বিভিন্ন অনুষ্ঠানে শিক্ষার্থীদের বাধ্যতামূলক উপস্থিতির প্রবণতা বন্ধ করুন

সাম্প্রতিক কালে বিভিন্ন সরকারি কর্মসূচীতে শিক্ষার্থীদের বাধ্যতামূলক উপস্থিত করানোর প্রবণতা উদ্বেগজনক মাত্রায় বেড়ে গেছে। সরকারি কর্মসূচীগুলোতে লোক সংখ্যা বাড়াতে বিভিন্ন বিদ্যালয়ের শিক্ষকদের বাধ্যতামূলকভাবে শিক্ষার্থীদের উপস্থিত থাকতে বলা হয়ে থাকে। শুধু সরকারি কর্মসূচী নয়, এখন দেখা যাচ্ছে বেসরকারি প্রতিষ্ঠানের কর্মসূচীতেও শিক্ষার্থীদের এনে হাজির করা হচ্ছে। বৃহস্পতিবার তাহিরপুরের মোয়াজ্জেমপুর নামক স্থানে একটি বেসরকারি সংগঠন আয়োজিত জেলে ও কৃষক সম্মেলনে শিক্ষার্থীদের দুর্ভোগ নিয়ে স্থানীয় একটি দৈনিকে সংবাদ প্রকাশিত হয়েছে। এসব অনুষ্ঠানে শিক্ষার্থীদের ঘণ্টার পর ঘণ্টা বসে থাকতে হয়। উপস্থিতি সংখ্যা বাড়ানোর এমন কৌশলকে আমরা অমানবিক মনে করি। আদালতের রায় রয়েছে, আমাদের জানা মতে সুনামগঞ্জেও অনুরূপ একটি রায় আছে, যেখানে এভাবে শিক্ষার্থীদের দাঁড় করিয়ে রাখার উপর নিষেধাজ্ঞা আরোপিত আছে। কিন্তু বাস্তবে ওই রায়ের কোন প্রতিফলন দেখা যাচ্ছে না। বহু অনুষ্ঠান আছে যেখানে শিক্ষার্থীরা অংশগ্রহণ করলে তাদের জানা ও জ্ঞানের পরিধি বিস্তৃত হবে। সেসব অনুষ্ঠান নিয়ে আমাদের কোন কথা নেই। কিন্তু এমন অনেক অনুষ্ঠান রয়েছে যেসব জায়গায় শিক্ষার্থীদের অংশগ্রহণ কেবল ফাঁকা চেয়ার ভর্তি করা, সেসব জায়গায় শিক্ষার্থীদের বাধ্যতামূলক উপস্থিতি পরিহার করা উচিৎ বলেই আমরা মনে করি।
সকল প্রকার অনুষ্ঠানেরই কিছু উদ্দীষ্ট জনগোষ্ঠী থাকে। সমাবেশ বা অনুষ্ঠানমালায় ওই ধরনের জনগোষ্ঠীর অংশগ্রহণই বাঞ্ছনীয়। যেমন তাহিরপুরে অনুষ্ঠিত জেলে ও কৃষক সম্মেলনের নামের মধ্যেই উদ্দীষ্ট জনগোষ্ঠীর পরিচয় রয়েছে। ওই সমাবেশে হাওরের জেলে ও কৃষক সম্প্রদায়ের উপস্থিতির বাইরে শিক্ষার্থীদের কেন এনে হাজির করা হল তা আমাদের বোধের অগম্য। অনুষ্ঠানগুলোতে দায়িত্বশীল যারা অংশগ্রহণ করেন তাঁদেরকে এই প্রবণতাকে নিরুৎসাহিত করতে হবে। মূলত উদ্দীষ্ঠ জনগোষ্ঠীকে উপস্থিত করানোর ব্যর্থতা থেকেই আমরা সহজ পথ বেছে নেই। আদেশ দিলে যারা উপস্থিত থাকতে বাধ্য সেই খাতগুলোর দিকেই হাত বাড়ানো হয়ে থাকে। এতে করে অনুষ্ঠানগুলোর যে উদ্দেশ্য তা পূরণ হয় না । নিছক অনুষ্ঠান করার খাতিরে অনুষ্ঠান করার এই মানসিকতা ত্যাগ করা না হলে সরকার যে উদ্দেশ্যে নানা আয়োজন করে থাকে তার উদ্দেশ্য কখনও সাধিত হবে না।
এইসব অনুষ্ঠানে কয়েক ঘণ্টা এমন কি দিন কাবার বসে থাকার কারণে শিক্ষার্থীদের মনে ও দেহে যে সমস্যা তৈরি হয় তা তাদের শিক্ষা জীবনে বিরূপ প্রভাব ফেলে। দীর্ঘসময় অবস্থানের কারণে তারা শারীরিকভাবে ক্লান্ত হয়ে পড়ে। বিশেষ করে রোদে বা খোলা স্থানে এরূপ সমস্যা আরও বেশি হয়। এছাড়া ক্ষুধা, মলমুত্র ত্যাগ এমন সমস্যাগুলো তো রয়েছেই। অন্যদিকে এটি শিশু শিক্ষার্থীদের মানসিকতায়ও খারাপ প্রভাব রাখে। অভিভাবকরা স্পষ্টতই এরূপ বাধ্যতামূলক উপস্থিতির বিরুদ্ধে। কিন্তু শিক্ষা প্রতিষ্ঠান কর্তৃপক্ষের চাপের কারণে তারা নিরুপায় হয়ে নিজ সন্তানদের এমন বিড়ম্বনা নিরবে দেখে যান।
সরকারি দায়িত্বশীল মহলকে বিষয়টি নিয়ে সক্রিয়ভাবে চিন্তা ভাবনা করতে হবে। মনে রাখতে হবে সাধারণ মানুষকে উপস্থিত করানোর ব্যর্থতা আড়াল করতে শিক্ষার্থীদের উপস্থিত করানোর এই যে সহজ পথ তা কিন্তু দীর্ঘ মেয়াদে আমাদের শিক্ষার অগ্রগতিকে বাধাগ্রস্ত করবে। সুতরাং যেসব অনুষ্ঠানে শিক্ষার্থীদের সংশ্লিষ্টতা নেই সেখানে যাতে তাদেরকে এরূপ বাধ্যতামূলকভাবে উপস্থিত করে এক ধরনের নির্যাতনের মধ্যে ফেলা না হয় সেজন্য ভবিষ্যতে অধিকতর সতর্ক থাকার জন্য আমরা সংশ্লিষ্টদের অনুরোধ জানাই।