-বিল দখল করে আবাসন প্রকল্প আইনের প্রয়োগ নিশ্চিত করা হোক

দেশের জলাভূমি ক্রমে সংকুচিত হচ্ছে। জনসংখ্যার আধিক্য, অধিক ফসল উৎপাদনের উদ্দেশ্যে নদী-খাল-বিলসহ জলাভূমিকে ফসলি জমিতে রূপান্তর, বন্যা নিয়ন্ত্রণের জন্য বাঁধ নির্মাণ, বিভিন্ন স্তরে অপরিকল্পিত অবকাঠামো (আবাসন প্রকল্প, রাস্তাঘাট, ভবন, সেতু, কালভার্ট ইত্যাদি) নির্মাণ ও উন্নয়ন, অবৈধ দখল, পানিপ্রবাহের নিয়ন্ত্রণসহ বিভিন্ন উেসর দূষণ (পানি ও বায়ু) জলাভূমি হ্রাসের কারণ। গত তিন দশকে জলাভূমি কমেছে প্রায় ৭৫ লাখ হেক্টর। এতে প্রাকৃতিক ভারসাম্যও নষ্ট হচ্ছে।
আইনে রয়েছে, পানি শুকিয়ে গেলে ফোরশোর ভূমি হিসেবে পূর্ববর্তী মালিক পুনরায় জমির দখল পাবেন। কিন্তু সেখানে কোনোভাবেই স্থাপনা নির্মাণ বা বালি ভরাট করা যাবে না। শুধু চাষাবাদের কাজে ওই জমি ব্যবহার করা যাবে।
পরিবেশ অধিদপ্তর, হাওড় উন্নয়ন বোর্ড, ভূমি মন্ত্রণালয়, মৎস্য অধিদপ্তর এসব দপ্তর বিচ্ছিন্নভাবে জলাভূমি উন্নয়ন ও সংরক্ষণে সহায়তা করলেও জলাশয় রক্ষায় সামগ্রিক প্রচেষ্টার ঘাটতি রয়েছে। আইনি কাঠামোয় জলাভূমির মালিকানা, ব্যবস্থাপনা, পরিচালনার বিষয়গুলো সুনির্দিষ্টভাবে বণ্টন না থাকায় এবং কিছু ক্ষেত্রে একাধিক কর্তৃপক্ষের ভূমিকা থাকায়, কার্যক্রমে একটি প্রতিষ্ঠানের সঙ্গে অন্য প্রতিষ্ঠানের কাজে সমন্বয়হীনতা দেখা দেয়। এর সুযোগ নিয়ে কিছু ব্যক্তি নদী-খাল-বিল দখল করছে। অবৈধ দখলদারদের ক্ষমতার উৎস কী? এ প্রশ্নের উত্তর খুঁজতে গেলে বেরিয়ে আসে ক্ষমতাসীন রাজনৈতিক দলের সঙ্গে তাদের সম্পর্কের কথা। যখন যে দল ক্ষমতায় থাকে, তখন সে দলেরই প্রভাবশালীরা চালু রাখে দখল বাণিজ্য। সরকারি জমি জবরদখল করা একটি অপরাধ। এসব দখলদারের জন্য সরকার আর্থিকভাবে ক্ষতিগ্রস্ত হচ্ছে, পরিবেশের অপূরণীয় ক্ষতি হচ্ছে। এক্ষেত্রে প্রথম পদক্ষেপটি হওয়া উচিত সরকারি সম্পত্তি দখলমুক্ত করা। এজন্য কঠোর পদক্ষেপ গ্রহণ জরুরি। আশা করব, সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষ যাবতীয় দখল তৎপরতার বিরুদ্ধে প্রয়োজনীয় ব্যবস্থা গড়ে তুলবে।
সারা দেশেই অপরিকল্পিত উন্নয়ন প্রকল্প ও শিল্পায়নে প্রতিনিয়তই বিরান হচ্ছে জলাভূমি। আর সৃষ্ট পরিস্থিতিতে বিশেষজ্ঞরাও বলছেন, এভাবে জলাভূমি কমতে থাকলে আগামী প্রজন্মের জন্য একটি বিপজ্জনক পরিবেশ রেখে যাব আমরা। জলাশয়গুলো রক্ষার ব্যাপারে সুনির্দিষ্ট আইন ও আদালতের নির্দেশ থাকার পরও দখল-দূষণ থামছে না, যা উৎকণ্ঠার জন্ম দেয়। আমাদের মৎস্যসম্পদ উন্নয়ন এবং পরিবেশ সুরক্ষার জন্য জলাভূমি রক্ষায় এগিয়ে আসতে হবে সরকারকে। দেশের জলাভূমি উদ্ধার করে মত্স্য অভয়াশ্রমসহ অন্যান্য কাজে ব্যবহার করা গেলে মাছের উৎপাদন আরো বাড়ানো সম্ভব। উন্নয়ন কর্মযজ্ঞ, অবৈধ দখল ও দূষণের কারণে জলাশয় বিলীন হতে থাকবে, এটা কোনোভাবেই কাম্য নয়।
নদী-খাল-বিল দখলকে দেশের প্রাধান্যযুক্ত সমস্যা হিসেবে চিহ্নিত করতে হবে। যারাই ক্ষমতাসীন হবে, এ সমস্যা দূরীকরণে সর্বোচ্চ অগ্রাধিকার দিয়ে তাদের তৎপর হতে হবে। কাগজে-কলমে অগ্রাধিকারপ্রাপ্ত সমস্যা হিসেবে শনাক্ত করলে চলবে না, সমস্যা সমাধানের জন্য প্রাসঙ্গিক আইন-কানুনে লাগসই সংশোধন আনতে হবে। প্রশাসনিক কাঠামোকে কার্যকরভাবে শানিত করতে হবে। সমস্যার বিশালত্ব ও জটিলতার কারণে শুধু বিভাগীয় কর্মকর্তা-কর্মচারীর দ্বারা সমস্যা মোকাবেলা করা সম্ভব হবে না। সেহেতু সহায়ক এজেন্ট নিয়োজন যথার্থ হবে। দখল-বেদখলকারীদের বিরুদ্ধে তাত্ক্ষণিক ব্যবস্থা গ্রহণের জন্য সংক্ষিপ্ত বিচার ব্যবস্থা তথা ভ্রাম্যমাণ আদালত প্রচলন করতে হবে। দখল-বেদখলকে শাস্তিযোগ্য অপরাধ হিসেবে আদালতের কাঠগড়ায় তুলতে হবে।