বিশিষ্টজনদের অভিমত- সামাজিক ও নৈতিক অবক্ষয়ই দায়ী

স্টাফ রিপোর্টার
ধর্ষণ একটি ভয়ানক অপরাধ। ধর্ষণের সর্বোচ্চ শাস্তি যাবজ্জীবন কারাদ- ও সর্বনি¤œ ৭ বছরের কারাদ- সাথে অর্থদ-। প্রচলিত আইনে এসব কঠিন শাস্তির বিধান থাকার পরও ঠেকানো যাচ্ছে না ধর্ষণকা-।
গত কয়েক সপ্তাহে সুনামগঞ্জের তাহিরপুর, বিশ্বম্ভরপুর ও ছাতকে বেশ কয়েকটি ধর্ষণের ঘটনা ঘটেছে। এর মধ্যে অধিকাংশ ধর্ষণের শিকার হয়েছে শিশুরা। আইনের নানা ফাকফোকর দিয়ে প্রভাবশালী ধর্ষকরা বিচার প্রক্রিয়া থেকে বের হয়ে যাচ্ছে। অনেক সময় প্রভাব- প্রতিপত্তিশালীদের হুমকি-ধামকির ভয়েও অনেকেই বিচার প্রার্থী হন না। কেউ কেউ বিচার প্রার্থী হলেও অর্থের জোরে পরবর্তীতে আপোষ মিমাংসা করতে বাধ্য হন।
এতে করে বখাটে প্রকৃতির অমানুষগুলো এসব কাজ করার আগে শাস্তিকে ভয় পাচ্ছে না। উল্টোদিকে ধর্ষণের মত ভয়াবহ নির্যাতনের শিকার হয়ে অনেকেই মানসিক ও শারীরিকভাবে ভেঙে পড়েন। তাদের পরবর্তী জীবন হয়ে উঠে দূর্বিষহ। ধর্ষণের শিকার শিশু-কিশোরী ও মহিলাদের পরিবারগুলোও সামাজিভাবে হেয় হচ্ছেন।
অবসরপ্রাপ্ত এক পুলিশ কর্মকর্তার দাবি, ধর্ষণের বিচার দ্রুত না হওয়া, বিভিন্নভাবে অপারাধীদের পার পেয়ে যাওয়া ও বিচার কার্যে দীর্ঘসূত্রিতার কারণে এই সামাজিক ব্যাধি থেকে দূরে থাকা যাচ্ছে না। ধর্ষণের বিচার দ্রুত নিষ্পত্তি করতে হবে।
নারী নেত্রী, মহিলা পরিষদ ও শিশু বিষয়ক কর্মকর্তাদের দাবি, পরিবারের বন্ধন দুর্বল হয়ে পড়া, নৈতিক-সামজিক অবক্ষয় ও মাদকসহ অপরাধ প্রবণতা থেকেই এসব ঘটনা ঘটছে।
জেলা মহিলা পরিষদের সভাপতি গৌরি ভট্টাচার্য বলেন,‘ এসব ঘটনার জন্য সমাজ ও আমরা নিজেরাই দায়ী। সুস্থ সংস্কৃতি চর্চার অভাব, বিচারহীনতা ও বিলম্বিত বিচার ব্যবস্থা, নৈতিক-সামজিক অবক্ষয় ও মাদকসহ অপরাধ প্রবণতা থেকেই এসব ঘটনা ঘটছে। বিকৃত রুচি বোধের মানুষগুলো এসব জঘন্য কাজগুলো করছে। কর্মহীন ও নেশাগ্রস্ত মানুষেরাই এসবের সাথে জড়িত। ’
জেলা শিশু বিষয়ক কর্মকর্তা বাদল চন্দ্র বর্মন বলেন,‘ বিকৃত ও নিচু মনের মানুষরাই এসব অমানবিক কাজ করছে। এসব ঠেকাতে সামাজিকভাবে প্রতিরোধ আন্দোলন গড়ে তুলতে হবে। পারিবারিক ও সামাজিক বন্ধন আরো দৃঢ় করতে হবে। ’
জেলা ও দায়রা জজ আদালত এর নারী ও শিশু ট্রাইব্যুনালের পিপি অ্যাড. নান্টু রায় বলেন,‘ মানুষের নীতি-নৈতিকতার অধঃপতনই দায়ী। একজন সুস্থ মনের মানুষ কোনোভাবেই এসব কাজ করতে পারবে না। মনুষ্যত্ব যখন লোপ পায় তখনই এসব কাজ করে মানুষরূপি কিছু অমানুষ। ’
বিচারহীনতা ও বিলম্বিত বিচার ব্যবস্থার বিষয়ে তিনি বলেন,‘ এখন এসব ঘটনার বিচারে বিলম্ব হয় না। অনেক মামলার স্বাক্ষীরা সময়মত আদালতে স্বাক্ষ্য প্রদান করেন না। আবার কোনো কোনো বাদীপক্ষ নানা কারণে আদালতের বাইরে আসামীদের সাথে আপোষ করে নেয়। যার কারণে প্রভাবশালী অপরাধিরা অপরাধ বোধে উৎসাহিত হয়।’
জেলা উদীচীর সভাপতি নারী নেত্রী শীলা রায় বলেন,‘ সম্প্রতি ঘটে যাওয়া ঘটনায় আমরা খুবই ব্যথিত ও শংকিত। এই ব্যধির প্রকৃত কারণ খোঁজে বের করা প্রয়োজন। তবে আমরা মনে করি সামাজিক অবক্ষয়ের কারণে এসব ঘটনা ঘটছে। এর প্রতিরোধে সবাইকে এগিয়ে এসে সামাজিক আন্দোলন গড়ে তুলতে হবে।’
খোঁজ নিয়ে জানা যায়, জেলায় একের পর এক ধর্ষণের ঘটনা ঘটছে। অধিকাংশ ক্ষেত্রে শিশুরাই ধর্ষণের শিকার হচ্ছে। সর্বশেষ ৫ এপ্রিল ছাতকের ইসলামপুর ইউনিয়নের ভইয়ারকান্দি গ্রামের ৬ বছরের এক শিশু ধর্ষণের শিকার হয়। ১ এপ্রিল তাহিরপুরে খলিসাজুরি গ্রামে ধর্ষণের শিকার হয় এক এতিম কিশোরী। ৩ এপ্রিল বিশ্বম্ভরপুরের বাঘবেড় গ্রামে ৭ বছর বয়সী এক শিশু কন্যা গণধর্ষণের শিকার হয়। ৯ মার্চ জগন্নাথপুর উপজেলার বড়কাপন গ্রামে এক গৃহবধূকে গণধর্ষণ করা হয়। ১৯ মার্চ তাহিরপুর উপজেলার ব্রাহ্মণগাঁও গ্রামে ৫ বছর বয়সী এক শিশু কন্যাকে ধর্ষণ করেছে এক লম্পট। ২১ ফেব্রুয়ারি সদর উপজেলার মাইজবাড়ি গ্রামে চাচার হাতে ধর্ষিত হয় চতুর্থ শ্রেণি পড়–য়া এক শিশু।