বিদ্যুৎ ব্যবস্থার আশু উন্নতিকল্পে সরকারের সুদৃষ্টি কামনা করি

এই যুগে বিদ্যুৎহীন ঘণ্টা বা দিন কল্পনারও বাইরে। শরীরের রক্ত সঞ্চালন ব্যবস্থার মতই বিদ্যুৎ হয়ে উঠেছে জীবনের অপরিহার্য সিস্টেম। বিদ্যুৎ নেই তো কিছুই নেই। উৎপাদন বন্ধ। সেবা বন্ধ। প্রাত্যহিকতা বন্ধ। মানুষের জীবন চরম বিরক্তিতে ভরে তুলে বিদ্যুৎহীন ঘণ্টাগুলো। বর্তমান সরকার তাই বিদ্যুৎকে সর্বোচ্চ অগ্রাধিকারযোগ্য খাত হিসাবে এর উন্নয়নের প্রতিশ্রুতি দিয়েছিলেন। সরকার কথা রেখেছিলেন। প্রত্যন্ত গ্রাম পর্যন্ত পৌঁছে দেয়া হয়েছে বিদ্যুতের সঞ্চালন লাইন। নানামুখী স্বল্প, মধ্যম ও দীর্ঘমেয়াদী পরিকল্পনা বাস্তবায়নের মাধ্যমে বিদ্যুতের উৎপাদন উল্লেখযোগ্য পরিমাণে বাড়াতে সক্ষম হয়েছিল সরকার। গ্রামের কুপিবাতির ম্লান আঁধারকে দূর করে সচকিত হাসির বিদ্যুৎ পৌঁছে গিয়েছিলো সর্বত্র। কিন্তু এখন বুঝি এই অতিরিক্ত সঞ্চালন ব্যবস্থাই কাল হলো। রাশিয়া-ইউক্রেন যুদ্ধের অভিঘাতে জ্বালানী তেলের অস্বাভাবিক মূল্যবৃদ্ধি এবং অভ্যন্তরীণভাবে ডলারের তুলনায় টাকার ব্যাপক অবমূল্যায়ন ঘটার প্রেক্ষাপটে গত জুলাই-আগস্ট মাস থেকে ব্যাপকভাবে বিদ্যুত সরবরাহে ঘাটতি তৈরি হয়। সারা দেশে লোডশেডিংয়ে যেতে বাধ্য হয় বিদ্যুৎ উন্নয়ন কর্তৃপক্ষ। ঢাকার বাইরে বিশেষ করে মফস্বল জেলা সদর ও উপজেলা সদরসহ গ্রামগুলোতে লোডশেডিংয়ের তীব্রতা মানুষের জন্য দুর্বিসহ বিপর্যয়ের কারণ হয়ে উঠে। লোডশেডিংয়ের যে শিডিউল করা হয় তা অনুসরণ করা সম্ভব হয়নি কোথাও। ফলে কখন বিদ্যুৎ আসবে আর কখন যাবে এই হিসাব মিলাতে পারে না মানুষ। মাঝখানে পরিস্থিতির কিছুটা উন্নতির আভাস পাওয়া যায়। আন্তর্জাতিক বাজারে জ্বালানী তেলেরও দাম ব্যাপকভাবে হ্রাস পায়। মানুষ ভেবেছিল দুর্দিন বুঝি শেষ হয়ে গেছে। কিন্তু মানুষ ভাবে এক আর হয় আরেক। গত সপ্তাহ থেকে বিদ্যুতর লোডশেডিং আবারও তীব্রতা পেতে শুরু করে।
গতকাল দৈনিক সুনামগঞ্জের খবরে সুনামগঞ্জে লোডশেডিংয়ের তীব্রতা বিষয়ে একটি প্রতিবেদন প্রকাশিত হয়েছে। প্রতিবেদনে সুনামগঞ্জের বিশিষ্টজনরা চলমান লোডশেডিংকে গত ১০ বছরের মধ্যে সবচাইতে ভয়াবহ উল্লেখ করে তারা এ থেকে পরিত্রাণের আকাক্সক্ষা ব্যক্ত করেছেন। একে তো জলবায়ু পরিবর্তনের প্রতিক্রিয়ায় আশ্বিন মাসেও চরম গরমে হাঁসফাঁস অবস্থা মানুষের। এর মধ্যে সারাদিন বিদ্যুতের আসা-যাওয়া চলতে থাকায় নাগরিক জীবনে নেমে আসে অসহনীয় দুর্ভোগ। বিদ্যুৎনির্ভর ব্যবসা ও উৎপাদনখাতগুলো পড়ে চরম দুর্যোগে। এরকম অচলাবস্থার অবিলম্বে সমাধান দরকার। প্রত্যন্ত পল্লী পর্যন্ত মানুষকে বিদ্যুৎ ব্যবহারের অভ্যাস গড়ে তোলার আগে উচিৎ ছিলো এর সরবরাহ নিশ্চিত করার সম্ভাব্যতা যাচাই করা। একবার বিদ্যুৎ ব্যবহারে অভ্যস্ত জনগোষ্ঠীকে পুনরায় কুপিবাতির ম্লান আলোয় নিয়ে যাওয়া সম্ভব নয়। তাই বিদ্যুৎ এর উৎপাদন বাড়ানোর দিকে অবশ্যই মনোযোগী হতে হবে। নতুবা মানুষের প্রাত্যহিক বিড়ম্বনাজনিত ক্ষোভ বাড়তে থাকবে।
একান্ত প্রয়োজনে বিদ্যুতের লোডশেডিং বিশ্বব্যাপী স্বীকৃত একটি পন্থা। এর জন্য কথা ও কাজে মিল থাকতে হবে। লোডশেডিংকে সমতাপূর্ণ অবস্থায় নিতে হবে। কোনো এলাকায় কম আর কোনো এলাকায় বেশি সময় লোডশেডিং করার অসম দৃষ্টিভঙ্গি জনক্ষোভকে আরও বাড়িয়ে তুলে। সুনামগঞ্জের খবরের সংবাদে এরকম অসম লোড ব্যবস্থাপনার বিষয়টি উল্লেখ করে কয়েক ব্যক্তি অসন্তোষ প্রকাশ করেছেন। সরকারকে মনে রাখতে হবে, বিদ্যুৎ না থাকলেও মানুষ বিকল্প ব্যবস্থায় বিদ্যুৎ এর ব্যবস্থা করতে চায়। এজন্য রিচার্জেবল ইলেকট্রিক সামগ্রী, আইপিএস, জেনারেটর ইত্যাদির ব্যবহার এখন বেড়ে গেছে। এসব বিকল্প ব্যবস্থা অবলম্বনের ফলে জ্বালানী, বৈদেশিক মুদ্রা ও বিদ্যুতের উপর চাপ ক্রমাগত বাড়ছে। যে উদ্দেশ্য নিয়ে জ্বালানীভিত্তিক বিদ্যুতের উৎপাদন নিয়ন্ত্রণ করা হয়েছিলো এসমস্ত কারণে সেই উদ্দেশ্য ব্যাহত হতে বাধ্য। বরং এর ফলে নাগরিকদের অতিরিক্ত খরচ করতে হচ্ছে যা আখেরে কুফলদায়ী। সুতরাং বিদ্যুৎ ব্যবস্থার আশু উন্নতিকল্পে আমরা সরকারের সুদৃষ্টি কামনা করি।