- সুনামগঞ্জের খবর » আঁধারচেরা আলোর ঝলক - http://sunamganjerkhobor.com -

বিদ্যুৎঝুঁকির কারণে মৃত্যুর ফাঁদ পাতা ভুবন

সাম্প্রতিক বছরগুলোতে বিভিন্ন জনপদে বিদ্যুৎস্পৃষ্ট হয়ে মানুষ মারা যাওয়ার দুর্ঘটনা উদ্বেগজনকভাবে বেড়ে চলেছে। গতকাল দৈনিক সুনামগঞ্জের খবরে প্রকাশিত একটি সংবাদ থেকে জানা যায়, বুধবার জেলার জগন্নাথপুর ও ছাতক উপজেলায় বিদ্যুৎস্পৃষ্ট হয়ে তিন ব্যক্তি মারা গেছেন। জগন্নাথপুরে দুই নৌকার শ্রমিক মারা গেছেন নৌপথে বিপদজনক উচ্চতায় অবস্থিত বিদ্যুতের তারে লেগে। অন্যদিকে ছাতকে এক শিশুর মৃত্যু হয়েছে অনিরাপদ বিদ্যুৎ সংযোগের ফলে। বলাবাহুল্য গত কয়েকদিনে বেশকিছু মুত্যুঘটনা সংবাদপত্রের পাতায় আমরা দেখেছি। সারা দেশের আনাচে-কানাচে বিদ্যুৎ সঞ্চালন লাইন সম্প্রসারিত হচ্ছে। সরকারের শতভাগ বিদ্যুতায়ন কর্মসূচীর আওতায় এসব লাইন নির্মিত হচ্ছে। বিদ্যুৎস্পৃষ্ট হয়ে মৃত্যুর ঘটনা বেড়ে যাওয়ার পিছনে কি এই অগ্রগতিই দায়ী? যে অগ্রগতি মানুষের জন্য বিপদ ঢেকে আনে সেই অগ্রগতি অবশ্যই আরও কীভাবে নিরাপদ করা যায় তা ভাবতে হবে। বিদ্যুৎ সঞ্চালন ব্যবস্থা সর্বাবস্থায় একটি ঝুঁকিপূর্ণ ব্যবস্থা। তাই এক্ষেত্রে সর্বোচ্চ নিরাপত্তা ব্যবস্থা বজায় রাখা জরুরি। কিন্তু আমরা লক্ষ করছি নতুন বিদ্যুৎ সঞ্চালন লাইন নির্মাণের ক্ষেত্রে যথেষ্ট অবহেলা করা হচ্ছে। বিশেষ করে হাওরের উপর দিয়ে টানানো বিদ্যুতের তার বর্ষায় পানিস্তরের কাছাকাছি চলে আসে অনেক সময়। বিভিন্ন গ্রামের উপর দিয়ে যাওয়া বিদ্যুৎ লাইনের ক্ষেত্রেও এমন অভিযোগ রয়েছে। এছাড়া বিদ্যুতের খুঁটিগুলো বসানোর সময় যথেষ্ট দৃঢ়করণ করা হয় না। এরকম অনিরাপদ বিদ্যুৎ পরিকাঠামোর কারণে বিদ্যুৎস্পৃষ্ট হয়ে মানুষ মৃত্যুর সংখ্যা বেড়ে যাচ্ছে। তাই সময় থাকতেই সাবধানতা অবলম্বন না করলে এই বিদ্যুতের লাইনগুলো আরও বহু মৃত্যুর কারণ হবে নিশ্চিতভাবেই।
বিদ্যুৎ বিভাগের (পল্লী বিদ্যুৎ ও পিডিবি) অবহেলাজনিত কারণে অনিরাপদ লাইনে বিদ্যুৎস্পৃষ্ট হয়ে মৃত্যুর জন্য কেউ দায় গ্রহণ করেন না। অথচ সঞ্চালনের দায়িত্বে নিয়োজিত প্রতিষ্ঠানগুলোর এই দায় গ্রহণ করা উচিত। যেসব হতভাগ্য ব্যক্তি বিদ্যুৎস্পৃষ্ট হয়ে মারা যান তাদের অধিকাংশই দরিদ্র শ্রেণির কর্মজীবী। এদের পরিবার মৃত্যুজনিত ক্ষতিপূরণ আদায়ে প্রতিষ্ঠানগুলোর বিরুদ্ধে আইনগত প্রতিকার চাওয়ার জটিল প্রক্রিয়াগুলো অনুসরণ করতে পারেন না। অসহায় মানুষের এই অসহায়ত্বের সুযোগ নিয়ে অমানবিকভাবে দুর্ঘটনাজনিত মুত্যুগুলোর দায়িত্ব এড়িয়ে যাওয়া সম্ভব হচ্ছে। এক্ষেত্রে রাষ্ট্র বা সরকার অসহায় নাগরিকের পাশে দাঁড়াচ্ছে না। তাই মৃত্যুর ফাঁদ পাতা ভূবনে বেঘোরে প্রাণ হারাচ্ছে দুর্বল মানুষগুলো। এই যে অন্যের অবহেলার কারণে প্রাণ দিলেও ক্ষতিপূরণ না পাওয়ার বাস্তবতা তা কিন্তু অনুন্নত রাষ্ট্রের বৈশিষ্টসমৃদ্ধ। উন্নত রাষ্ট্রে এরকম অবস্থা চিন্তাও করা যায় না। আমরা যখন দেশের উন্নয়নের কথা বলি তখন অবশ্যই নাগরিকদের মানবিক অধিকার প্রতিষ্ঠার মৌলিক বিষয়গুলো প্রতিষ্ঠা করাও অবশ্য কর্তব্য বটে। সেই অবস্থা কবে আসবে?
একই সাথে নজর দিতে হবে নিরাপদ বিদ্যুৎ পরিকাঠামো গড়ে তোলার দিকে। এবং অবশ্যই এই বিষয়টিই সর্বাধিক গুরুত্বপূর্ণ। মানববসতিতে স্থাপিত বিদ্যুৎ সঞ্চালন লাইনের মতো ঝুঁকিপূর্ণ পরিকাঠামো স্থাপনের ক্ষেত্রে কোনো ধরনের ব্যত্যয় গ্রহণযোগ্য নয়। সঞ্চালন লাইন নির্মাণের প্রতিটি স্তরে নিরাপত্তা ব্যবস্থা যথাযথ মানে রক্ষিত হচ্ছে কিনা সেটি নিবিড় পর্যবেক্ষণ ও তদারকিতে রাখা গুরুত্বপূর্ণ। শতভাগ বিদ্যুতের সাথে শতভাগ নিরাপত্তা ব্যবস্থাও একই সাথে গড়ে তোলতে হবে। নতুবা এমন দুর্ভাগ্যজনক মৃত্যু সফলতার অহংকারকে বিষাদে পরিণত করবে প্রতিনিয়ত। মুত্যুর বিনিময়ে কোনো উন্নয়নই প্রত্যাশিত নয়। সব উন্নয়নই মানুষের উপভোগের জন্য। মৃত্যু উপভোগের উপলক্ষ নয়।