজন নাজিম উদ্দিন ছাতকের নূরুল্লাপুরের, অপরজন মাহবুব দিরাইর চন্ডিপুরের বাসিন্দা। এরা সকলেই বিদেশ পারি দিয়েছিল একটি নিশ্চিত জীবনের সন্ধানে। যে জীবনে থাকবে না অভাববোধ। দেশে জীবন গড়ার পথ না পেয়ে এরা দেশ ছেড়েছে। ইউরোপের স্বাচ্ছন্দ্য আর নিশ্চয়তার হাতছানিতে এরা জীবনের ঝুঁকি নিয়ে ছোট্ট নৌকায় চড়ে একটি মহাসাগর পারি দেয়ার বিপদসংকুল পথ বেছে নিয়েছিল। কী নিদারুণ জীবন এদের। এই তরুণরা নিজের ও পরিবারের দুঃখ-কষ্ট ঘুচাতে নিজেদের জীবনকেই উৎসর্গ করল। বলাবাহুল্য এমন ঘটনা আকছারই ঘটছে। বেআইনি পথে বিদেশ গমন করে সে দেশের জেলে পচে মরছে কত নাগরিক, লুকিয়ে-পালিয়ে দৌঁড়ের উপর রয়েছে আরও কত ভাগ্যহীন বাংলাদেশি সেই হিসাব আমরা কেউ করি না। অথচ এদেরই পাঠানো রেমিটেন্স আমাদের অর্থনীতিকে ফুলিয়ে ফাঁপিয়ে রেখেছে। আমরা তাঁদের জন্য উন্নয়নের বড়াই করি। জীবনের ঝুঁকি নিয়ে তারা যে বৈদেশিক মুদ্রা পাঠাচ্ছেন দেশে, সেই অর্থনৈতিক উন্নয়নের সিংহভাগ কি সুনিপুণ কায়দায় আত্মসাৎ করে চলেছে ক্ষুদ্র একটি গোষ্ঠী তা আমরা চোখের সামনেই দেখতে পাচ্ছি। কিন্তু দেশে কর্মহীন হয়ে বিদেশমুখী এই জন¯্রােত আটকাতে আমরা দেশের অভ্যন্তরে নিচ্ছি না কোন কার্যকরী ব্যবস্থা। এমনকি কষ্টে অর্জিত এই উন্নতি হা করা রাক্ষসদের খপ্পর থেকে রক্ষা করতেও পারছি না আমরা। এমন এক বাস্তবতায় বিদেশমুখী এই জন¯্রােত আটকানোর সাধ্য কার আছে? সুতরাং আমরা নির্দ্বিধায় বলতেই পারি, এমন বহু মৃত্যু আমাদের দেখে যেতে হবে অসহায়ভাবে।
দেশ থেকে মেধাবীরা চলে যাচ্ছে বিদেশে। দেশ থেকে কর্মোদ্যম তরুণরা চলে যাচ্ছে বিদেশে। এমনকি নারীরাও যাচ্ছে দলে দলে। সকলেই যাচ্ছে, তাহলে দেশটি গড়বে কারা? মেধাবীদের ধরে রাখতে পারলে মৌলিক উন্নয়নের পথে হাঁটার সুযোগ তৈরি হত। তরুণরা থাকলে সেখানে তারা শ্রম নিয়োজিত করতে পারত। কিন্তু তা হচ্ছে কই? এক, সস্তা শ্রমের গার্মেন্টস আর কপি পেস্ট করা কিছু শিল্প নিয়ে আমাদের যত বড়াই। অসংখ্য মেধাবীর এই দেশে কেউ নিজ দেশে বসে মৌলিক কোন কিছু আবিষ্কার করার সুযোগ পাচ্ছে না। অথচ এরাই বিদেশে ক্যানসার শনাক্তকরণের মেশিন উদ্ভাবন করছে, পাটের জীবনরহস্য উন্মোচন করছে, জ্ঞানের নানা শাখায় নতুন ও মৌলিক আবিষ্কারে অন্য দেশকে সমৃদ্ধ করছে। এদের ধরে রাখার ব্যবস্থা করতে না পারলে প্রিয় এই দেশটিকে প্রকৃত অর্থে উন্নয়নের শিখরে নিয়ে যাওয়া কোন অবস্থাতেই সম্ভব নয়। বিষয়টি যতদিন আমাদের রাজনীতিবিদদের উপলব্ধিতে না আসবে ততদিনই ভূমাধ্যসাগরের সলিল সমাধি আর অসংখ্য মায়ের আহাজারি, সন্তানহারা পিতার বিলাপ সহ্য করে যেতে হবে আমাদের।
ভূমধ্যসাগরে নৌকাডুবিতে নিহতদের প্রতি আমাদের হৃদয় নিংড়ানো শ্রদ্ধা। দেশে থাকা তাঁদের পরিবার-স্বজনদের প্রতি সহনাভূতি। তবে সবচাইতে বড় দাবি জানাই সরকারের প্রতি। আমাদের সম্ভাবনাময় এই জনশক্তিকে দেশে রেখে কাজে লাগানোর ব্যবস্থা করার দাবি জানাই আমরা সরকারের কাছে। যেসব দালালদের প্রতারণার কারণে এইসব তাজা প্রাণ ঝরে গেল তাদের বিচারের দাবিও আমরা সমানভাবে উচ্চারণ করছি। নিহতদের পরিবারগুলো যাতে উপযুক্ত ক্ষতিপূরণ পায় সেই ব্যবস্থা করতে হবে সরকারকেই।