বিদ্যুতের অদ্ভুত টোকেন নম্বর, সরকারি খাতের ডিজিটাল ব্যবস্থাপনার হতাশাজনক চিত্র

বিদ্যুতের প্রিপেইড মিটারে টাকা ঢুকাতে ১৮০ টি নম্বর চাপা, আবার ২০ টি নম্বর পর পর এন্টার বোতাম চাপা, এই সেক্টরের আইটি বিশেষজ্ঞদের দক্ষতার পরিচয় বহন করে না। এই ধরনের বিড়ম্বনা তৈরিকারী জটিল টোকেন নম্বর চাপতে গিয়ে সমস্যায় পড়ছেন বিদ্যুৎ গ্রাহকরা। এজেন্টদের অনেকে বিদ্যুতের অগ্রিম বিল নেয়া বন্ধ করে দিচ্ছেন। প্রিপেইড মিটারে টাকা ঢুকানোর এই বিড়ম্বনা নিয়ে গতকাল দৈনিক সুনামগঞ্জের খবরে একটি সংবাদ প্রকাশিত হয়েছে। ডিজিটাল ব্যবস্থাপনা প্রচলিত অন্য সব ধরনের ব্যবস্থাপনার চাইতে সহজ ও জনবান্ধব বলে প্রচারিত হয়। কিন্তু বিদ্যুৎ বিভাগের এ কেমন ডিজিটাল ব্যবস্থাপনা? জানা গেছে, বিদ্যুতের নতুন রেইট কার্যকর করতে যেয়ে এমন লম্বা টোকেন নম্বরের আগমন ঘটেছে এবং এই ধারা গ্রাহকদের একবারই সইতে হবে। কিন্তু এই এক বারেই যে গ্রাহকদের যন্ত্রণা বেড়ে গেছে তা ওই সংবাদ পড়লে বেশ ভালভাবে বুঝা যায়। তথ্যপ্রযুক্তি বিষয়ে কোনো বিশেষায়িত জ্ঞান না থাকা সত্তে¡ও আমরা বলতে পারি, বিদ্যুৎ বিভাগের বিশেষজ্ঞরা একটু সচেতন থাকলে এই ধরনের বিড়ম্বনা এড়াতে পারতেন। অন্য যেসব সেক্টরে ডিজিটাল ব্যবস্থাপনা চালু রয়েছে, কই তারা তো এমন অদ্ভুত পদ্ধতি প্রয়োগ করে না। কিছুদিন আগে সরকার মোবাইল কলের উপর কর বসিয়েছে। মোবাইল প্রোভাইডাররাও নিজেদের সেবামূল্য বাড়িয়েছে এবং বর্ধিত হার তাদের প্রচলিত সিস্টেমে অন্তর্ভূক্তও করে নিয়েছে। তারা যে পরিবর্তনটি করেছে তা কিন্তু মোবাইল গ্রাহকরা টেরও পাননি। এমন আরও উদাহরণ দেয়া যেতে পারে। তারা যদি পরিবর্তিত সিস্টেমে নিজেদের ডিজিটাল ব্যবস্থাপনা কোনো বাড়তি উপদ্রব ছাড়াই আপডেট করে নিতে পারে তাহলে বিদ্যুৎ বিভাগ কেন পারবে না, এই প্রশ্ন আমরা সংগত কারণেই করতে পারি। বিদ্যুৎ বিভাগের এজন্য মন খারাপ করার কিছু নেই। এ নিয়ে কথা বলার অর্থ হলো, সরকারি সেক্টরের সেবার মান বাড়ানোর আকাক্সক্ষাপ্রসূত। আমাদের সরকারি সেবা সেক্টরের প্রায় প্রতিটি ক্ষেত্রেই ব্যবস্থাগুলোকে এমন জটিল করে রাখা হয় যে সেখানে সাধারণ মানুষদের প্রতিনিয়ত বেগ পেতে হয়। সরকারি সেক্টরের ব্যবস্থাপনাকে ডিজিটাল রূপান্তরের মাত্রাও বেসরকারি সেক্টরের চাইতে অনেক কম। অনেকেই বলে থাকেন, ইচ্ছা করেই সিস্টেমকে জটিল করে রাখা হয় যাতে সেবাগ্রহীতাকে সরকারি কর্মচারিদের সাথে ব্যক্তিগত সংযোগে আসতে হয়। সেবা দান ও গ্রহণের ক্ষেত্রে এই ব্যক্তিগত যোগাযোগগুলো নানা ধরনের উপসর্গের উদ্ভাবক। আমরা যেসব নেতিবাচক প্রবণতার হাত থেকে নিস্তার পেতে চাই, যেমনÑকাজের দীর্ঘসূত্রিতা, হয়রানি, দুর্নীতি; এর সবকিছুর পিছনেই এই ব্যক্তিগত যোগাযোগ সরাসরি ভূমিকা পালন করে। ডিজিটাল ব্যবস্থাপনার উদ্দেশ্য ছিল সেবাদান ও গ্রহণ প্রক্রিয়ার এই ব্যক্তিগত যোগাযোগ বন্ধ করে দেয়া। বেসরকারি সেক্টরে এই কাজটি যত গতি পেয়েছে দুর্ভাগ্যজনকভাবে সরকারি খাতে সেই গতি পেতে আরও বহু সময় লাগবে। অথচ আমাদের সক্ষমতার অভাব রয়েছে এমন কথা বলার কোনো অবকাশ নেই। যে বিশেষজ্ঞরা বেসরকারি খাতকে গতিশীল করে রেখেছেন তাদের অধিকাংশই বাংলাদেশি। এর মানে হলÑ বাংলাদেশিদের সেই যোগ্যতা আছে। শুধু তাদেরকে উপযুক্তভাবে ব্যবহার করার জায়গায় ব্যত্যয় রয়েছে। এই ব্যত্যয়টুকু দূর করার অভিলাষ থেকেই মূলত বিদ্যুতের প্রিপেইড মিটারের জটিল টোকেন নম্বর নিয়ে এত আলোচনার মূল কারণ।
একটি বেসরকারি মোবাইল প্রোভাইডারের নিকট কয়েক হাজার কোটি টাকা পাওনা নিয়ে যে জটিল পরিস্থিতির উদ্ভব ঘটেছে সেই পরিস্থিতি কখনও দেখা যেত না যদি শুরু থেকে আমরা ওই প্রোভাইডারের সিস্টেমের উপর প্রযোজ্য নিয়ন্ত্রণ ধরে রাখতে পারতাম। আমরা জানি না, আমাদের এই আহাজারি সংশ্লিষ্টদের কানে পৌঁছাচ্ছে কিনা। আমরা চাই সরকারি খাতের ব্যবস্থাপনা অন্যদের জন্য আদর্শ ও অনুসরণযোগ্য হোক। তবেই না সরকার সবকিছুর উপর নিজের নিয়ন্ত্রণ ধরে রাখতে পারবে।