বিলুপ্তির পথে শহীদ সিরাজুল ইসলাম বীরবিক্রমের স্মৃতিচিহ্ন

আমিনুল ইসলাম, তাহিরপুর
১৯৭১ সালের স্বাধীনতা যুদ্ধে যে সকল বীর সৈনিক মাতৃভূমি রক্ষায় বুকের রক্ত দিয়ে সর্বোচ্চ ত্যাগ স্বীকার করেন তাদের মধ্যে একজন শহীদ সিরাজুল ইসলাম বীরবিক্রম। তাহিরপুর উপজেলার যুদ্ধকালীন সাবসেক্টর টেকেরঘাটে শহীদ সিরাজুল ইসলামের সমাধি স্থলটি আজ অরক্ষিত। মুছে যেতে বসেছে তার একমাত্র স্মৃতি চিহ্নটুকুও। ময়মনসিংহের কিশোরগঞ্জ গুরুদয়াল কলেজের ছাত্র তুখোর ছাত্রনেতা সিরাজুল ইসলাম ৭ই মার্চে বঙ্গবন্ধুর ভাষণের পর দেশ মাতৃকার টানে কিশোরগঞ্জ জেলার ইটনা থানার ছিলানী গ্রাম হতে কয়েকজন যুবককে সাথে নিয়ে যোগ দেন মুক্তিযুদ্ধে। ভারতের মেঘালয় রাজ্যের বালাট ক্যাম্পে পৌঁছলে সিরাজুল ইসলামকে আসাম রাজ্যের ইকো ওয়ান ট্রেনিংক্যাম্পে পাঠানো হয় এবং সেখানে তিনি গেরিলা প্রশিক্ষণ শেষে মেজর মীর শওকত আলীর অধীনে যোগ দেন যুদ্ধকালীন ৫নং সাবসেক্টর টেকেরঘাটে। দক্ষতার কারণে তিনি একটি কোম্পানীর সহকারী কমান্ডার হিসেবে নিযুক্ত হন। সে কোম্পানীর অন্যতম পৃষ্ঠপোষক ছিলেন সাবেক পার্লামেন্টারিয়ান ও মুক্তিযুদ্ধ সংগঠক/কমান্ডার সুরঞ্জিত সেনগুপ্ত।
রেল যোগাযোগ ব্যাহত হওয়ার পর হানাদার বাহিনী তৎকালীন সুনামগঞ্জ মহকুমার গুরুত্বপূর্ণ নদীবন্দর  জামালগঞ্জ উপজেলার সাচনা বাজার দিয়েই রসদ সিলেট পৌঁছাতো। তাই এই নদী বন্দরকে মুক্ত করার জন্য  মিত্র বাহিনীর মেজর বাট এর প্রত্যক্ষ তত্ত্বাবধানে  ৩৬ জন চৌকস মুক্তিযোদ্ধা নিয়ে গঠন করা হয় একটি এডভান্স পার্টি। এ পার্টির নেতৃত্ব দেন সাহসী মুক্তিযাদ্ধা সিরাজুল ইসলাম। ১৯৭১ সালের ৮ আগস্ট  এডভান্স পার্টি সুর্যাস্তের পরপরই শুধু মাত্র ত্রি-নট থ্রি রাইফেল আর গ্রেনেড নিয়ে কমান্ডার সিরাজের নেতৃত্বে ২৫ মাইল উত্তর থেকে এ অভিযান শুরু করে। দুটি নৌকায় করে সাচনা পৌঁছে পাক হানাদার বাহিনীর সুরক্ষিত ব্যাংকারে গেরিলা আক্রমণ করে। অতর্কিত এ হামলায় ব্যাংকারে অবস্থানরত পাক বাহিনীর অনেকেই খতম হয় এবং তাদের প্রতিরোধ ব্যবস্থা সম্পূর্ণ ধ্বংস হয়ে পড়ে। এক পর্যায়ে কমান্ডার সিরাজুল ইসলাম আনন্দে লাফিয়ে উঠে জয়বাংলা শ্লোগান দিতে থাকেন। এমন সময় পাক বাহিনীর একটি বুলেট তার চোখে এসে বিদ্ধ হলে সাথে সাথে তিনি মাটিতে লুটিয়ে পড়েন এবং কিছুক্ষণ পরই তার মৃত্যু হয়। মৃত্যুর পর শহীদ সিরাজুল ইসলামকে পূর্ণ সামরিক মর্যাদায় টেকেরঘাট সাব সেক্টরে সমাহিত করা হয়। তার অসমান্য অবদানের জন্য বঙ্গবন্ধু সরকার শহীদ সিরাজুল ইসলাম কে বীর বিক্রম উপাধিতে ভূষিত করেন।
কিশোরগঞ্জের ছোট একটি গ্রাম ছিলানী থেকে দেশের জন্য প্রাণোৎসর্গকারী মহান দেশপ্রেমিক সিরাজুল ইসলামের ফিরে যাওয়া হলো না তার ছোট গ্রামে প্রতীক্ষারত মা বাবা ভাই-বোনের কাছে।
শহীদ সিরাজুল ইসলাম মৃত্যুর মাত্র কয়েকদিন পূর্বে ৩০ জুলাই তার বাবাকে লিখেছিলেন শেষ চিঠি-‘বাবা দোয়া করবেন নিজের প্রাণের বিনিময়ে হলেও যেন দেশ স্বাধীন হয়। মায়ের প্রতি খেয়াল রাখবেন, আমার অনুপস্থিতিতে মা’কে কষ্ট দিবেন না বাবা। মৃত্যুর মুখে থেকে যুদ্ধে করছি। কখন জানি মৃত্যু হয় জানি না। মৃত্যুর জন্য তবে সব সময়ই প্রস্তুত রয়েছি। কারণ দেশ স্বাধীন না হলে জীবনের কোন মূল্যই থাকবে না। তাই যুদ্ধকে পাথেয় হিসাবে নিলাম। আমার রক্তের বিনিময়ে যদি দেশ স্বাধীন হয় তখন দেখবেন লাখ লাখ সন্তানেরা এক পুত্র হারা বাবাকে ডাকবে। সে ডাকের অপেক্ষাই থাকবেন বাবা। আমার কিছু হয়ে গেলে আপনার দুই মেয়েকে পুরুষের মতই শিক্ষায় শিক্ষিত করে তুলবেন।’ আজো তার দু’বোন ভাইয়ের শেষ চিঠিটি বুকে চেপে অশ্রুপাত করে। আজো এ চিঠি সাবসেক্টরের সহযোদ্বা রৌজ আলীর নিকট সংরক্ষিত আছে।
উপজেলা মুক্তিযোদ্ধা কমান্ডের সাবেক কমান্ডার মুক্তিযোদ্ধা রৌজ আলী বলেন, ‘মহামান্য রাষ্ট্রপতি মহোদয়ের অত্যন্ত আস্থাভাজন ছিলেন সিরাজ ভাই। দেশের জন্য তার অসমান্য ত্যাগ জাতি চিরদিন মনে রাখুক সেটা আমি চাই। কিন্তু দুঃখজনক হলেও সত্য যে মুক্তিযোদ্ধাদের স্মৃতি ধরে রাখতে কোটি টাকা ব্যয়ে স্মৃতিসৌধ নির্মিত হয়েছে অথচ কয়েক হাজার টাকা খরচ করে একজন দেশপ্রেমিকের কবর সংরক্ষণে এগিয়ে আসছে না। সিরাজ ভাইয়ের কবর খানা সংরক্ষণের  জন্য বার বার বিভিন্ন মহলে আবেদন করার পরেও কেউ তার সমাধি স্থলটির অবস্থা দেখতে পর্যন্ত আসেন না, যা খুবই দুঃখজনক’।